প্রকাশ: ২৭ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ৫০তম মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁর সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, জীবনভর অন্যায়, অত্যাচার ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন বিদ্রোহী কবি। তাঁর কবিতা ও বাণী যেকোনো অন্যায়-অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে এবং আন্দোলন-সংগ্রামে সাহস জোগাতে মানুষকে অনুপ্রাণিত করে।
বৃহস্পতিবার সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে জাতীয় কবির সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এসব কথা বলেন রুহুল কবির রিজভী। এ সময় তিনি নজরুলের সাহিত্য ও দর্শনের সঙ্গে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ঐতিহাসিক সম্পর্কের কথাও তুলে ধরেন।
রিজভী বলেন, কাজী নজরুল ইসলাম জীবনভর অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন। তিনি ছিলেন যুগান্তরের কবি। তাঁর সৃষ্টিতে মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা, সাম্য, মানবতা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের শক্তিশালী আহ্বান রয়েছে। সমাজে যখন নিপীড়ন ও বৈষম্য দেখা দিয়েছে, তখন নজরুলের সাহিত্য মানুষকে প্রতিবাদী হওয়ার প্রেরণা দিয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
বিএনপির এই নেতা বলেন, যেকোনো অত্যাচার ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে নজরুল মানুষকে শিখিয়েছেন। বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামেও তাঁর সাহিত্য ও চিন্তা প্রধান অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে। তাঁর মতে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে নজরুলের বিদ্রোহী চেতনা মানুষের মধ্যে সাহস ও আত্মবিশ্বাস তৈরি করেছে।
রিজভী আরও বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলন থেকে শুরু করে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান পর্যন্ত বিভিন্ন সংগ্রামে নজরুলের চেতনা অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে। দেশের সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে কেউ ষড়যন্ত্র করলে নজরুলের বাণী মানুষকে তার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে শেখায় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
নজরুলের মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁর সমাধিতে শ্রদ্ধা জানাতে বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের পাশাপাশি সাধারণ মানুষও উপস্থিত হন। কবির সমাধিস্থল হয়ে ওঠে তাঁর সাহিত্য, দর্শন ও সংগ্রামী চেতনা স্মরণের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। শ্রদ্ধা নিবেদন, আলোচনা ও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক আয়োজনের মধ্য দিয়ে স্মরণ করা হচ্ছে বাংলা সাহিত্যের এই কালজয়ী ব্যক্তিত্বকে।
১৮৯৯ সালের ২৪ মে পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন কাজী নজরুল ইসলাম। তাঁর জন্মের সময় বাংলা সাহিত্য ও সমাজ ছিল নানা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলেছে। শৈশব থেকেই দারিদ্র্য ও নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়েছে তাঁকে। কিন্তু কঠিন বাস্তবতা তাঁর সৃষ্টিশীলতাকে থামিয়ে দিতে পারেনি। বরং জীবনের অভিজ্ঞতা পরবর্তী সময়ে তাঁর সাহিত্য ও চিন্তাজগতকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।
নজরুল বাংলা সাহিত্যে আবির্ভূত হন এক ভিন্নধর্মী কণ্ঠস্বর নিয়ে। তাঁর কবিতায় যেমন প্রেম, প্রকৃতি ও সৌন্দর্যের প্রকাশ ঘটেছে, তেমনি অন্যদিকে উচ্চারিত হয়েছে অন্যায়, শোষণ, নিপীড়ন ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ। তাঁর বিদ্রোহী চেতনা তাঁকে বাংলা সাহিত্যে স্বতন্ত্র অবস্থান এনে দেয়।
সৃষ্টিশীল জীবনের সময়কাল দীর্ঘ না হলেও নজরুলের সাহিত্যকর্মের ব্যাপ্তি ছিল বিস্ময়কর। কবিতা ও গান ছাড়াও তিনি গল্প, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধসহ সাহিত্যের বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাজ করেছেন। একই সঙ্গে ইসলামি সংগীত, হামদ, নাত ও গজলের পাশাপাশি শ্যামাসংগীতসহ বিভিন্ন ধারার গান রচনা করেছেন। তাঁর সৃষ্টিতে ধর্মীয় সম্প্রীতি, মানবিকতা ও সাম্যের যে বার্তা পাওয়া যায়, তা বাংলা সংস্কৃতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হিসেবে বিবেচিত।
নজরুলের সাহিত্যকর্মের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা। তিনি এমন একটি সমাজের স্বপ্ন দেখেছেন যেখানে মানুষে মানুষে বৈষম্য থাকবে না, শোষণ ও নিপীড়নের অবসান হবে এবং মানুষ মর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকার অধিকার পাবে। এ কারণে তাঁর কবিতা ও গান কেবল সাহিত্যিক সৌন্দর্যের জন্য নয়, সামাজিক ও মানবিক বার্তার কারণেও প্রজন্মের পর প্রজন্ম পাঠকের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে আছে।
ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে তাঁর অবস্থানও নজরুলের জীবন ও সাহিত্যকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সময় তাঁর লেখায় স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা ও প্রতিবাদের ভাষা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তাঁর সাংবাদিকতা ও সাহিত্যচর্চাও সে সময় রাজনৈতিক সচেতনতার সঙ্গে যুক্ত ছিল। এজন্য তাঁকে কারাবরণও করতে হয়।
নজরুলের বিদ্রোহী সত্তা শুধু রাজনৈতিক প্রতিবাদে সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি মানুষের অন্তর্গত মুক্তির কথাও বলেছেন। সমাজে প্রচলিত নানা বৈষম্য, কুসংস্কার ও অসাম্যের বিরুদ্ধে তাঁর অবস্থান ছিল স্পষ্ট। নারী-পুরুষের সমতা, ধর্মীয় সম্প্রীতি এবং নিপীড়িত মানুষের অধিকার নিয়ে তাঁর বক্তব্য আজও বিভিন্ন আলোচনায় ফিরে আসে।
বাংলাদেশের সঙ্গে নজরুলের সম্পর্কও বিশেষভাবে গভীর। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের ২৪ মে ভারত সরকারের অনুমতি নিয়ে সপরিবারে তাঁকে বাংলাদেশে আনা হয়। স্বাধীন বাংলাদেশ তাঁকে জাতীয় কবির মর্যাদা দেয়। রাজধানীর ধানমণ্ডিতে রাষ্ট্রীয়ভাবে বসবাসের জন্য তাঁকে একটি বাড়ি দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে তাঁর সাহিত্য ও স্মৃতির সঙ্গে বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে ওঠে।
১৯৭৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নজরুলকে সম্মানসূচক ডি-লিট ডিগ্রি প্রদান করে। ১৯৭৬ সালে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে নাগরিকত্ব প্রদান করে। একই বছর তিনি একুশে পদকে ভূষিত হন। তাঁর শেষ জীবন কেটেছে বাংলাদেশেই এবং ১৩৮৩ বঙ্গাব্দের ১২ ভাদ্র ঢাকায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
আজ তাঁর মৃত্যুর পাঁচ দশক পেরিয়ে গেলেও নজরুলের সাহিত্যিক ও মানবিক আবেদন কমেনি। বরং সামাজিক বৈষম্য, অন্যায়, নিপীড়ন ও স্বাধীনতার প্রশ্নে তাঁর লেখা নতুন প্রজন্মের কাছেও আলোচনার বিষয় হয়ে রয়েছে। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সমাজ ও রাজনীতির প্রেক্ষাপট বদলালেও মানুষের মর্যাদা, সাম্য ও মুক্তির যে আকাঙ্ক্ষা তিনি প্রকাশ করেছেন, তার আবেদন এখনো অটুট।
রিজভীর বক্তব্যেও নজরুলের সেই সংগ্রামী চেতনাই সামনে এসেছে। দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও মানুষের অধিকার রক্ষার প্রশ্নে কবির বাণী থেকে অনুপ্রেরণা নেওয়ার কথা বলেছেন তিনি। রাজনৈতিক বক্তব্যের বাইরে বৃহত্তর অর্থে নজরুলের সাহিত্য যে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এবং মানবিক মর্যাদা রক্ষার সাহস জোগায়, তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীর আলোচনায় সেই বিষয়টিই আবার সামনে এসেছে।
নজরুলের মৃত্যুবার্ষিকী তাই শুধু একজন কবির প্রয়াণের দিন স্মরণ নয়; এটি তাঁর রেখে যাওয়া চিন্তা, সাহিত্য ও মানবিক দর্শন নতুন করে পাঠেরও উপলক্ষ। তাঁর বিদ্রোহী কণ্ঠ আজও পাঠককে প্রশ্ন করতে শেখায়, অন্যায়ের সামনে নীরব না থাকতে অনুপ্রাণিত করে এবং মানুষকে মানুষের মর্যাদা দিয়ে দেখার আহ্বান জানায়। সেই কারণেই পাঁচ দশক পরও নজরুল বাংলা ভাষাভাষী মানুষের সাংস্কৃতিক ও সামাজিক চেতনায় জীবন্ত এক অনুপ্রেরণার নাম।