কুমিল্লায় সাংবাদিকদের ওপর হামলা, প্রধান আসামি গ্রেপ্তার

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২৭ আগস্ট, ২০২৬
  • ৩২ বার
কুমিল্লায় সাংবাদিকদের ওপর হামলা, প্রধান আসামি গ্রেপ্তার

প্রকাশ: ২৭ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

কুমিল্লার সদর দক্ষিণ উপজেলায় সংবাদ সংগ্রহে যাওয়ার পথে সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনায় করা মামলার প্রধান আসামি মো. শাওনকে গ্রেপ্তার করেছে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। বুধবার দিবাগত রাত ৩টার দিকে উপজেলার বিজয়পুর এলাকা থেকে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।

গ্রেপ্তার শাওন সদর দক্ষিণ উপজেলার শ্রীমন্তপুর গ্রামের মো. সেলিম মিয়ার ছেলে। সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনার পর তিনি অন্য আসামিদের সঙ্গে এলাকা ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছিলেন বলে জানিয়েছে পুলিশ। পরে মামলা হওয়ার পর তাকে শনাক্ত করে গ্রেপ্তারে অভিযান চালানো হয়।

কুমিল্লা জেলা গোয়েন্দা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শামছুল আলম শাহ শাওনকে গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, সাংবাদিকদের ওপর হামলার পর শাওনসহ অন্য অভিযুক্তরা ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়। মামলার পর তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় অবস্থান শনাক্ত করে বুধবার দিবাগত রাত ৩টার দিকে বিজয়পুর এলাকা থেকে শাওনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাকে সদর দক্ষিণ থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে।

এর আগে বুধবার দুপুরে সদর দক্ষিণ উপজেলার উত্তর রামপুরের মিস্ত্রীপুকুর পাড় এলাকায় সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। সংবাদ সংগ্রহের উদ্দেশ্যে লালমাইয়ের দিকে যাওয়ার পথে ওই ঘটনার সূত্রপাত হয়। হামলায় সাংবাদিকরা আহত হন এবং তাঁদের একজনকে চিকিৎসার জন্য কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়।

ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সাংবাদিকদের ভাষ্য অনুযায়ী, যমুনা টেলিভিশনের স্টাফ রিপোর্টার ও কুমিল্লা প্রেসক্লাবের নির্বাহী পরিষদের সদস্য রফিকুল ইসলাম চৌধুরী খোকন, ইন্ডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের কুমিল্লা প্রতিনিধি ও কুমিল্লা টেলিভিশন সাংবাদিক ফোরামের নির্বাহী সদস্য তানভীর দীপু এবং স্টার নিউজের কুমিল্লা ব্যুরো রিপোর্টার ও কুমিল্লা টেলিভিশন সাংবাদিক ফোরামের তথ্যপ্রযুক্তি ও আপ্যায়ন সম্পাদক আবদুল্লাহ আল মারুফ ওই সময় সেখানে ছিলেন।

তানভীর দীপুর বর্ণনা অনুযায়ী, বুধবার দুপুরে তাঁরা সংবাদ সংগ্রহের জন্য লালমাইয়ের দিকে যাচ্ছিলেন। পদুয়ার বাজার মোড়ে যানজট থাকায় তাঁরা উত্তর রামপুর বিদ্যুৎ অফিসের সামনের সড়ক ব্যবহার করে কুমিল্লা-নোয়াখালী মহাসড়কে ওঠার চেষ্টা করেন। ওই সড়কে স্থানীয়দের তৈরি করা লোহার ব্যারিকেডের কারণে কয়েকটি গাড়ি আটকে যায়। এতে যানজট আরও তীব্র হয়ে ওঠে।

যানজটের কারণ জানতে সাংবাদিকরা গাড়ি থেকে নেমে সামনে এগিয়ে যান। সেখানে লোহার ব্যারিকেড দেখতে পান তাঁরা। আটকে থাকা গাড়িগুলো পার করে দেওয়ার চেষ্টা করার সময় স্থানীয় কয়েকজন যুবকের সঙ্গে তাঁদের কথা-কাটাকাটি হয় বলে জানান তানভীর দীপু।

তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এ সময় শাওনসহ কয়েকজন যুবক সেখানে এসে ব্যারিকেড সরানোর বিষয়টি নিয়ে তাঁদের গালিগালাজ করতে শুরু করেন। একপর্যায়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং তাঁদের ওপর শারীরিকভাবে হামলা করা হয়।

তানভীর দীপু অভিযোগ করেন, তাঁরা নিজেদের সাংবাদিক পরিচয় দেওয়ার পরও হামলা বন্ধ হয়নি। বরং রড ও লাঠি দিয়ে তাঁদের মারধর করা হয়। হামলায় সহকর্মী আবদুল্লাহ আল মারুফের ঘাড়ে আঘাত লাগে। গুরুতর আঘাতে তিনি মাটিতে পড়ে জ্ঞান হারান বলে জানান তানভীর।

পরে আহত সহকর্মীকে উদ্ধার করে কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। হামলার ঘটনায় সাংবাদিকদের মধ্যে উদ্বেগ ও ক্ষোভ তৈরি হয়। সংবাদ সংগ্রহের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনাকে পেশাগত নিরাপত্তার জন্যও উদ্বেগজনক হিসেবে দেখছেন স্থানীয় সাংবাদিকরা।

সাংবাদিকদের কাজের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ঘটনাস্থলে গিয়ে তথ্য সংগ্রহ করা এবং তা যাচাই করে মানুষের সামনে তুলে ধরা। কোনো সংবাদ বা ঘটনাকে কেন্দ্র করে মতবিরোধ তৈরি হলেও সাংবাদিকদের ওপর হামলা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হলে সংবাদ সংগ্রহের পরিবেশ আরও কার্যকর ও নিরাপদ হবে।

ঘটনার পর হামলায় জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি ওঠে। পুলিশও অভিযুক্তদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে তৎপরতা শুরু করে। এরই ধারাবাহিকতায় প্রধান আসামি শাওনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এখন মামলার অন্য আসামিদেরও আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সাংবাদিক নেতারা।

কুমিল্লা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ইমতিয়াজ আহমেদ জিতু শাওনকে গ্রেপ্তার করায় জেলা পুলিশ সুপার ও ডিবি পুলিশকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। তিনি বলেন, সাংবাদিকদের ওপর হামলাকারীদের আইনের আওতায় আনা হলে এ ধরনের অপরাধ কমে আসবে। একই সঙ্গে সাংবাদিকদের ওপর হামলা করার ধৃষ্টতা দেখানোর প্রবণতাও ভবিষ্যতে কমবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, মামলার তদন্ত কার্যক্রম চলমান রয়েছে। গ্রেপ্তার শাওনকে সদর দক্ষিণ থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে। মামলার অন্যান্য আসামিদের অবস্থান শনাক্ত এবং তাঁদের গ্রেপ্তারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কাজ করছে।

এদিকে ঘটনার পর স্থানীয় সাংবাদিকদের মধ্যে পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় নিরাপত্তার বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। মাঠপর্যায়ে কাজ করা সাংবাদিকদের অনেক সময় যানজট, দুর্ঘটনা, সংঘর্ষ, রাজনৈতিক কর্মসূচি কিংবা স্থানীয় বিরোধের মতো পরিস্থিতির মধ্যে সংবাদ সংগ্রহ করতে হয়। এসব ক্ষেত্রে সাংবাদিকদের পরিচয় ও দায়িত্বকে সম্মান করার পাশাপাশি তাঁদের নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।

কুমিল্লার এই ঘটনা একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। একটি সড়কের ব্যারিকেড সরানোকে কেন্দ্র করে যে বিরোধের সূত্রপাত, তা শেষ পর্যন্ত সাংবাদিকদের শারীরিকভাবে আহত হওয়ার ঘটনায় গড়িয়েছে। এমন পরিস্থিতি যাতে ভবিষ্যতে আর তৈরি না হয়, সে জন্য স্থানীয় পর্যায়ে বিরোধ মীমাংসায় দায়িত্বশীলতা এবং আইনের প্রতি শ্রদ্ধা জরুরি।

বিশেষ করে সংবাদ সংগ্রহের সময় সাংবাদিকদের সঙ্গে কোনো পক্ষের মতবিরোধ হলে তা আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব। কিন্তু মতবিরোধের জেরে শারীরিক হামলা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে এবং আইনি সমস্যার সৃষ্টি করে। এ ঘটনায় প্রধান আসামির গ্রেপ্তার আইনগত প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

তবে মামলার তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত হামলার সঙ্গে কার কী ভূমিকা ছিল, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে। গ্রেপ্তার শাওনের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগও আদালতে প্রমাণিত হওয়ার আগ পর্যন্ত তাকে আইনগতভাবে অভিযুক্ত হিসেবেই বিবেচনা করতে হবে।

সাংবাদিকদের ওপর হামলার মতো ঘটনায় দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের পাশাপাশি আহত সাংবাদিকদের চিকিৎসা ও নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আরও কার্যকর ভূমিকা প্রত্যাশা করছেন সাংবাদিক সমাজের প্রতিনিধিরা।

কুমিল্লায় সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনায় প্রধান আসামি শাওনের গ্রেপ্তার এখন তদন্তের পরবর্তী ধাপকে সামনে এনেছে। অন্য অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার, ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটন এবং আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দায় নির্ধারণের দিকেই এখন নজর সংশ্লিষ্টদের। একই সঙ্গে এই ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে সংবাদকর্মীদের নিরাপদে দায়িত্ব পালনের পরিবেশ নিশ্চিত করার বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত