প্রকাশ: ২৭ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দিনাজপুরের সদর উপজেলার ভূষিরবন্দর এলাকায় আত্রাই নদীতে গোসল করতে নেমে পানিতে ডুবে দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। বুধবার দুপুরে নদীতে তলিয়ে যাওয়ার পর দীর্ঘ অনুসন্ধান শেষে রাতে ও বৃহস্পতিবার ভোরে তাদের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। বৃহস্পতিবার সকালে জানাজা শেষে একই গ্রামের দুই শিশুকে পাশাপাশি কবরে দাফন করা হয়েছে।
নিহত দুই শিশু হলো সদর উপজেলার ২ নম্বর সুন্দরবন ইউনিয়নের হাড়গাঁ গ্রামের শফিকুল ইসলামের মেয়ে শর্মি ইসলাম (১২) এবং একই গ্রামের বাবুলের মেয়ে বৃষ্টি (১০)। শর্মি স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী ছিল। বৃষ্টি পড়ত পঞ্চম শ্রেণিতে। একই গ্রামের দুই পরিবারের এই দুই শিশুর আকস্মিক মৃত্যুতে এলাকায় নেমে এসেছে শোকের ছায়া।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বুধবার দুপুর আড়াইটার দিকে তিন শিশু কন্যা দিনাজপুর সদর উপজেলার ২ নম্বর সুন্দরবন ইউনিয়নের ভূষিরবন্দর বেগুনতাড়া গ্রামের সুইজগেটসংলগ্ন আত্রাই নদীতে গোসল করতে যায়। নদীতে নামার পর কোনো একসময় তিনজনের মধ্যে দুই শিশু পানির গভীরে তলিয়ে যায়। অপর শিশুটি সাঁতরে নদীর পাড়ে উঠতে সক্ষম হয়।
দুই সহপাঠী ও স্বজনের পানিতে তলিয়ে যাওয়ার দৃশ্য দেখে উদ্ধার পাওয়া শিশুটি চিৎকার শুরু করে। তার চিৎকার শুনে স্থানীয় লোকজন দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন। এরপর অনেকে নদীতে নেমে দুই শিশুকে খুঁজতে থাকেন। নদীর বিভিন্ন অংশে দীর্ঘ সময় ধরে তল্লাশি চালিয়েও তাৎক্ষণিকভাবে তাদের সন্ধান পাওয়া যায়নি।
ঘটনার খবর পেয়ে বিষয়টি কোতয়ালী থানায় জানানো হয়। পরে পুলিশ দিনাজপুর ফায়ার সার্ভিসকে বিষয়টি অবহিত করে। ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধারকারী দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে নদীতে তল্লাশি শুরু করে। স্থানীয় বাসিন্দারাও উদ্ধারকাজে সহযোগিতা করেন। তবে নদীর পানির গভীরতা ও স্রোতের কারণে তাৎক্ষণিকভাবে দুই শিশুকে খুঁজে পাওয়া সম্ভব হয়নি।
শিশু দুটির সন্ধানে পরে রংপুর থেকে ডুবুরি দল আনা হয়। ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধারকারী দলের সঙ্গে ডুবুরিরাও নদীতে নেমে তল্লাশি চালান। সন্ধ্যার পরও উদ্ধার অভিযান অব্যাহত থাকে। পরিবারের সদস্য ও স্বজনরা নদীর পাড়ে অপেক্ষা করতে থাকেন। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে উৎকণ্ঠাও বাড়তে থাকে।
দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর বুধবার রাত ৮টার দিকে ঘটনাস্থল থেকে শর্মি ইসলামের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তবে তখনও বৃষ্টির কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। তাকে খুঁজতে রাতেও তল্লাশি অব্যাহত থাকে। পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি স্থানীয় লোকজনও নদীর বিভিন্ন অংশে নজর রাখেন।
অবশেষে বৃহস্পতিবার ভোর সাড়ে ৫টার দিকে ঘটনাস্থল থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরে ঝানজিরা ফিরিঙ্গীর ঘাট এলাকায় বৃষ্টির মরদেহ ভেসে ওঠে। পরে উদ্ধারকারী দল তার মরদেহ উদ্ধার করে। নদীর স্রোতে ভেসে মরদেহটি ঘটনাস্থল থেকে দূরে চলে গিয়েছিল বলে স্থানীয়রা জানান।
দুই শিশুর মরদেহ উদ্ধারের খবর ছড়িয়ে পড়লে হাড়গাঁ গ্রামসহ আশপাশের এলাকায় শোকের আবহ তৈরি হয়। স্বজন ও স্থানীয় বাসিন্দারা তাদের বাড়িতে ছুটে যান। দুই পরিবারের সদস্যদের কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ। যেসব শিশু কয়েক ঘণ্টা আগেও সহপাঠী ও বন্ধুদের সঙ্গে হাসি-আনন্দে সময় কাটাচ্ছিল, তাদের এমন আকস্মিক মৃত্যু কেউ মেনে নিতে পারছিলেন না।
স্থানীয়দের ভাষ্য, নদীটি এলাকার মানুষের কাছে পরিচিত হলেও পানির গভীরতা ও স্রোতের কারণে বর্ষাকালে সেখানে ঝুঁকি বেড়ে যায়। বিশেষ করে শিশু-কিশোরদের নদীতে গোসল বা পানিতে নামার সময় বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন। তবে এদিন তিন শিশু কীভাবে নদীর গভীর পানিতে চলে গেল, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানা যায়নি।
পার্শ্ববর্তী উপজেলার সুন্দরপুর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান নাসিরুল ইসলাম জানান, বুধবার দুপুরে তিন শিশু নদীতে গোসল করতে নেমেছিল। তাদের মধ্যে একজন সাঁতরে তীরে উঠতে পারলেও শর্মি ও বৃষ্টি পানিতে তলিয়ে যায়। এরপর স্থানীয়রা দ্রুত নদীতে নেমে তাদের খোঁজ করেন এবং পরে প্রশাসন ও ফায়ার সার্ভিসকে খবর দেওয়া হয়।
ঘটনার পর থেকে উদ্ধার অভিযানে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যদের পাশাপাশি রংপুর থেকে আসা ডুবুরি দল অংশ নেয়। নদীর পানিতে তল্লাশি চালিয়ে প্রথমে শর্মির মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরে স্রোতের সঙ্গে ভেসে যাওয়া বৃষ্টির মরদেহও উদ্ধার করা সম্ভব হয়।
দিনাজপুর কোতয়ালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ নুরনবী জানান, বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে দুই শিশুর জানাজা একসঙ্গে অনুষ্ঠিত হয়। পরে তাদের পারিবারিক গোরস্থানে পাশাপাশি দাফন করা হয়েছে।
একই গ্রামের দুই শিশুর একসঙ্গে দাফনের দৃশ্য ছিল অত্যন্ত বেদনাবিধুর। স্বজনদের পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দারাও জানাজায় অংশ নেন। ছোট বয়সে দুই শিশুর এমন মৃত্যুতে পুরো এলাকায় নেমে আসে শোক। তাদের সহপাঠী ও পরিচিতজনদের মধ্যেও দেখা দেয় গভীর বেদনা।
শিশুদের পানিতে ডুবে মৃত্যুর ঘটনা বাংলাদেশে নতুন নয়। বর্ষা মৌসুমে নদী, খাল, পুকুর ও জলাশয়ে পানির পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় শিশুদের জন্য ঝুঁকিও বাড়ে। অনেক সময় সাঁতার না জানা, পানির গভীরতা সম্পর্কে ধারণা না থাকা কিংবা স্রোতের গতি বুঝতে না পারার কারণে দুর্ঘটনা ঘটে। আবার পরিচিত জলাশয় হলেও বর্ষায় পানির পরিস্থিতি বদলে যাওয়ায় আগের তুলনায় বিপদ বেড়ে যেতে পারে।
এ ধরনের দুর্ঘটনা প্রতিরোধে শিশুদের পানির কাছাকাছি যাওয়ার সময় অভিভাবকদের নজরদারি এবং স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতা বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে। বিশেষ করে নদী বা প্রবল স্রোতযুক্ত জলাশয়ে শিশুদের একা গোসল করতে না দেওয়া এবং ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে স্থানীয়ভাবে সাঁতার শেখার সুযোগ তৈরি এবং পানিতে দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে দ্রুত উদ্ধারব্যবস্থা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।
দিনাজপুরের আত্রাই নদীর এই ঘটনা আবারও মনে করিয়ে দিল, কয়েক মুহূর্তের অসতর্কতা একটি পরিবারের সারাজীবনের শোকের কারণ হয়ে উঠতে পারে। শর্মি ও বৃষ্টির পরিবারের কাছে বৃহস্পতিবারের সকালটি তাই অন্য সব দিনের চেয়ে আলাদা। জানাজা শেষে পাশাপাশি কবরে শায়িত হয়েছে দুই শিশু। তাদের হাসি, পড়াশোনা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে পরিবারের যে স্বপ্ন ছিল, তা থেমে গেছে নদীর স্রোতের সঙ্গে।
এখন পরিবারের সদস্যদের সামনে শুধু স্মৃতি আর শোক। আর এই ঘটনা স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্যও সতর্কবার্তা হয়ে থাকল—নদী যতই পরিচিত হোক, বর্ষার স্রোত ও গভীর পানির কাছে সামান্য অসতর্কতাও ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে।