গুম দিবসে সংসদ অভিমুখে ১১ দলের পথযাত্রা

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২৭ আগস্ট, ২০২৬
  • ৫২ বার
গুম দিবসে সংসদ অভিমুখে ১১ দলের পথযাত্রা

প্রকাশ: ২৭ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

আন্তর্জাতিক গুম দিবস উপলক্ষে রাজধানীতে কর্মসূচি ঘোষণা করেছে ১১ দলীয় ঐক্যজোট। আগামী রোববার (৩০ আগস্ট) শাহবাগ থেকে জাতীয় সংসদ অভিমুখে পথযাত্রা করবে জোটটি। বুধবার (২৬ আগস্ট) রাজধানীর মিন্টো রোডে বিরোধীদলীয় নেতার বাসভবনে অনুষ্ঠিত ১১ দলীয় ঐক্যের জরুরি বৈঠক শেষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ কর্মসূচির ঘোষণা দেওয়া হয়।

সংবাদ সম্মেলনে বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম কর্মসূচির বিষয়টি জানান। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক গুম দিবস উপলক্ষে আগামী ৩০ আগস্ট শাহবাগ থেকে জাতীয় সংসদ অভিমুখে পথযাত্রা করবে ১১ দলীয় জোট। গুমের শিকার ব্যক্তি ও তাঁদের পরিবারের প্রতি সংহতি জানানো এবং গুম ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিচার ও জবাবদিহির দাবিকে সামনে রেখে এই কর্মসূচি পালন করা হবে বলে জানান তিনি।

গুম বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে একটি স্পর্শকাতর ও মানবিক ইস্যু হিসেবে আলোচিত। কোনো ব্যক্তির নিখোঁজ হয়ে যাওয়া এবং দীর্ঘ সময় ধরে তাঁর অবস্থান সম্পর্কে পরিবারের সদস্যদের নিশ্চিত তথ্য না পাওয়ার ঘটনা শুধু একটি পরিবারের জন্য নয়, বরং সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্যও গভীর উদ্বেগের বিষয়। বিশেষ করে রাজনৈতিক আন্দোলন, মতপ্রকাশ কিংবা বিরোধী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নিখোঁজ হওয়ার অভিযোগ বিভিন্ন সময়ে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচনায় এসেছে।

আন্তর্জাতিক গুম দিবসকে সামনে রেখে ১১ দলীয় জোটের এই কর্মসূচি তাই রাজনৈতিক কর্মসূচির পাশাপাশি মানবাধিকার ইস্যুতেও গুরুত্ব বহন করছে। শাহবাগ থেকে সংসদ অভিমুখে পথযাত্রার মাধ্যমে জোটটি গুমের ঘটনা, মানবাধিকার সুরক্ষা এবং এসব ঘটনার তদন্ত ও বিচার নিয়ে নিজেদের অবস্থান আরও স্পষ্ট করতে চাইছে।

সংবাদ সম্মেলনে নাহিদ ইসলাম গুম ও মানবাধিকার নিয়ে বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) উত্থাপিত হতে যাওয়া একটি বিল নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। তাঁর দাবি, প্রস্তাবিত আইনটি ২০০৯ সালের মানবাধিকার আইনের তুলনায় দুর্বল। বিশেষ করে গুমের ঘটনার তদন্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে রাখার উদ্যোগের সমালোচনা করেন তিনি।

নাহিদ ইসলামের বক্তব্য অনুযায়ী, গুমের মতো গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের তদন্তের ক্ষেত্রে স্বাধীন ও কার্যকর প্রক্রিয়া থাকা প্রয়োজন। তদন্তের দায়িত্ব এমন কোনো প্রতিষ্ঠানের হাতে থাকা উচিত নয়, যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠার সম্ভাবনা রয়েছে—এমন উদ্বেগও তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে। তাঁর মতে, তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়া যথাযথভাবে পরিচালিত না হলে ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর ন্যায়বিচার পাওয়ার প্রত্যাশা বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

তিনি আরও অভিযোগ করেন, জাতীয় মানবাধিকার কমিশনে দলীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে লোকজন নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। এতে প্রতিষ্ঠানটির স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি। মানবাধিকার রক্ষায় রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থাকা প্রয়োজন বলেও তিনি মত দেন।

নাহিদ ইসলাম বলেন, মানবাধিকার কমিশনে রাজনৈতিক প্রভাব তৈরি হলে মানুষের অধিকার রক্ষার পরিবর্তে প্রতিষ্ঠানটি রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের মধ্যে চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাঁর অভিযোগ, অতীতের কর্তৃত্ববাদী সময়ের তুলনায়ও দুর্বল আইন তৈরির চেষ্টা করা হচ্ছে। এ ধরনের আইন গুম ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় বিচার ও জবাবদিহির পথকে শক্তিশালী করার পরিবর্তে আরও দুর্বল করতে পারে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

তবে প্রস্তাবিত আইন নিয়ে নাহিদ ইসলামের বক্তব্য তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানের অংশ। আইনটির প্রকৃত কার্যকারিতা, তদন্তব্যবস্থা এবং মানবাধিকার সুরক্ষায় এর ভূমিকা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট আইন, বিধান ও সংসদীয় আলোচনাই চূড়ান্ত ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হবে। রাজনৈতিক দলগুলোর বক্তব্যের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও সরকারের অবস্থানও এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

১১ দলীয় ঐক্যজোটের জরুরি বৈঠকে দেশের চলমান রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পরিস্থিতি নিয়েও আলোচনা হয়েছে বলে জানা গেছে। বৈঠক শেষে সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আজাদও বক্তব্য দেন। তিনি চলমান বিভিন্ন সংকট মোকাবিলায় দেশে কোনো দায়িত্বশীল সরকার নেই বলে মন্তব্য করেন।

হামিদুর রহমান আজাদের এই বক্তব্যও দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে জোটটির অবস্থানকে সামনে এনেছে। তাঁর মতে, বিভিন্ন ক্ষেত্রে যে সংকট তৈরি হয়েছে, তা মোকাবিলায় কার্যকর রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও দায়িত্বশীল সরকারের প্রয়োজন রয়েছে। তবে তাঁর বক্তব্যের বিস্তারিত ব্যাখ্যা সংবাদ সম্মেলনে পাওয়া যায়নি।

রাজধানীর শাহবাগ থেকে জাতীয় সংসদ অভিমুখে পথযাত্রার কর্মসূচি ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। শাহবাগ রাজধানীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। এই এলাকা থেকে সংসদ অভিমুখে বড় কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি হলে তা স্বাভাবিকভাবেই জনসাধারণের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। কর্মসূচিতে অংশগ্রহণকারীদের সংখ্যা, পথযাত্রার সময়সূচি এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রশাসনের প্রস্তুতিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

আন্তর্জাতিক গুম দিবস মূলত জোরপূর্বক নিখোঁজের শিকার ব্যক্তিদের স্মরণ এবং এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে সচেতনতা তৈরির একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ। গুমের অভিযোগের সঙ্গে জড়িত পরিবারগুলোর জন্য দীর্ঘ অপেক্ষা, অনিশ্চয়তা ও মানসিক চাপ একটি বড় মানবিক বাস্তবতা। অনেক পরিবার বছরের পর বছর প্রিয়জনের অবস্থান জানতে অপেক্ষা করে। কেউ জীবিত আছেন কি না, কোথায় আছেন কিংবা তাঁর সঙ্গে কী ঘটেছে—এসব প্রশ্নের উত্তর না পাওয়ার যন্ত্রণা পরিবারগুলোর জীবনে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে।

এ কারণে আন্তর্জাতিক গুম দিবসকে কেন্দ্র করে আয়োজিত কর্মসূচিতে মানবিক বিষয়গুলো সামনে আসা স্বাভাবিক। ১১ দলীয় জোটের ঘোষিত পথযাত্রাও সেই প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক দাবির পাশাপাশি মানবাধিকার ও জবাবদিহির প্রশ্নকে সামনে আনছে।

এদিকে কর্মসূচি শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করা এবং জনসাধারণের চলাচলে যাতে বড় ধরনের সমস্যা তৈরি না হয়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। রাজধানীর ব্যস্ত সড়কে রাজনৈতিক কর্মসূচি হলে যান চলাচলে সাময়িক চাপ সৃষ্টি হতে পারে। ফলে আয়োজকদের শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা জরুরি।

১১ দলীয় ঐক্যজোটের এই কর্মসূচির মধ্য দিয়ে গুম ও মানবাধিকার ইস্যুতে রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান আরও প্রকাশ্যে আসতে পারে। একই সঙ্গে প্রস্তাবিত আইন, মানবাধিকার কমিশনের স্বাধীনতা, গুমের অভিযোগের তদন্ত এবং ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর ন্যায়বিচারের প্রশ্নও আলোচনায় থাকবে। কর্মসূচির মাধ্যমে রাজনৈতিক দাবিগুলোর পাশাপাশি এসব মানবিক বিষয়ে জনমত তৈরির চেষ্টা করবে জোটটি।

৩০ আগস্টের পথযাত্রা শেষ পর্যন্ত কী ধরনের রাজনৈতিক বার্তা দেয় এবং এতে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ কতটা হয়, সেদিকেও নজর থাকবে রাজনৈতিক মহলের। একই সঙ্গে গুমের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, ভুক্তভোগী পরিবারের তথ্য জানার অধিকার এবং মানবাধিকার সুরক্ষায় কার্যকর প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার প্রশ্নটি সামনে রেখে কর্মসূচিটি কতটা জনসম্পৃক্ততা তৈরি করতে পারে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

আন্তর্জাতিক গুম দিবসের মতো একটি সংবেদনশীল দিনে রাজনৈতিক কর্মসূচির কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবার ও তাঁদের দীর্ঘদিনের অপেক্ষার বিষয়টি। রাজনৈতিক মতপার্থক্যের বাইরে মানবিক মর্যাদা, আইনের শাসন এবং নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি যে কোনো গণতান্ত্রিক সমাজেই গুরুত্বপূর্ণ। ১১ দলীয় জোটের ঘোষিত পথযাত্রা সেই দাবিগুলোকে কতটা কার্যকর রাজনৈতিক আলোচনায় নিয়ে আসে, এখন সেটিই দেখার বিষয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com