ইস্টার্ন রিফাইনারিতে আইডিবির ১০০ কোটি ডলার ঋণ

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ২৮ আগস্ট, ২০২৬
  • ১৫ বার
ইস্টার্ন রিফাইনারিতে আইডিবির ১০০ কোটি ডলার ঋণ

প্রকাশ: ২৮ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার এবং পরিশোধিত জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরতা কমাতে ইস্টার্ন রিফাইনারির দ্বিতীয় ইউনিট নির্মাণের উদ্যোগ এবার বাস্তবায়নের পথে এগোচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় থাকা এই প্রকল্পে ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (আইডিবি) প্রায় ১০০ কোটি ডলারের বেশি অর্থায়ন করতে যাচ্ছে। এ অর্থায়নের মাধ্যমে চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় দেশের একমাত্র রাষ্ট্রীয় অপরিশোধিত তেল শোধনাগারের পরিশোধন সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণ প্রকল্পের দ্বিতীয় ইউনিট নির্মাণে আইডিবির অর্থায়ন চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়া এগিয়েছে। জুলাই মাসে সরকারের নন-কনসেশনাল ঋণসংক্রান্ত কমিটি আইডিবির কাছ থেকে প্রায় ১ দশমিক ০০৪ বিলিয়ন ডলারের ঋণ নেওয়ার প্রস্তাব অনুমোদন করে। ঋণের অর্থ মূলত ইস্টার্ন রিফাইনারির দ্বিতীয় ইউনিট নির্মাণে ব্যবহার করা হবে।

আইডিবির এই অর্থায়ন বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও এটি সাধারণ স্বল্পসুদের উন্নয়ন ঋণের মতো নয়। সংশ্লিষ্ট নথি অনুযায়ী, ঋণটি তুলনামূলক কঠিন শর্তে বা উচ্চ ব্যয়ের অর্থায়ন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। অর্থায়নের একটি অংশের ক্ষেত্রে ছয় মাস মেয়াদি এসওএফআর সূচকের সঙ্গে নির্দিষ্ট মার্জিন যুক্ত হবে। ঋণের মেয়াদ ২০ বছর, যার মধ্যে পাঁচ বছর গ্রেস পিরিয়ড এবং পরবর্তী ১৫ বছরে কিস্তিতে অর্থ পরিশোধের কাঠামো রয়েছে। ফলে প্রকল্পের অর্থনৈতিক সুফল নিশ্চিত করার পাশাপাশি ঋণের আর্থিক বোঝাও বিবেচনায় রাখতে হবে।

ইস্টার্ন রিফাইনারির দ্বিতীয় ইউনিট নির্মাণের মূল লক্ষ্য দেশের অভ্যন্তরে অপরিশোধিত তেল পরিশোধনের সক্ষমতা বাড়ানো। বর্তমানে রাষ্ট্রীয় এই শোধনাগারের বার্ষিক অপরিশোধিত তেল পরিশোধন সক্ষমতা প্রায় ১৫ লাখ টন। নতুন ইউনিট চালু হলে মোট সক্ষমতা বছরে প্রায় ৪৫ লাখ টনে উন্নীত হওয়ার কথা রয়েছে। অর্থাৎ বর্তমান সক্ষমতার তুলনায় দেশে তিন গুণ অপরিশোধিত তেল পরিশোধনের সুযোগ তৈরি হবে।

বাংলাদেশের জ্বালানি ব্যবস্থায় এই সক্ষমতা বৃদ্ধি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেলের প্রয়োজন হলেও অপরিশোধিত ও পরিশোধিত জ্বালানির বড় অংশ বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। দেশীয়ভাবে বেশি পরিমাণ অপরিশোধিত তেল পরিশোধন করা গেলে সরাসরি পরিশোধিত ডিজেল, অকটেন, ফার্নেস অয়েলসহ বিভিন্ন পেট্রোলিয়াম পণ্য আমদানির চাপ কমানো সম্ভব হবে।

ইস্টার্ন রিফাইনারির দ্বিতীয় ইউনিট নিয়ে পরিকল্পনাটি অবশ্য নতুন নয়। প্রায় দেড় দশক ধরে প্রকল্পটি বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনায় ছিল। অর্থায়ন ও বাস্তবায়ন কাঠামো নিয়ে জটিলতার কারণে দীর্ঘ সময় এটি এগোয়নি। শেষ পর্যন্ত ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি বা একনেকে ‘মডার্নাইজেশন অ্যান্ড এক্সপ্যানশন অব ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড’ প্রকল্প অনুমোদন করে। প্রকল্পটির প্রাথমিক মোট ব্যয় ধরা হয়েছিল ৩৫ হাজার ৪৬৫ কোটি টাকার বেশি এবং ২০৩০ সালের মধ্যে বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়।

পরবর্তী সময়ে প্রকল্পের প্রশাসনিক অনুমোদন ও বাস্তবায়ন কাঠামোতেও অগ্রগতি হয়েছে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রকল্পটির প্রশাসনিক অনুমোদন দেওয়া হয়। সংশোধিত প্রকল্প কাঠামোয় মোট ব্যয় ৩১ হাজার কোটি টাকার কিছু বেশি নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে সরকারের অর্থায়ন এবং বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের নিজস্ব অর্থের সংস্থান রাখার কথা ছিল। পরবর্তী সময়ে আইডিবির অর্থায়ন যুক্ত হওয়ায় প্রকল্পের অর্থায়ন কাঠামো নিয়ে নতুন সমন্বয়ের প্রয়োজন হয়েছে।

আইডিবির অর্থায়ন চূড়ান্ত হলে দীর্ঘদিনের এই প্রকল্প বাস্তবায়নে বড় ধরনের গতি আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, নতুন ইউনিট চালু হলে দেশের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসতে পারে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত ও পরিশোধিত জ্বালানির দামের পার্থক্য এবং আমদানি ব্যয়ের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে দেশে বেশি পরিমাণ তেল পরিশোধনের সুযোগ তৈরি হলে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ কমানোর সম্ভাবনা রয়েছে।

একটি হিসাব অনুযায়ী, নতুন ইউনিট চালু হলে প্রতি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল পরিশোধনে প্রায় ২০ ডলার পর্যন্ত সাশ্রয় হতে পারে। বছরে এই সাশ্রয়ের পরিমাণ প্রায় ৪৭৩ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে বলে প্রকল্পসংশ্লিষ্ট হিসাব তুলে ধরা হয়েছে। তবে এই সম্ভাব্য সাশ্রয় প্রকল্পটি সময়মতো এবং দক্ষতার সঙ্গে বাস্তবায়ন, উৎপাদন সক্ষমতা ব্যবহার এবং আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করবে।

প্রকল্প বাস্তবায়নে ইতোমধ্যে পরামর্শক নিয়োগের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন আন্তর্জাতিক পর্যায়ের অভিজ্ঞ প্রকৌশল ও পরামর্শক প্রতিষ্ঠানকে প্রকল্প ব্যবস্থাপনার কাজে যুক্ত করার জন্য আগ্রহপত্র আহ্বান করেছে। প্রকল্পের প্রকৌশল, ক্রয় এবং নির্মাণকাজের তদারকি নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক পরামর্শক নিয়োগের এই উদ্যোগকে বাস্তবায়নের গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তুতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।

আইডিবির চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আল জাসের আগামী ২ সেপ্টেম্বর ঢাকায় আসার কথা রয়েছে। তিন দিনের সফরে তিনি বাংলাদেশের শীর্ষ পর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করবেন। এই সফরের সময় জ্বালানি খাতসহ বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থায়ন নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। ইস্টার্ন রিফাইনারি প্রকল্পের ঋণচুক্তি ৩ সেপ্টেম্বর স্বাক্ষরের পরিকল্পনা রয়েছে বলে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ইস্টার্ন রিফাইনারির সম্প্রসারণের সঙ্গে জ্বালানি নিরাপত্তার বিষয়টি সরাসরি জড়িত। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়ে গেলে কিংবা বৈদেশিক মুদ্রার সংকট তৈরি হলে পরিশোধিত জ্বালানি আমদানিতে চাপ পড়ে। তখন দেশে পর্যাপ্ত পরিশোধন সক্ষমতা না থাকায় আমদানির ওপর নির্ভরতা আরও বেড়ে যায়। নতুন ইউনিট চালু হলে অন্তত অপরিশোধিত তেল থেকে স্থানীয়ভাবে বেশি জ্বালানি উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হবে। এতে বৈশ্বিক বাজারের অস্থিরতার সময় দেশের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় কিছুটা স্থিতিশীলতা আনা সম্ভব হতে পারে।

তবে বড় অঙ্কের বিদেশি ঋণে প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ব্যয় ও সময় নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আইডিবির অর্থায়ন তুলনামূলক কঠিন শর্তে হওয়ায় প্রকল্পটি থেকে প্রত্যাশিত অর্থনৈতিক সুফল নিশ্চিত করা জরুরি। নির্মাণে বিলম্ব হলে একদিকে প্রকল্পের ব্যয় বাড়তে পারে, অন্যদিকে ঋণের সুদ ও অন্যান্য আর্থিক ব্যয়ও দীর্ঘমেয়াদে সরকারের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে।

এ কারণে প্রকল্পটির ক্ষেত্রে স্বচ্ছ ক্রয়প্রক্রিয়া, দক্ষ প্রকল্প ব্যবস্থাপনা, সময়মতো নির্মাণকাজ শেষ করা এবং পূর্ণ সক্ষমতায় শোধনাগার পরিচালনার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। শুধু নতুন ইউনিট নির্মাণ করলেই জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে না; পর্যাপ্ত অপরিশোধিত তেল সংগ্রহ, পরিবহন, সংরক্ষণ, আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে ২০৩০ সালের মধ্যে ইস্টার্ন রিফাইনারির সম্প্রসারণ প্রকল্পের সুফল পাওয়ার লক্ষ্য রয়েছে। নতুন ইউনিট চালু হলে বাংলাদেশের অপরিশোধিত তেল পরিশোধন সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে এবং আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থায় একটি কাঠামোগত পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হবে। দীর্ঘদিনের প্রতীক্ষিত এই প্রকল্প তাই শুধু একটি শিল্প স্থাপনা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নয়; বরং দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় এবং ভবিষ্যৎ জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার জন্য একটি কৌশলগত বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত