প্রকাশ: ২৮ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করতে নিজেদের শর্তের তালিকা প্রস্তুত করছে ইরান। মধ্যস্থতাকারীদের পক্ষ থেকে হরমুজ খুলে দেওয়ার বিষয়ে তেহরানের শর্ত জানতে চাওয়ার পর এই তালিকা তৈরি করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সেক্রেটারি মোহসেন রেজাই।
রেজাই জানিয়েছেন, আঞ্চলিক যুদ্ধের অবসান ইরানের অন্যতম প্রধান শর্ত। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালিতে একটি নির্দিষ্ট শিপিং করিডর তৈরির বিষয়ে ওমানের সঙ্গে তেহরানের সমঝোতা হয়েছে। প্রস্তাবিত করিডরের একটি অংশ ওমানের জলসীমা এবং অন্য অংশ ইরানের জলসীমার মধ্য দিয়ে যাবে।
লেবাননের হিজবুল্লাহ-ঘনিষ্ঠ আল মানার টেলিভিশনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে রেজাই বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের শর্তগুলো মেনে নিলে জাহাজগুলো একটি নির্ধারিত কেন্দ্রীয় চ্যানেল ব্যবহার করে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করতে পারবে।
রেজাইয়ের এই বক্তব্য এমন সময়ে এসেছে, যখন কাতারের প্রধানমন্ত্রী তেহরানে আলোচনা চালাচ্ছেন। চলমান সংঘাত প্রশমন এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল পুনরায় চালুর বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সমঝোতার পথ তৈরিতে আঞ্চলিক মধ্যস্থতাকারীরা সক্রিয় ভূমিকা রাখছেন।
ইরানের সরকারি বার্তা সংস্থা ইরনার প্রতিবেদনে রেজাইয়ের বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, ইরানের শর্ত পূরণে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রথমে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। এরপরই তেহরান হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করবে।
তিনি ওয়াশিংটনকে সতর্ক করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি কোনো ধরনের ‘অপতৎপরতা’ শুরু করে, তাহলে ইরান দেশটির সামরিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থের ওপর বড় ধরনের ক্ষতি করতে পারে।
এদিকে হরমুজে প্রস্তাবিত নৌপথের বিষয়ে ইরান ও ওমান এখনো বিস্তারিত আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। বুধবার এক উচ্চপদস্থ সূত্র জানায়, দুই দেশ নৌপথসংক্রান্ত চুক্তির বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কাজ করছে।
এর আগে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস বা আইআরজিসি দাবি করেছিল, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ এবং এর মাধ্যমে অর্জিত রাজস্ব কীভাবে ভাগাভাগি করা হবে, সে বিষয়ে দুই দেশ ঐকমত্যে পৌঁছেছে।
আইআরজিসির এক মুখপাত্রের বক্তব্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোর ওপর থেকে অবরোধ প্রত্যাহার না করা পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি খুলে দেওয়ার বিষয়ে তেহরান রাজি নয়। একই সঙ্গে ক্ষতিপূরণ দেওয়া এবং ইরানের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবিও রয়েছে।
হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হতো। সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে প্রণালিটি দিয়ে জাহাজ চলাচল ব্যাপকভাবে কমে গেছে।
বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহের ক্ষেত্রে হরমুজের গুরুত্বের কারণে দীর্ঘ সময় ধরে নৌপথটি অচল থাকলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম, পরিবহন ব্যয় এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে উপসাগরীয় দেশগুলোর তেল ও গ্যাস রপ্তানির ওপর এর সরাসরি প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এর আগে এপ্রিল ও জুনে ওয়াশিংটন ও তেহরানের ঘোষিত যুদ্ধবিরতি চুক্তির অন্যতম লক্ষ্য ছিল সামুদ্রিক যোগাযোগ ও বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করা। তবে এসব উদ্যোগ দীর্ঘস্থায়ী হয়নি এবং সংঘাতের কারণে হরমুজ দিয়ে স্বাভাবিক নৌ চলাচলও পুনরায় প্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব হয়নি।
বর্তমান পরিস্থিতিতে ওমানের সঙ্গে করিডর তৈরির বিষয়ে ইরানের সম্মতি নতুন কূটনৈতিক উদ্যোগের ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে করিডরটি কার্যকর করতে হলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নিষেধাজ্ঞা, বন্দর অবরোধ, ক্ষতিপূরণ এবং আঞ্চলিক যুদ্ধের মতো একাধিক জটিল বিষয়ে সমঝোতায় পৌঁছাতে হবে।
ইরানের বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, শুধু হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার বিনিময়ে তেহরান কোনো একক সমঝোতায় যেতে চাইছে না। বরং যুদ্ধের অবসান, অর্থনৈতিক চাপ প্রত্যাহার এবং ইরানের বিরুদ্ধে নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপ বন্ধের মতো বৃহত্তর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক শর্তকে আলোচনার অংশ করতে চাইছে দেশটি।
অন্যদিকে আঞ্চলিক মধ্যস্থতাকারীদের তৎপরতা অব্যাহত থাকায় হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে কূটনৈতিক আলোচনার পরিসরও বাড়ছে। তবে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানের মধ্যে বড় ধরনের মতপার্থক্য থাকায় দ্রুত কোনো চূড়ান্ত সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভব হবে কি না, তা এখনো অনিশ্চিত।