যুদ্ধ শেষে মধ্যপ্রাচ্যে কূটনীতিক ফেরাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র

ফারহান ফারাবী
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ২৮ আগস্ট, ২০২৬
  • ১১ বার

প্রকাশ: ২৮ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ইরানের সঙ্গে সাম্প্রতিক যুদ্ধের আগে ও যুদ্ধ চলাকালে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন মার্কিন দূতাবাস থেকে সরিয়ে নেওয়া কূটনীতিক ও কর্মীদের আবার দায়িত্বস্থলে ফেরানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের এই উদ্যোগকে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা কিছুটা কমার এবং ইরানের সঙ্গে নতুন করে পূর্ণমাত্রার সংঘাতে জড়ানোর বিষয়ে ওয়াশিংটনের অনাগ্রহের সম্ভাব্য ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।

দ্য টাইমসের হাতে আসা মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের একটি অভ্যন্তরীণ নথি অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন কূটনৈতিক মিশনে ফরেন সার্ভিস কর্মকর্তাদের ফিরিয়ে নেওয়া এবং যুদ্ধের সময় নেওয়া জরুরি নিরাপত্তাব্যবস্থার কিছু অংশ শিথিল করার প্রক্রিয়া চলতি সপ্তাহেই শুরু হতে পারে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিন মার্কিন কর্মকর্তাও বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

নথিতে বলা হয়েছে, যেসব দেশে মার্কিন কূটনৈতিক মিশনে কর্মীসংখ্যা বাড়ানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে ইসরায়েল, লেবানন, সৌদি আরব, কাতার, জর্ডান, ওমান, ইরাক ও কুয়েত।

মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, বিশ্বজুড়ে তাদের কূটনৈতিক মিশনগুলোর নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যালোচনা করা হয়। সর্বশেষ মূল্যায়নের ভিত্তিতে মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি মিশনে কর্মী মোতায়েনের অবস্থান পরিবর্তন করা হচ্ছে, যাতে কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির লক্ষ্যগুলোও এগিয়ে নেওয়া যায়।

ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের আলোচনা ব্যর্থ হলেও দূতাবাসগুলোতে কর্মী ফেরানোর পরিকল্পনা এগিয়ে নেওয়া হবে। তবে আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার পর ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের বিরুদ্ধে নতুন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের হুমকিও দিয়েছে।

যুদ্ধের আগে কূটনীতিক সরানো

ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা চালানোর এক দিন আগে জেরুজালেমে মার্কিন দূতাবাসের অত্যাবশ্যকীয় নয় এমন কর্মী এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের সরকারি খরচে ইসরায়েল ছাড়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল।

এরপর কয়েক সপ্তাহ ধরে ইরান ও দেশটির আঞ্চলিক মিত্ররা সৌদি আরব, কুয়েত ও ইরাকসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে মার্কিন কূটনৈতিক স্থাপনায় বিস্ফোরক ড্রোন ও রকেট হামলা চালায়। পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন মিশন থেকে কর্মীদের সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেয়। সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে কয়েকটি দেশের কূটনীতিককে দূতাবাসে না গিয়ে নিজ নিজ বাসা থেকে দায়িত্ব পালনের নির্দেশও দেওয়া হয়েছিল।

বর্তমানে সেই ব্যবস্থা ধীরে ধীরে শিথিল করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, কর্মীদের আবার দায়িত্বস্থলে ফেরানোর সিদ্ধান্ত থেকে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতির ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।

তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি দীর্ঘায়িত করা এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা এখনও পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি।

সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সময়ে ইসরায়েলে মার্কিন রাষ্ট্রদূত এবং জো বাইডেন প্রশাসনের সময়ে মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক প্রতিরক্ষা দপ্তরের কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করা ড্যান শাপিরো বলেন, যেসব মিশন থেকে আংশিকভাবে কর্মী সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল, সেখানে তাদের ফিরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত থেকে বোঝা যায়, প্রশাসন মনে করছে যুদ্ধের অবসান ঘটছে।

কোথায় কত কর্মী ফিরবে

মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথমে লেবাননে মার্কিন দূতাবাসে কূটনীতিকদের ফিরিয়ে নেওয়া হবে। তবে সেখানে পুরো কর্মীসংখ্যা ফেরানো হবে না।

পরবর্তী সময়ে ইসরায়েল, জর্ডান ও ওমানের তিনটি দূতাবাসে পূর্ণ কর্মীসংখ্যা ফিরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, কাতার ও লেবাননের মিশনে প্রাথমিকভাবে সর্বোচ্চ ৮৫ শতাংশ কর্মী রাখা হবে। ইরাক, কুয়েত ও বাহরাইনের মিশনে এই হার হবে ৭৫ শতাংশ।

তবে উপসাগরীয় ছয়টি দেশ ও লেবাননে কূটনীতিকদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে কিছু বিধিনিষেধ বহাল থাকবে।

বাইডেন প্রশাসনের সময় ব্যবস্থাপনা-বিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি অব স্টেট জন আর. বাস বলেন, উপসাগরীয় দেশগুলোতে কূটনীতিকদের পরিবারের সদস্যদের নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ বহাল থাকার অর্থ হলো, সরকার এখনও ওই অঞ্চলকে তুলনামূলকভাবে উচ্চঝুঁকির এলাকা হিসেবে বিবেচনা করছে।

তার ভাষায়, ৩০, ৬০ বা ৯০ দিন আগের তুলনায় হুমকি কমেছে, তবে যুদ্ধ শুরুর আগের সময়ের তুলনায় ঝুঁকি এখনও বেশি।

নতুন করে যুদ্ধের আশঙ্কা কি কমছে?

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্য মিশনগুলোতে কর্মীদের ফিরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্তকে অনেক সাবেক মার্কিন কর্মকর্তা নতুন করে বড় ধরনের সামরিক সংঘাত এড়িয়ে চলার ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন। তবে তারা একই সঙ্গে সতর্ক করে বলেছেন, এর অর্থ এই নয় যে ভবিষ্যতে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক বা অন্য কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার সম্ভাবনা পুরোপুরি শেষ হয়ে গেছে।

সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের কর্মকর্তা রবার্ট ড্যানিন বলেন, দূতাবাসের কর্মীদের ফিরিয়ে নেওয়ার অর্থ এই নয় যে ভবিষ্যতে ইরানের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়া থেকে যুক্তরাষ্ট্র একেবারে বিরত থাকবে।

তার মতে, পরিস্থিতি আবার খারাপ হলে যুক্তরাষ্ট্র আগের মতোই কর্মীদের সরিয়ে নিতে পারে।

যুদ্ধের সময় কর্মী সরিয়ে নেওয়ার পর অনেক কূটনীতিক তাদের ভবিষ্যৎ দায়িত্বস্থল সম্পর্কে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য পররাষ্ট্র দপ্তরের ওপর চাপ দিয়েছিলেন। বিশেষ করে সন্তান রয়েছে এমন কর্মকর্তাদের জন্য নতুন শিক্ষাবর্ষের আগে কোথায় অবস্থান করবেন এবং সন্তানদের কোথায় স্কুলে ভর্তি করবেন—এ বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল।

তবে এই চাপ কূটনীতিকদের ফেরানোর সিদ্ধান্তে কতটা প্রভাব ফেলেছে, তা স্পষ্ট নয়।

সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন কূটনীতিকদের ধীরে ধীরে ফিরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ ওয়াশিংটনের কাছে পরিস্থিতি আগের তুলনায় কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এসেছে—এমন একটি মূল্যায়নের ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের অনিশ্চয়তা এবং অঞ্চলজুড়ে নিরাপত্তা ঝুঁকি পুরোপুরি কেটে যায়নি। ফলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতির অবনতি হলে আবারও কর্মী সরিয়ে নেওয়ার মতো জরুরি ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ খোলা রাখছে যুক্তরাষ্ট্র।

বিস্তারিত জানতে আরো পড়ুন>> 

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত