প্রকাশ: ২৮ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের প্রভাবে ইউরোপে যুক্তরাষ্ট্রের অত্যাধুনিক প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধব্যবস্থার ইন্টারসেপ্টর মজুত সংকটজনক পর্যায়ে নেমে গেছে বলে দাবি করেছেন মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগের একজন কর্মকর্তা ও ন্যাটোর একজন কর্মকর্তা। তাদের মতে, ইউরোপে অবস্থানরত মার্কিন বাহিনীর কাছে দীর্ঘস্থায়ী ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা মোকাবিলার জন্য পর্যাপ্ত প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর নেই।
এই পরিস্থিতি ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোর সম্ভাব্য রুশ ক্ষেপণাস্ত্র হামলা মোকাবিলার সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। সংবেদনশীল সামরিক তথ্য নিয়ে কথা বলার অনুমতি না থাকায় ওই দুই কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে এসব তথ্য জানিয়েছেন।
প্যাট্রিয়ট ব্যবস্থা বিশেষ করে উচ্চগতির ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে গুরুত্বপূর্ণ। মার্কিন প্রতিরক্ষা কর্মকর্তার আশঙ্কা, রাশিয়া যদি কোনো ন্যাটো সদস্যদেশের সামরিক সদর দপ্তর, বিদ্যুৎকেন্দ্র বা গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো লক্ষ্য করে ধারাবাহিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়, তাহলে ন্যাটোও ইউক্রেনের মতো কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে পারে।
ওই কর্মকর্তা বলেন, এমন পরিস্থিতিতে ন্যাটোকে পর্যাপ্ত প্রতিরোধ সক্ষমতা ছাড়াই একের পর এক হামলা মোকাবিলা করতে হতে পারে। ইউরোপে থাকা মার্কিন বাহিনীর কাছে দীর্ঘস্থায়ী ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ঠেকানোর মতো পর্যাপ্ত প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর ‘নিশ্চিতভাবেই’ নেই বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
এমনকি একটি মাত্র ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা মোকাবিলা বা লক্ষ্যচ্যুত কোনো রুশ ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকানোর ক্ষেত্রেও ইউরোপে মোতায়েন মার্কিন বাহিনীর সক্ষমতা সীমিত বলে ওই কর্মকর্তা দাবি করেছেন।
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের চলমান সামরিক অভিযানের প্রভাব যে ইউরোপের প্রতিরক্ষা প্রস্তুতিতেও পড়ছে, প্যাট্রিয়টের মজুত কমে যাওয়ার এই তথ্য তারই একটি উদাহরণ। ইউরোপে মোতায়েন যুক্তরাষ্ট্রের কিছু ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী ব্যবস্থা ও ইন্টারসেপ্টর মধ্যপ্রাচ্যে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। সেখানে ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা প্রতিহত করতে যুক্তরাষ্ট্র এবং তার উপসাগরীয় মিত্ররা বিপুলসংখ্যক প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে।
ইরানের কয়েকটি হামলায় মার্কিন সেনাসদস্য নিহত ও আহত হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।
তবে ইউরোপে রাশিয়ার পক্ষ থেকে ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোর বিরুদ্ধে শিগগিরই ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর আশঙ্কা এখনো নেই। এরই মধ্যে রাশিয়াকে ন্যাটোর কোনো সদস্যদেশের সঙ্গে সংঘাত না বাড়ানোর বিষয়ে সতর্ক করতে চলতি সপ্তাহে সিআইএ পরিচালক জন র্যাটক্লিফের গোপন মস্কো সফরের খবর সামনে এসেছে।
রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে র্যাটক্লিফ সরাসরি এমন কোনো বার্তা দিয়েছেন কি না—এ বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প স্পষ্ট মন্তব্য করেননি। তবে তিনি বলেছেন, রাশিয়া ন্যাটোর কোনো দেশে হামলা করবে না।
ইউরোপীয় ও ন্যাটোর কর্মকর্তাদের একটি অংশের ধারণা, ২০৩০ সালের মধ্যে রাশিয়া ন্যাটোভুক্ত কোনো দেশে হামলা চালানোর মতো সামরিক সক্ষমতা অর্জন করতে পারে। সে সময়ের মধ্যে প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টরের উৎপাদনও বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে ইউক্রেন যুদ্ধও রাশিয়ার সামরিক সক্ষমতার ওপর চাপ তৈরি করছে। ইউক্রেনে দীর্ঘদিন ধরে হামলা চালানোর পাশাপাশি একই সময়ে ন্যাটোর বিরুদ্ধে বড় আকারের দীর্ঘস্থায়ী আকাশ অভিযান পরিচালনা করা মস্কোর জন্য কঠিন হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
ন্যাটোর ঊর্ধ্বতন সামরিক মুখপাত্র মার্কিন সেনাবাহিনীর কর্নেল মার্টিন ও’ডনেল অবশ্য ইউরোপে প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত ‘সংকটজনক পর্যায়েরও নিচে’ নেমে যাওয়ার দাবি নাকচ করেছেন। তাঁর বক্তব্য, ন্যাটোর নিজেদের সুরক্ষা এবং ইউক্রেনকে সহায়তা করার মতো পর্যাপ্ত আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে।
পেন্টাগনের প্রধান মুখপাত্র শন পারনেলও মার্কিন অস্ত্রের মজুত কমে যাওয়ার দাবি অস্বীকার করেছেন। তাঁর ভাষ্য, যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রের ঘাটতি নিয়ে যেসব দাবি করা হচ্ছে, সেগুলো সত্য নয় এবং প্রেসিডেন্ট যে সময় ও স্থানে সামরিক অভিযান পরিচালনা করতে চান, তার জন্য প্রয়োজনীয় সক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্রের রয়েছে।
অন্যদিকে ইউক্রেন রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ঠেকাতে আরও প্যাট্রিয়ট চেয়ে আসছে। কিয়েভের দাবি, রাশিয়ার আধুনিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র মোকাবিলায় কার্যকরভাবে সক্ষম প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে প্যাট্রিয়ট অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ।
লন্ডনভিত্তিক সামরিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের গবেষক এড আর্নল্ডের মতে, ইউক্রেনকে প্যাট্রিয়ট সরবরাহের পরিকল্পনা আগে থেকেই ছিল। কিন্তু ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে মধ্যপ্রাচ্যে প্রত্যাশার চেয়ে বেশি ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের ফলে মজুত দ্রুত কমেছে।
ইউরোপে প্যাট্রিয়টের মজুত কমে গেলে রাশিয়ার আধুনিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকানোর বিকল্পও সীমিত হয়ে পড়তে পারে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, রাশিয়া তুলনামূলক কম খরচের ড্রোনের বড় বহর ব্যবহার করে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যস্ত বা দুর্বল করার পর ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করতে পারে।
ধীরগতির ড্রোন মোকাবিলায় ইউক্রেন ও তার কিছু মিত্রের হাতে বিভিন্ন বিকল্প ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র শব্দের গতির পাঁচ গুণেরও বেশি গতিতে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করতে পারে। ফলে সেগুলো শনাক্ত হওয়ার পর প্রতিরোধের জন্য সময় অত্যন্ত কম থাকে।
প্যাট্রিয়ট ব্যবস্থা রাডারের মাধ্যমে ক্ষেপণাস্ত্রের গতিপথ শনাক্ত ও হিসাব করে দ্রুত ইন্টারসেপ্টর ছোড়ে। তবে একটি প্যাট্রিয়ট ব্যাটারি সীমিত একটি এলাকা, যেমন সামরিক ঘাঁটি বা গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রক্ষা করতে পারে; একটি পুরো শহরকে সুরক্ষিত করা এর পক্ষে সম্ভব নয়।
ফ্রান্স ও ইতালির এসএএমপি/টি এনজি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা প্যাট্রিয়টের বিকল্প হতে পারে। তবে এর নতুন সংস্করণ এখনো যুদ্ধক্ষেত্রে পরীক্ষা করা হয়নি এবং বর্তমান সংস্করণের পাল্লাও প্যাট্রিয়টের তুলনায় কম। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের যুদ্ধজাহাজও আকাশ প্রতিরক্ষায় ভূমিকা রাখতে পারে, কিন্তু সেগুলোর অবস্থান, সক্ষমতা এবং সম্ভাব্য ঝুঁকির বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হয়।
২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসনের পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের মজুত থেকে কিয়েভকে প্যাট্রিয়ট সরবরাহ করা হচ্ছে। ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিএসআইএসের হিসাব অনুযায়ী, বাইডেন প্রশাসনের সময়ে ইউক্রেনকে প্রায় ৬০০টি প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর দেওয়া হয়েছিল।
তবে ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধে প্যাট্রিয়টের ব্যবহার আরও ব্যাপক হয়েছে। সিএসআইএসের হিসাবে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ২ হাজার ৩৩০টি প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টরের মধ্যে প্রায় ৬৫ শতাংশ বা ১ হাজার ৫০০টির মতো এই যুদ্ধে ব্যবহৃত হয়েছে।
চলতি বছরে ইউরোপের জন্য নির্ধারিত ক্ষেপণাস্ত্রসহ প্রায় ৬০০টি প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর উৎপাদনের কথা রয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে বছরে ২ হাজার প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
ন্যাটো জানিয়েছে, সেপ্টেম্বরে জার্মানিতে ইউরোপের প্রথম প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন কারখানা চালুর কথা রয়েছে। আগামী বছরের শুরুতে সেখান থেকে সরবরাহ শুরু হতে পারে। প্রথম পর্যায়ে জার্মানি, নেদারল্যান্ডস, রোমানিয়া ও স্পেনের মতো আগে অর্ডার দেওয়া দেশগুলো অগ্রাধিকার পেতে পারে।
তবে গবেষক এড আর্নল্ডের মতে, জার্মানির মতো কিছু দেশ ব্যয়বহুল প্যাট্রিয়ট ব্যবস্থা কিনলেও সেগুলো থেকে ছোড়ার মতো পর্যাপ্ত ইন্টারসেপ্টর হাতে না থাকার বিষয়টি উদ্বেগজনক। জার্মানির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় অবশ্য ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত সম্পর্কে মন্তব্য করেনি।
অন্যদিকে রাশিয়ারও সামরিক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ইউক্রেনে প্রায় প্রতিদিন হামলা চালানোর পাশাপাশি ন্যাটোর কোনো দেশের বিরুদ্ধে দীর্ঘ সময় ধরে বড় ধরনের আকাশ অভিযান পরিচালনা করার সক্ষমতা মস্কোর আছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে ইউক্রেন রাশিয়ার ভূখণ্ডের ভেতরে হামলা চালিয়েছে। এসব ঘটনায় রুশ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কিছু দুর্বলতাও সামনে এসেছে। ফলে ন্যাটোর বিরুদ্ধে কোনো উসকানিমূলক পদক্ষেপ নেওয়ার আগে রুশ নেতৃত্বকে সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া ও ঝুঁকি হিসাব করতে হতে পারে।
এড আর্নল্ডের মতে, ইউরোপের জন্য পরিস্থিতির একটি অস্বস্তিকর বাস্তবতা হলো—রাশিয়ার নিজস্ব সামরিক সীমাবদ্ধতাই আপাতত ন্যাটোর অন্যতম প্রতিরোধক হয়ে উঠতে পারে।