চীন সীমান্তে হ্রদ ভেঙে নেপালে ফের বন্যার শঙ্কা

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ২৮ আগস্ট, ২০২৬
  • ৫৫ বার
চীন সীমান্তে হ্রদ ভেঙে নেপালে ফের বন্যার শঙ্কা

প্রকাশ: ২৮ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

নেপাল-চীন সীমান্তে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যার ক্ষত না শুকাতেই নতুন করে বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে নেপালে। সীমান্তবর্তী এলাকায় বন্যার পানিতে সৃষ্ট একটি বড় প্রাকৃতিক হ্রদ বা ব্যারিয়ার লেকে ভাঙন দেখা দেওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এর ফলে ভুটেকোশি নদীতে আবারও আকস্মিক পানির ঢল নামতে পারে বলে সতর্ক করেছে নেপালি কর্তৃপক্ষ।

নেপালের রসুয়া জেলার চোচেন খোলা ও পুরেপু সাংপো নদীর মিলনস্থলের কাছে এই প্রাকৃতিক হ্রদটি তৈরি হয়েছিল। শুক্রবার নেপালি সেনাবাহিনীর কাছ থেকে হ্রদটি ভেঙে যাওয়ার তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়েছেন রসুয়ার প্রধান জেলা কর্মকর্তা নরেন্দ্র পারিয়ার। খবরটি এমন এক সময়ে এসেছে, যখন মাত্র দুই দিন আগের ভয়াবহ বন্যায় সীমান্তবর্তী রসুয়া ও আশপাশের এলাকায় ব্যাপক প্রাণহানি ও অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

নতুন এই পরিস্থিতি উদ্ধারকাজে নিয়োজিত দলগুলোর জন্যও বড় উদ্বেগ তৈরি করেছে। কারণ, হ্রদে জমে থাকা বিপুল পরিমাণ পানি যদি হঠাৎ করে নিচের দিকে নেমে আসে, তাহলে ভুটেকোশি নদীতে নতুন করে শক্তিশালী পানির স্রোত সৃষ্টি হতে পারে। এতে নদীর তীরবর্তী জনপদ, সড়ক, সেতু ও অন্যান্য স্থাপনা আবারও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

এর আগে বৃহস্পতিবার চীনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছিল, সীমান্তের কাছে তৈরি হওয়া হ্রদটিতে দ্রুত পানি বাড়ছে এবং এটি উপচে পড়ার পাশাপাশি যে কোনো সময় ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। চীনের পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্ত হ্রদটিতে প্রায় ২০ লাখ ঘনমিটার পানি জমেছিল। পরবর্তী তিন দিনে আরও প্রায় ৩০ লাখ ঘনমিটার পানি সেখানে প্রবেশ করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হয়েছিল।

হ্রদটি যে নদীগুলোর মিলনস্থলের কাছে তৈরি হয়েছে, সেগুলোর প্রবাহ নেপালের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। চোচেন খোলা ও পুরেপু সাংপো তিব্বত থেকে প্রবাহিত হয়ে একপর্যায়ে মিলিত হওয়ার পর নেপালে প্রবেশ করে ভুটেকোশি নামে পরিচিত হয়েছে। এই নদী পরে ত্রিশূলী নদীর সঙ্গে যুক্ত হয়। ফলে উজানে হঠাৎ বিপুল পরিমাণ পানি নেমে এলে তার প্রভাব অনেক দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

নেপালের জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ভুটেকোশি নদীতে পানির উচ্চতা বেড়েছে। পরিস্থিতি সরেজমিনে মূল্যায়নের জন্য আকাশপথে নজরদারির প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। ধুনছে ও রসুয়া এলাকায় থাকা হেলিকপ্টার ব্যবহার করে নদী ও আশপাশের ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল পর্যবেক্ষণ করা হবে। হ্রদ থেকে ঠিক কত পরিমাণ পানি বের হয়েছে এবং সেই পানির স্রোত কতটা শক্তিশালী হতে পারে, তা এখনো নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি।

নেপালি কর্তৃপক্ষের জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, নতুন এই ঝুঁকি তৈরি হয়েছে আগের ভয়াবহ বন্যার পরপরই। বুধবার সীমান্তবর্তী এলাকায় হঠাৎ প্রবল পানির স্রোত নেমে আসে। রসুয়া জেলার তিমুরে ও স্যাফ্রুবেশি এলাকায় ভুটেকোশি নদীর পানি ভয়াবহ গতিতে ছুটে গিয়ে সড়ক, সেতু, ভবন, বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ বিভিন্ন অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত করে। অনেক মানুষ নিখোঁজ হন এবং নদীর স্রোতে ভেসে যাওয়া মানুষের সন্ধানে উদ্ধারকারী দলগুলো তখনো কাজ করছিল।

প্রাথমিক বিশ্লেষণে ওই ভয়াবহ বন্যার পেছনে বরফধস, ভূমিধস এবং নদীপথে সাময়িকভাবে পানি আটকে যাওয়ার মতো একাধিক প্রাকৃতিক কারণের সম্ভাবনা বিবেচনা করা হচ্ছে। হিমালয়ের উচ্চাঞ্চলে বরফ ও শিলাখণ্ডের আকস্মিক ধসের ফলে নদীর প্রবাহ সাময়িকভাবে বাধাগ্রস্ত হয়ে পরে বাঁধ ভেঙে গেলে অল্প সময়ে বিপুল পানি নিচের দিকে নেমে আসতে পারে। বুধবারের ঘটনাতেও এমন একটি প্রক্রিয়া কাজ করেছে কি না, তা নিয়ে বিজ্ঞানীরা এখনো বিশ্লেষণ করছেন।

এর মধ্যেই নতুন ব্যারিয়ার লেকের সৃষ্টি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। কারণ, প্রাকৃতিকভাবে তৈরি এই ধরনের হ্রদ সাধারণত স্থায়ী বাঁধের মতো নিরাপদ নয়। ভূমিধস, পাথর, বরফ ও মাটির স্তূপ দিয়ে পানি আটকে গেলে তার ওপর পানির চাপ ক্রমে বাড়তে থাকে। কোনো একপর্যায়ে সেই প্রাকৃতিক বাঁধ দুর্বল হয়ে ভেঙে গেলে অল্প সময়ের মধ্যে বিপুল পরিমাণ পানি নিচের দিকে ছুটে যেতে পারে। এ ধরনের ঘটনাকে কেন্দ্র করে আকস্মিক বন্যা বা ফ্ল্যাশ ফ্লাডের ঝুঁকি তৈরি হয়।

চীনা কর্তৃপক্ষ এরই মধ্যে হ্রদটির ওপর নজরদারি বাড়িয়েছিল। পানির প্রবাহ পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি সম্ভাব্য পরিস্থিতি সম্পর্কে পূর্বাভাস তৈরি এবং বন্যার সম্ভাব্য গতিপথ বিশ্লেষণের কাজও চলছিল। হ্রদটি ভেঙে যাওয়ার খবর পাওয়ার পর নেপালের পক্ষ থেকেও দ্রুত আকাশপথে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এদিকে রসুয়া ও আশপাশের এলাকায় উদ্ধার তৎপরতাও নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। আগের বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক ও সেতুর কারণে দুর্গম এলাকায় পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেক জায়গায় যোগাযোগব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় হেলিকপ্টারের ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। নতুন করে পানির ঢল নামলে উদ্ধারকারী দল, স্থানীয় বাসিন্দা এবং ত্রাণকর্মীদের নিরাপত্তাও ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে।

ভুটেকোশি নদীর নিচের অংশে বসবাসকারী মানুষের জন্যও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। বিশেষ করে নদীর তীরবর্তী নিম্নাঞ্চলগুলোতে হঠাৎ পানি বাড়লে স্থানীয় বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে। একই সঙ্গে ত্রিশূলী নদীর প্রবাহেও এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে শুধু রসুয়া নয়, নদীপথের আরও নিচের এলাকার পরিস্থিতিও নজরদারিতে রাখা হচ্ছে।

নেপালের সাম্প্রতিক দুর্যোগ আবারও হিমালয় অঞ্চলের ভঙ্গুর পরিবেশ ও দ্রুত পরিবর্তনশীল প্রাকৃতিক পরিস্থিতির ঝুঁকি সামনে এনেছে। উচ্চভূমিতে বরফ, হিমবাহ, পাথর ও পানির পারস্পরিক পরিবর্তনের কারণে কখন কোথায় বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি হবে, তা অনেক সময় আগাম নির্ধারণ করা কঠিন। এ কারণে সীমান্তবর্তী ও নদীতীরবর্তী এলাকাগুলোতে দ্রুত সতর্কবার্তা পৌঁছে দেওয়া এবং আকাশপথে নিয়মিত নজরদারি চালানো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

বর্তমানে নেপালি কর্তৃপক্ষের প্রধান লক্ষ্য হলো নতুন হ্রদ ভাঙনের প্রকৃত প্রভাব দ্রুত নির্ধারণ করা এবং সম্ভাব্য দ্বিতীয় দফার বন্যার আগে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে সতর্ক করা। আকাশপথের পর্যবেক্ষণ শেষ হলে হ্রদ থেকে কত পানি বের হয়েছে, নদীর পানির উচ্চতা কতটা বেড়েছে এবং কোন কোন এলাকা নতুন ঝুঁকিতে রয়েছে—এসব বিষয়ে আরও পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যাবে।

এরই মধ্যে ভয়াবহ বন্যায় স্বজন হারানো পরিবারগুলোর উৎকণ্ঠা আরও বেড়েছে। কেউ এখনো নিখোঁজ স্বজনের অপেক্ষায়, কেউ ক্ষতিগ্রস্ত ঘরবাড়ি ও জীবিকা ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করছেন। এমন পরিস্থিতিতে নতুন করে বন্যার আশঙ্কা সাধারণ মানুষের দুর্ভোগকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। উদ্ধারকাজ চলার মধ্যেই প্রকৃতির আরেকটি সম্ভাব্য আঘাত নেপালের সীমান্তবর্তী জনপদগুলোর জন্য নতুন সতর্কবার্তা হয়ে এসেছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com