সংস্কার ও জনদাবিতে রাজপথে নামছে ১১ দলীয় জোট

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ৩১ আগস্ট, ২০২৬
  • ৩ বার
সংস্কার ও জনদাবিতে রাজপথে নামছে ১১ দলীয় জোট

প্রকাশ: ৩১ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বর্তমান সরকারের সাড়ে ছয় মাসের মাথায় রাজপথে বড় ধরনের আন্দোলনের প্রস্তুতি নিচ্ছে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য। সংবিধান সংস্কার, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন এবং গণভোটের রায় কার্যকরের দাবির পাশাপাশি বিদ্যুৎ, জ্বালানি, সার সংকট, দ্রব্যমূল্য ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিসহ বিভিন্ন জনগুরুত্বপূর্ণ ইস্যুকে সামনে রেখে ধারাবাহিক কর্মসূচিতে নামার পরিকল্পনা করেছে জোটটি।

পূর্বঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী আগামী ৫ সেপ্টেম্বর ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম অভিমুখে রোডমার্চের মধ্য দিয়ে আন্দোলনের নতুন ধাপ শুরু করতে চায় ১১ দলীয় ঐক্য। জোটের নেতাদের দাবি, বর্তমান সরকারের সময়ে বিরোধী শক্তি হিসেবে এটি তাদের প্রথম বড় রাজপথের কর্মসূচি। পর্যায়ক্রমে দেশের আরও কয়েকটি বিভাগে একই ধরনের কর্মসূচি পালনের পর রাজধানীতে একটি বড় মহাসমাবেশ আয়োজনের পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

জোটের নেতারা বলছেন, গত কয়েক মাস ধরে সংসদের ভেতরে এবং বাইরে বিভিন্ন সভা-সমাবেশ, বক্তব্য ও বিবৃতির মাধ্যমে তারা সংস্কারসংক্রান্ত দাবিগুলো তুলে ধরেছেন। তবে তাদের অভিযোগ, এসব দাবির বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে প্রত্যাশিত সাড়া পাওয়া যায়নি। এ কারণেই তারা জনসম্পৃক্ত কর্মসূচির মাধ্যমে দাবিগুলো আরও জোরালোভাবে তুলে ধরার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

রাজনৈতিক সংস্কারের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন সমস্যাকেও আন্দোলনের দাবির সঙ্গে যুক্ত করেছে জোটটি। বিদ্যুৎ, তেল ও গ্যাস পরিস্থিতি, জ্বালানি সংকট, কৃষি খাতে সার সরবরাহ এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে জনমনে যে উদ্বেগ রয়েছে, সেগুলোকে রাজপথের কর্মসূচিতে গুরুত্ব দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন নেতারা।

জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির এটিএম আজহারুল ইসলাম বলেছেন, সংসদের ভেতরে গণরায় বাস্তবায়নের বিষয়ে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে বারবার আলোচনা করা হয়েছে। একই সঙ্গে জনসভা ও অন্যান্য রাজনৈতিক কর্মসূচির মাধ্যমে সরকারের কাছে দাবি জানানো হয়েছে। কিন্তু তাদের দাবি অনুযায়ী সরকার কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ায় রাজপথে কর্মসূচি দিতে হয়েছে।

তার ভাষ্য, সংসদে আলোচনার মাধ্যমে যেসব বিষয়ে সমাধান সম্ভব, সেসব প্রশ্নকে রাজপথের আন্দোলনের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন ছিল না। তবে সরকারের অবস্থানের কারণেই পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে তিনি দাবি করেন। বিভিন্ন ক্ষেত্রে বৈষম্য ও জনগণের দুর্ভোগের বিরুদ্ধেও জোটের কর্মসূচি চলবে বলে জানান তিনি।

এর আগে গত ৬ আগস্ট রাজধানীর মুক্তাঙ্গনে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটসহ বিভিন্ন জনগুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে অবস্থান কর্মসূচি পালন করে ১১ দলীয় ঐক্য। সেখান থেকেই গণভোটের রায় বাস্তবায়ন এবং বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গঠনের দাবিতে কয়েকটি বিভাগে রোডমার্চ ও ঢাকায় মহাসমাবেশের কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়।

ঘোষিত পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রথম কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হবে আগামী ৫ সেপ্টেম্বর ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম অভিমুখে। এরপর ১৯ সেপ্টেম্বর রংপুর অভিমুখে, ৩১ অক্টোবর খুলনা-কুষ্টিয়া অঞ্চলে এবং ২১ নভেম্বর ট্রেনযোগে সিলেট মহানগর অভিমুখে কর্মসূচি পালনের পরিকল্পনা রয়েছে। সবশেষে ডিসেম্বর অথবা আগামী জানুয়ারিতে রাজধানীতে একটি বড় মহাসমাবেশ আয়োজনের প্রস্তুতির কথা জানিয়েছেন জোটসংশ্লিষ্টরা।

১১ দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক ও জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলেছেন, সংস্কারসংক্রান্ত গণভোটের রায় বাস্তবায়নের বিষয়টি তারা সংসদে একাধিকবার উত্থাপন করেছেন। তার দাবি, সংসদে এ বিষয়ে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি না হওয়ায় জনগণের কাছে গিয়ে জনমত গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, রোডমার্চের মাধ্যমে একটি বৃহত্তর আন্দোলনের প্রেক্ষাপট তৈরি করার চেষ্টা করা হবে। পাশাপাশি বিভিন্ন দাবির পক্ষে জনসমর্থন আরও বাড়ানোর লক্ষ্য রয়েছে জোটের। দাবি বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন অব্যাহত রাখার কথাও জানিয়েছেন তিনি।

এদিকে প্রথম বড় কর্মসূচি হিসেবে ঢাকা-চট্টগ্রাম রোডমার্চ সফল করতে ব্যাপক প্রস্তুতি চলছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী রাজধানীর শাপলা চত্বরে সকাল ৭টায় সমাবেশের মাধ্যমে কর্মসূচি শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। এরপর গাড়িবহর চট্টগ্রামের উদ্দেশে যাত্রা করবে এবং রাতের দিকে চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানে কর্মসূচি শেষ হওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

রোডমার্চ চলাকালে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে পথসভা আয়োজনের কথাও জানানো হয়েছে। নারায়ণগঞ্জের কাঁচপুর ব্রিজ, কুমিল্লার পদুয়ারবাজার, ফেনীর মহিপাল এবং চট্টগ্রামের মিরসরাইসহ বিভিন্ন এলাকায় নেতারা বক্তব্য দিতে পারেন। এসব কর্মসূচিতে ১১ দলীয় ঐক্যের শীর্ষ নেতাদের উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে।

জোটের নেতারা জানিয়েছেন, কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ ও সুশৃঙ্খলভাবে সম্পন্ন করতে সাংগঠনিক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। নিরাপত্তা, চিকিৎসাসেবা, পরিবহন, প্রচার, তথ্যপ্রযুক্তি, স্বেচ্ছাসেবক এবং প্রশাসনিক যোগাযোগসহ বিভিন্ন দায়িত্ব পালনের জন্য সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করা হয়েছে।

জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেছেন, ৫ সেপ্টেম্বরের ঢাকা-চট্টগ্রাম কর্মসূচি ১১ দলীয় ঐক্যের অন্যতম বড় আয়োজন হতে যাচ্ছে। গণভোটের রায় বাস্তবায়নসহ কয়েকটি প্রধান দাবিকে সামনে রেখে কর্মসূচিটি সফল করতে দলীয় পর্যায়ে প্রস্তুতি চলছে।

তিনি জানান, এর আগে জেলা, উপজেলা ও মহানগর পর্যায়ে কয়েক দফা সভা-সমাবেশ, আলোচনা এবং প্রচার কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছে। এখন আন্দোলনের পরবর্তী ধাপে রোডমার্চের কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে।

জোটের প্রধান দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন, জুলাইয়ের সহিংসতার ঘটনায় বিচার নিশ্চিত করা, বিদ্যুৎ, তেল, গ্যাস ও সারসংকট নিরসন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে দলীয় প্রভাব বন্ধ করা।

গোলাম পরওয়ার জানিয়েছেন, রোডমার্চ চলাকালে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে পথসভা অনুষ্ঠিত হবে। এতে বিপুলসংখ্যক যানবাহন ও নেতাকর্মীর অংশগ্রহণের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের চলাচলে যাতে বড় ধরনের বিঘ্ন না ঘটে, সে বিষয়েও সংগঠনের পক্ষ থেকে পরিকল্পনা করা হয়েছে।

তার মতে, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের চলাচল স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করা হবে এবং কর্মসূচির কারণে সাধারণ মানুষ সাময়িক কোনো ভোগান্তিতে পড়লে তার জন্য সংগঠনের পক্ষ থেকে দুঃখ প্রকাশ করা হয়েছে।

জুলাই সনদ ও সংস্কার বাস্তবায়নের দাবিতে আন্দোলন অব্যাহত রাখার কথা জানিয়েছেন বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামও। তার বক্তব্য অনুযায়ী, প্রথমে ঢাকা-চট্টগ্রাম অঞ্চল থেকে কর্মসূচি শুরু করে পর্যায়ক্রমে অন্যান্য বিভাগে তা সম্প্রসারণ করা হবে। পরবর্তীতে রাজধানীতে বড় মহাসমাবেশের মাধ্যমে আন্দোলনের পরবর্তী কর্মসূচি নির্ধারণ করা হতে পারে।

জোটসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, রোডমার্চে শুধু রাজধানী থেকে যাওয়া নেতাকর্মীরাই নয়, পথের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা থেকেও স্থানীয় নেতাকর্মীরা যোগ দেবেন। জোটের প্রতিটি দল থেকে ব্যাপক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার জন্য সাংগঠনিকভাবে কাজ করা হচ্ছে।

অন্যদিকে রাজপথের কর্মসূচির পাশাপাশি জাতীয় সংসদেও বিরোধী দলের ভূমিকা আরও সক্রিয় করার পরিকল্পনা রয়েছে। সাম্প্রতিক অধিবেশনে বিভিন্ন ইস্যুতে সরকারি ও বিরোধী দলের সদস্যদের মধ্যে উত্তপ্ত পরিস্থিতি তৈরি হয় এবং কয়েকটি বিষয়ে বিরোধী দল আপত্তি ও ওয়াকআউট করে।

বিরোধীদলীয় নেতারা জানিয়েছেন, জনগণের অধিকার ও রাজনৈতিক সংস্কারসংক্রান্ত বিষয়গুলোতে তারা সংসদের ভেতরে আলোচনা চালিয়ে যাবেন। একই সঙ্গে সংসদে সমাধান না হওয়া বিভিন্ন দাবি নিয়ে শান্তিপূর্ণ ও নিয়মতান্ত্রিক কর্মসূচির মাধ্যমে জনগণের কাছে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে ১১ দলীয় ঐক্যের ঘোষিত কর্মসূচিগুলো দেশের রাজনীতিতে নতুন আলোচনা তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে সংস্কার, গণভোটের রায় এবং জীবনযাত্রাসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ইস্যুকে একই আন্দোলনের কাঠামোয় আনার চেষ্টা জোটটির রাজনৈতিক কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

তবে আন্দোলনের কর্মসূচি কতটা জনসম্পৃক্ত হয় এবং সরকার ও অন্যান্য রাজনৈতিক শক্তি এসব দাবির বিষয়ে কী অবস্থান নেয়, তার ওপর আগামী দিনের রাজনৈতিক পরিস্থিতির অনেকটাই নির্ভর করবে। ৫ সেপ্টেম্বরের ঢাকা-চট্টগ্রাম রোডমার্চকে ঘিরে তাই রাজনৈতিক অঙ্গনে বাড়ছে আগ্রহ।

জোটের নেতারা বলছেন, এটি কেবল একটি দিনের কর্মসূচি নয়; বরং ধারাবাহিক রাজনৈতিক আন্দোলনের সূচনা। অন্যদিকে সরকারের পক্ষ থেকে এসব দাবির বিষয়ে কী প্রতিক্রিয়া আসে এবং সংলাপ কিংবা সংসদীয় আলোচনার মাধ্যমে কোনো সমাধানের পথ তৈরি হয় কি না, সেটিও আগামী দিনগুলোতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

সব মিলিয়ে সংস্কার, গণরায় বাস্তবায়ন এবং জনজীবনের বিভিন্ন সংকটকে সামনে রেখে রাজপথে নতুন করে সক্রিয় হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে ১১ দলীয় ঐক্য। আগামী ৫ সেপ্টেম্বরের ঢাকা-চট্টগ্রাম রোডমার্চের মধ্য দিয়ে তাদের এই আন্দোলনের প্রথম বড় পরীক্ষা শুরু হতে যাচ্ছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত