যুক্তরাষ্ট্র থেকে আরও বোয়িং উড়োজাহাজ কিনছে বাংলাদেশ

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ৩১ আগস্ট, ২০২৬
  • ৫ বার
যুক্তরাষ্ট্র থেকে আরও বোয়িং উড়োজাহাজ কিনছে বাংলাদেশ

প্রকাশ: ৩১ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ঢাকা ও ওয়াশিংটনের মধ্যকার বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের নতুন প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আরও বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার বড় পরিকল্পনার কথা সামনে এসেছে। ভারতে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত সার্জিও গরের এক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পোস্টকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের বোয়িং কেনার নতুন সম্ভাব্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। তার দাবি অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে হওয়া একটি নতুন সমঝোতার অংশ হিসেবে বাংলাদেশ মার্কিন উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িং থেকে বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে আরও উড়োজাহাজ কেনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

তবে সম্ভাব্য এই নতুন চুক্তির বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত কোনো আনুষ্ঠানিক তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। ফলে কতটি উড়োজাহাজ কেনা হবে, কোন কোন মডেলের উড়োজাহাজ যুক্ত হতে পারে এবং চুক্তির মোট আর্থিক মূল্য কত হবে—এসব বিষয়ে এখনো স্পষ্টতা নেই। বিষয়টি সামনে আসার পর বাংলাদেশের জাতীয় পতাকাবাহী বিমান সংস্থার বহর সম্প্রসারণ, আন্তর্জাতিক রুট বৃদ্ধি এবং ভবিষ্যৎ বিমান পরিবহন সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

গত রোববার রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে সার্জিও গর বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি হয়েছে, যার আওতায় বাংলাদেশ বোয়িংয়ের উড়োজাহাজ কেনায় বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ব্যয় করবে। তিনি দাবি করেন, নতুন এই প্রতিশ্রুতির পরিমাণ বাংলাদেশের আগের বোয়িং অর্ডারের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।

তার বক্তব্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সময়ে দুই দেশের শীর্ষ পর্যায়ের আলোচনার পর এই সমঝোতা হয়েছে। তবে পোস্টে উড়োজাহাজের সংখ্যা, মডেল কিংবা সরবরাহের সম্ভাব্য সময়সূচি সম্পর্কে কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি।

বিমান পরিবহন খাতে বড় ধরনের বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত একটি দেশের দীর্ঘমেয়াদি যোগাযোগ ও অর্থনৈতিক পরিকল্পনার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ দেশের আন্তর্জাতিক বিমান পরিবহন বাজার দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। বিদেশে বসবাসকারী বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি, ব্যবসা-বাণিজ্যের সম্প্রসারণ, পর্যটন এবং নতুন আন্তর্জাতিক গন্তব্যে সরাসরি ফ্লাইট চালুর সম্ভাবনার কারণে জাতীয় বিমান সংস্থার সক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা দীর্ঘদিন ধরেই আলোচিত।

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বহর আধুনিকীকরণ এবং সম্প্রসারণের পরিকল্পনা নতুন নয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সংস্থাটি নতুন উড়োজাহাজ যুক্ত করে আন্তর্জাতিক রুটে কার্যক্রম বাড়ানোর চেষ্টা করেছে। বিশেষ করে দীর্ঘপাল্লার রুট পরিচালনার জন্য আধুনিক উড়োজাহাজের প্রয়োজনীয়তা ক্রমেই বাড়ছে।

বোয়িংয়ের সঙ্গে বাংলাদেশের বিদ্যমান পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এর আগে নতুন উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে বাণিজ্য আলোচনার ধারাবাহিকতায় ২০২৫ সালের জুলাইয়ে বিমানের বহর আধুনিকীকরণ ও সম্প্রসারণ পরিকল্পনায় বোয়িং উড়োজাহাজের সংখ্যা ১৪টি থেকে বাড়িয়ে ২৫টিতে উন্নীত করার উদ্যোগের কথা সামনে আসে।

পরবর্তীতে বোয়িংয়ের সঙ্গে ১৪টি নতুন উড়োজাহাজ কেনার বিষয়ে চুক্তির তথ্য প্রকাশিত হয়। ওই পরিকল্পনায় দীর্ঘপাল্লার আন্তর্জাতিক রুটের জন্য বোয়িং ৭৮৭-১০ ড্রিমলাইনার এবং ৭৮৭-৯ ড্রিমলাইনারের পাশাপাশি স্বল্প ও মধ্যম দূরত্বের রুট পরিচালনার জন্য বোয়িং ৭৩৭-৮ ম্যাক্স উড়োজাহাজ অন্তর্ভুক্ত ছিল।

তথ্য অনুযায়ী, চুক্তির আওতায় আটটি বোয়িং ৭৮৭-১০ ড্রিমলাইনার, দুটি বোয়িং ৭৮৭-৯ ড্রিমলাইনার এবং চারটি বোয়িং ৭৩৭-৮ ম্যাক্স জেট কেনার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। এসব উড়োজাহাজের বাজারমূল্য প্রায় ৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার হিসেবে উল্লেখ করা হয়, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকার সমপরিমাণ।

চুক্তির সম্ভাব্য সময়সূচি অনুযায়ী, প্রথম উড়োজাহাজটি ২০৩১ সালের নভেম্বরের মধ্যে বাংলাদেশে পৌঁছানোর কথা ছিল। পরবর্তী উড়োজাহাজগুলো ধাপে ধাপে ২০৩৫ সালের অক্টোবরের মধ্যে বিমানের বহরে যুক্ত হওয়ার পরিকল্পনা ছিল। তবে নতুন সমঝোতার দাবি সামনে আসার পর আগের পরিকল্পনার সঙ্গে নতুন প্রতিশ্রুতির সম্পর্ক কী হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

বিমান পরিবহন বিশেষজ্ঞদের মতে, বহরে নতুন উড়োজাহাজ যুক্ত করার সিদ্ধান্ত শুধু উড়োজাহাজ কেনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িত থাকে নতুন রুট পরিকল্পনা, পাইলট ও প্রকৌশলী প্রশিক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ অবকাঠামো, বিমানবন্দর সক্ষমতা এবং দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক ব্যবস্থাপনা।

বিশেষ করে আধুনিক প্রশস্ত কাঠামোর উড়োজাহাজ পরিচালনার জন্য আন্তর্জাতিক রুটে পর্যাপ্ত যাত্রী চাহিদা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নতুন উড়োজাহাজ যুক্ত হলে ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার বিভিন্ন গন্তব্যে বাংলাদেশের সরাসরি ফ্লাইট সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য উন্নত বিমান যোগাযোগও এ ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসকারী বাংলাদেশিরা নিয়মিত দেশে যাতায়াত করেন। অনেক ক্ষেত্রেই সরাসরি ফ্লাইটের সীমাবদ্ধতার কারণে তাদের অতিরিক্ত সময় ও অর্থ ব্যয় করতে হয়। বহরে আধুনিক ও দীর্ঘপাল্লার উড়োজাহাজ বাড়লে নতুন গন্তব্যে সরাসরি যোগাযোগের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।

সার্জিও গর গত ৩০ জুলাই থেকে ১ আগস্ট পর্যন্ত বাংলাদেশ সফর করেন। সফরের কয়েক সপ্তাহ পর তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পোস্টে বোয়িং কেনার নতুন প্রতিশ্রুতির কথা উঠে আসে। তবে এই দাবির বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের সংশ্লিষ্ট কোনো মুখপাত্রের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

এ কারণে সম্ভাব্য চুক্তির বিস্তারিত আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত বিষয়টি নিয়ে নানা প্রশ্ন রয়ে গেছে। বিশেষ করে নতুন করে কতটি উড়োজাহাজ কেনা হবে, বিদ্যমান অর্ডারের সঙ্গে সেগুলো কীভাবে যুক্ত হবে এবং অর্থায়নের কাঠামো কী হবে—এসব তথ্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও বোয়িং কেনার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ভারসাম্য এবং দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক সম্পর্ক নিয়ে বিভিন্ন সময়ে আলোচনা হয়েছে। বড় ধরনের মার্কিন পণ্য ও প্রযুক্তি কেনার সিদ্ধান্ত দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বিমান বহর সম্প্রসারণ নিয়ে নতুন করে নীতিগত আলোচনা শুরু হয়। এর আগে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ১০টি এয়ারবাস উড়োজাহাজ কেনার একটি নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর নতুন পরিস্থিতিতে উড়োজাহাজ কেনার পরিকল্পনা পুনর্বিবেচনার বিষয়টি সামনে আসে।

পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ব্যবধান কমানো এবং দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করার প্রেক্ষাপটে বোয়িংয়ের উড়োজাহাজ কেনার পরিকল্পনা গুরুত্ব পেতে শুরু করে। এই প্রেক্ষাপটেই বাংলাদেশের বিমান বহর সম্প্রসারণের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক স্বার্থের বিষয়টিও আলোচনায় আসে।

তবে এত বড় আর্থিক বিনিয়োগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, প্রয়োজনীয়তা এবং দীর্ঘমেয়াদি লাভজনকতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নতুন উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্তের সঙ্গে যাত্রী চাহিদা, আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা এবং বিমান পরিচালনার ব্যয়ও বিবেচনায় নিতে হবে।

বাংলাদেশের বিমান খাত বর্তমানে এমন এক সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যখন নতুন আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ এবং বিদ্যমান রুটগুলোতে সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। আধুনিক উড়োজাহাজ বহরে যুক্ত হলে দেশের বিমান পরিবহন খাতের সক্ষমতা বাড়তে পারে এবং জাতীয় পতাকাবাহী সংস্থাটি আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় আরও শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করতে পারে।

অন্যদিকে, বড় আকারের উড়োজাহাজ কেনার ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক দায় এবং পরিচালন ব্যয়ের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। একটি নতুন উড়োজাহাজ কেনার পাশাপাশি সেটি পরিচালনা, রক্ষণাবেক্ষণ এবং দক্ষ জনবল তৈরিতে বিপুল বিনিয়োগ প্রয়োজন হয়। ফলে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও বাজার বিশ্লেষণের ওপর নির্ভর করবে এই বিনিয়োগ কতটা কার্যকর হবে।

যুক্তরাষ্ট্র থেকে আরও বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার বিষয়ে নতুন তথ্য সামনে এলেও এখনো চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বিবরণ প্রকাশিত হয়নি। সরকারি পর্যায় থেকে বিস্তারিত ব্যাখ্যা পাওয়া গেলে বাংলাদেশের বিমান খাতের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে আরও পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যাবে।

তবে সার্জিও গরের বক্তব্য সত্যি হলে এটি বাংলাদেশের বিমান পরিবহন ইতিহাসে অন্যতম বড় উড়োজাহাজ কেনার উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। আধুনিক বহর, নতুন আন্তর্জাতিক রুট এবং উন্নত যাত্রীসেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্য বাস্তবায়িত হলে এর সুফল পেতে পারেন দেশ-বিদেশে যাতায়াতকারী লাখো বাংলাদেশি।

এখন সবার দৃষ্টি থাকবে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সম্ভাব্য এই নতুন চুক্তি সম্পর্কে আনুষ্ঠানিক বিস্তারিত তথ্য প্রকাশের দিকে। উড়োজাহাজের সংখ্যা, মডেল, মূল্য এবং সরবরাহের সময়সূচি পরিষ্কার হওয়ার পরই বোঝা যাবে বাংলাদেশের বিমান পরিবহন খাতের জন্য এই নতুন প্রতিশ্রুতি কতটা বড় পরিবর্তন নিয়ে আসতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত