নেপাল-তিব্বতে বন্যা-ভূমিধসে মৃত ৯১৯

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ৩১ আগস্ট, ২০২৬
  • ৭ বার
নেপাল-তিব্বতে বন্যা-ভূমিধসে মৃত ৯১৯

প্রকাশ: ৩১ আগস্ট  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

নেপাল ও চীনের তিব্বত অঞ্চলে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৯১৯ জনে দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে নেপালে ৯০৩ জন এবং তিব্বতে ১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সঙ্গে দুই অঞ্চলে নিখোঁজ রয়েছেন ৪ হাজার ৭৯৩ জন। ধ্বংসস্তূপ, কাদামাটি ও উত্তাল নদীর কারণে দুর্গত এলাকায় উদ্ধারকাজ চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। নিখোঁজদের মধ্যে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের শত শত কর্মী এবং বিভিন্ন দেশের নাগরিক রয়েছেন।

গত ২৬ আগস্ট হিমালয় অঞ্চলে একটি হিমবাহ ধসে বিপুল পরিমাণ পানি, বরফ, পাথর ও কাদামাটি নদীগুলোতে নেমে আসে। মুহূর্তের মধ্যে নদীর পানি অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গিয়ে নেপাল ও তিব্বতের সীমান্তবর্তী বিস্তীর্ণ এলাকায় ভয়াবহ বন্যা সৃষ্টি হয়। পানির প্রবল স্রোতে ঘরবাড়ি, সেতু, সড়কসহ গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় বহু মানুষ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন।

নেপালের জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, দেশটিতে ৯০৩ জনের মৃত্যু নিশ্চিত হয়েছে। নিখোঁজ রয়েছেন ৪ হাজার ২৪৭ জন। নিখোঁজদের মধ্যে ৫৯২ জন বিদেশি নাগরিকও রয়েছেন। দেশটির বিভিন্ন জেলায় উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রয়েছে এবং বিপুলসংখ্যক নিরাপত্তাকর্মী এতে অংশ নিচ্ছেন।

নেপালে নিখোঁজদের মধ্যে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের ৯৩৩ জন কর্মী রয়েছেন বলে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। পাহাড়ি নদী ও ভূগর্ভস্থ টানেলে পানি ও ধ্বংসাবশেষ ঢুকে পড়ায় এসব কর্মীর সন্ধান ও উদ্ধারে বিশেষ চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। কয়েকটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের টানেলে আটকে পড়া কর্মীদের উদ্ধারে বিশেষজ্ঞ দলও কাজ করছে।

উদ্ধারকাজে নেপালের সেনাবাহিনী, পুলিশ ও সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের পাশাপাশি হেলিকপ্টার ব্যবহার করা হচ্ছে। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় অনেক স্থানে আকাশপথই হয়ে উঠেছে ত্রাণ ও উদ্ধারকাজের প্রধান মাধ্যম। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এরই মধ্যে হাজার হাজার মানুষকে দুর্গত এলাকা থেকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

এদিকে চীনের তিব্বত অঞ্চলেও বন্যা ও ভূমিধসের ভয়াবহ প্রভাব পড়েছে। চীনা কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সেখানে ১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং ৫৪৬ জন এখনো নিখোঁজ রয়েছেন। নিখোঁজদের মধ্যে ২৬১ জন বিদেশি নাগরিক বলে চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে। তাদের মধ্যে শতাধিক নেপালি নাগরিকও রয়েছেন।

তিব্বতে নিখোঁজ বিদেশিদের অনেকে সেখানে কর্মসংস্থানের জন্য গিয়েছিলেন। কেউ পাহাড়ি এলাকায় ভ্রমণ করছিলেন, আবার কেউ ধর্মীয় তীর্থযাত্রায় অংশ নিতে গিয়েছিলেন। ফলে নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধানে নিজ নিজ দেশের সরকার ও পরিবারগুলোর মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। সীমান্তবর্তী দুর্গম এলাকায় যোগাযোগব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় তাদের অবস্থান নিশ্চিত করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।

প্রাকৃতিক দুর্যোগের এই ভয়াবহতায় শুধু প্রাণহানিই নয়, ব্যাপক অবকাঠামোগত ক্ষতিও হয়েছে। প্রবল পানির স্রোতে অনেক সড়ক ও সেতু ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। বিভিন্ন বসতিতে কাদামাটি ও পাথরের স্তূপ জমে গেছে। কোথাও কোথাও নদীর গতিপথও পরিবর্তিত হয়েছে। ফলে উদ্ধারকারী দলকে একদিকে নিখোঁজদের খুঁজতে হচ্ছে, অন্যদিকে নতুন করে বন্যা বা ভূমিধসের আশঙ্কার মধ্যেও কাজ করতে হচ্ছে।

নেপালের ভোতে কোশি নদীর পানি বাড়তে থাকায় নতুন করে বন্যার সতর্কতাও জারি করা হয়েছে। এতে দুর্গত এলাকার মানুষের মধ্যে আতঙ্ক আরও বেড়েছে। উদ্ধারকর্মীদের আশঙ্কা, নদীর পানি আবারও বাড়লে ইতোমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় নতুন করে বিপর্যয় দেখা দিতে পারে। একই সঙ্গে পাহাড়ি ঢালে জমে থাকা মাটি ও ধ্বংসাবশেষ নেমে এসে আরও ভূমিধসের ঝুঁকি তৈরি করছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, হিমালয় অঞ্চলে হিমবাহ ও পাহাড়ি ভূপ্রকৃতির অস্থিতিশীলতা এ ধরনের বিপর্যয়ের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। সাম্প্রতিক ঘটনাটি এমন এক প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত, যেখানে হিমবাহের অংশ ধসে পড়ার পর বিপুল পরিমাণ বরফ ও পাথর নিচের দিকে নেমে এসে নদীগুলোতে আকস্মিক পানিপ্রবাহ সৃষ্টি করে। বিজ্ঞানীরা স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণ করে জানিয়েছেন, হিমবাহের নিচের শিলাস্তরের ধসও এই বিপর্যয়ের পেছনে ভূমিকা রেখেছে।

দুর্যোগের মাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে উদ্ধার অভিযানে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তাও সামনে এসেছে। স্থানীয় উদ্ধারকারীদের পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের সন্ধান ও পরিচয় শনাক্তে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। নিখোঁজদের তালিকা যাচাই, উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের পরিচয় নিশ্চিত করা এবং নিহতদের মরদেহ শনাক্ত করাও এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

নেপাল সরকারের পক্ষ থেকে দুর্গত এলাকাগুলোতে জরুরি ত্রাণ ও আর্থিক সহায়তা পাঠানো হচ্ছে। উদ্ধার অভিযানের পাশাপাশি খাদ্য, চিকিৎসা সরঞ্জাম, জ্বালানি ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। হেলিকপ্টারের মাধ্যমে দুর্গম এলাকায় ত্রাণ পৌঁছানোর কাজও অব্যাহত রয়েছে।

এই দুর্যোগে সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা এখনো নিখোঁজ হাজারো মানুষকে ঘিরে। পরিবারের সদস্যরা প্রিয়জনের কোনো খবরের আশায় অপেক্ষা করছেন। কেউ উদ্ধারকাজের খবর জানতে দুর্গত এলাকায় ছুটে যাচ্ছেন, আবার কেউ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন স্বজনের সন্ধানে প্রশাসনের কাছে তথ্য দিচ্ছেন। উদ্ধারকারী দলগুলোও প্রতিকূল আবহাওয়া, দুর্গম ভূখণ্ড এবং নতুন করে বন্যার আশঙ্কার মধ্যেই যত দ্রুত সম্ভব নিখোঁজদের সন্ধানের চেষ্টা করছে।

নেপাল ও তিব্বতের এই ভয়াবহ বিপর্যয় আবারও দেখিয়ে দিয়েছে, হিমালয়ের মতো উচ্চঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় আগাম সতর্কতা, দ্রুত উদ্ধারব্যবস্থা এবং সীমান্তপারের সমন্বিত প্রস্তুতি কতটা গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমই সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার। তবে পানি ও ভূমির পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণ চিত্র পাওয়া কঠিন হবে। নিখোঁজদের সন্ধান এবং দুর্গত মানুষের পুনর্বাসন শেষ না হওয়া পর্যন্ত এই বিপর্যয়ের মানবিক ক্ষতও সহজে কাটবে না।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত