প্রকাশ: ৩১ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) আল মিনহাদ বিমানঘাঁটিতে মার্কিন সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে ড্রোন হামলা চালানোর দাবি করেছে ইরান। সোমবার ভোর থেকে ওই ঘাঁটিতে অবস্থানরত মার্কিন সামরিক সদস্য ও হেলিকপ্টারের অবস্থান লক্ষ্য করে কয়েক ডজন ড্রোন ছোড়া হয়েছে বলে দাবি করেছে ইরানের সেনাবাহিনী। লরাক দ্বীপে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার প্রতিশোধ হিসেবে এই অভিযান চালানো হয়েছে বলে জানিয়েছে তেহরান।
ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন ও দেশটির কয়েকটি সংবাদ সংস্থার প্রতিবেদনে সেনাবাহিনীর জনসংযোগ বিভাগের একটি বিবৃতির বরাত দিয়ে হামলার তথ্য প্রকাশ করা হয়। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ভোররাত থেকে আল মিনহাদ ঘাঁটির এমন সব এলাকায় ড্রোন হামলা চালানো হয়, যেখানে মার্কিন সামরিক সদস্য ও হেলিকপ্টার অবস্থান করছিল। তবে হামলায় হতাহত বা ক্ষয়ক্ষতির সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি। সংযুক্ত আরব আমিরাতের পক্ষ থেকেও ইরানের দাবির বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
ইরানের এই দাবি এমন এক সময়ে সামনে এলো, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কয়েক সপ্তাহের তুলনামূলক স্থবিরতার পর আবার সরাসরি সামরিক সংঘাত তীব্র হয়ে উঠেছে। রোববার যুক্তরাষ্ট্র ইরানের দক্ষিণাঞ্চলের লরাক দ্বীপে দুটি ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা লক্ষ্য করে হামলা চালায়। মার্কিন কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কোর বা আইআরজিসির সদস্যরা হরমুজ প্রণালিতে নৌমাইন ছোড়ার জন্য রকেট প্রস্তুত করছিলেন। সেই সম্ভাব্য হুমকি ঠেকাতেই মার্কিন বাহিনী হামলা চালিয়েছে বলে ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
লরাক দ্বীপে ওই হামলার পর ইরানের আইআরজিসি জানায়, মার্কিন হামলায় তাদের কয়েকজন সদস্য ও বেসামরিক মানুষ নিহত ও আহত হয়েছেন। তবে হতাহতের সুনির্দিষ্ট সংখ্যা জানানো হয়নি। একই সঙ্গে হামলার প্রতিশোধ নেওয়ার অঙ্গীকার করে ইরানের বিপ্লবী গার্ড। এর পরই মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্য করে ইরানের পাল্টা হামলার দাবি সামনে আসতে থাকে।
এর আগে ইরান জর্ডানে অবস্থিত দুটি মার্কিন ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানোর দাবি করেছে। ইরানের বিপ্লবী গার্ড জানিয়েছে, লরাক দ্বীপে মার্কিন হামলার জবাব হিসেবে জর্ডানের কিং হুসেইন ও আল-আজরাক ঘাঁটি লক্ষ্য করা হয়। জর্ডানের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তাদের আকাশসীমায় প্রবেশ করা আটটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা হয়েছে। এসব হামলায় বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে কি না, তা নিয়ে দুই পক্ষের বক্তব্যে পার্থক্য রয়েছে।
এই পরিস্থিতির মধ্যেই সংযুক্ত আরব আমিরাতের আল মিনহাদ বিমানঘাঁটিকে লক্ষ্য করে ড্রোন হামলার দাবি করেছে ইরান। ইরানের সেনাবাহিনীর ভাষ্য অনুযায়ী, মার্কিন সামরিক সদস্য ও হেলিকপ্টার যেখানে অবস্থান করছিল, সেসব এলাকাকেই হামলার লক্ষ্যবস্তু করা হয়। ইরানি সেনাবাহিনী এটিকে লরাক দ্বীপে নিহত আইআরজিসি সদস্য ও বেসামরিক নাগরিকদের মৃত্যুর প্রতিশোধ হিসেবে বর্ণনা করেছে।
আল মিনহাদ বিমানঘাঁটি সংযুক্ত আরব আমিরাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও বিমান পরিবহন স্থাপনা। উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য মিত্র দেশের সামরিক কার্যক্রমের সঙ্গে ঘাঁটিটির কৌশলগত গুরুত্ব রয়েছে। ফলে ইরানের দাবি সত্য হলে এটি দুই দেশের চলমান সংঘাতকে আরও বিস্তৃত ভৌগোলিক পরিসরে নিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত দিতে পারে। তবে হামলার প্রকৃত মাত্রা, কোনো মার্কিন সামরিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কি না এবং হতাহতের ঘটনা ঘটেছে কি না—এসব বিষয়ে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত তথ্য এখনো সীমিত।
বর্তমান পরিস্থিতির সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিকগুলোর একটি হলো হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে সামরিক উত্তেজনা। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ এই জলপথ দিয়ে বিপুল পরিমাণ তেল ও গ্যাস আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ করা হয়। লরাক দ্বীপ হরমুজ প্রণালির কাছাকাছি অবস্থিত হওয়ায় সামরিক সংঘাতের প্রভাব সরাসরি বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল ও বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, লরাক দ্বীপে হামলার লক্ষ্য ছিল এমন উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা ধ্বংস করা, যেগুলো ব্যবহার করে হরমুজ প্রণালিতে নৌমাইন ছড়িয়ে দেওয়া হতে পারে। মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, এ ধরনের পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক নৌযান চলাচলের জন্য তাৎক্ষণিক হুমকি তৈরি করতে পারে। ওয়াশিংটন একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ জলপথে বাণিজ্যিক চলাচল স্বাভাবিক রাখার প্রস্তুতির কথাও জানিয়েছে।
অন্যদিকে তেহরান যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপকে আগ্রাসন হিসেবে দেখছে। ইরানের বিপ্লবী গার্ডের বক্তব্য অনুযায়ী, লরাক দ্বীপে মার্কিন হামলায় সামরিক সদস্যদের পাশাপাশি বেসামরিক মানুষও হতাহত হয়েছেন। এর প্রতিক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অবস্থানগুলোকে লক্ষ্য করে পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরান।
আল মিনহাদে হামলার দাবি এবং জর্ডানে মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে ইরানের হামলার খবর মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। এতদিন সংঘাতের বড় অংশ ইরান, ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি বা পরোক্ষ সামরিক তৎপরতাকে কেন্দ্র করে থাকলেও এখন উপসাগরীয় অঞ্চলের মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোও ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে। এতে সংযুক্ত আরব আমিরাত, জর্ডানসহ যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক মিত্র দেশগুলো আরও বড় নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।
বিশেষ করে উপসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোতে হামলার আশঙ্কা বাড়লে যুক্তরাষ্ট্রকে তার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আরও জোরদার করতে হতে পারে। একই সঙ্গে এসব ঘাঁটি থেকে পরিচালিত বিমান ও সামরিক কার্যক্রমও নতুন নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়বে। এর ফলে আঞ্চলিক সংঘাত নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তে আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।
এদিকে নতুন করে সামরিক উত্তেজনা বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। হরমুজ প্রণালিতে নৌযান চলাচল নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়লে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের সরবরাহ ও মূল্য—দুই ক্ষেত্রেই চাপ তৈরি হতে পারে। এর প্রভাব জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশগুলোর পাশাপাশি পরিবহন, শিল্প ও খাদ্যপণ্যের বাজারেও ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে।
সব মিলিয়ে লরাক দ্বীপে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর ইরানের পাল্টা সামরিক তৎপরতা এখন জর্ডান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত পর্যন্ত বিস্তৃত হওয়ার দাবি উঠেছে। তবে আল মিনহাদে হামলার বিষয়ে ইরানের বক্তব্যের পাশাপাশি আমিরাত ও যুক্তরাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া এবং স্বাধীনভাবে যাচাই করা ক্ষয়ক্ষতির তথ্য সামনে আসা গুরুত্বপূর্ণ। পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তনশীল হওয়ায় পরবর্তী কয়েক ঘণ্টা ও দিনগুলোতে নতুন করে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হয় কি না, সেটিই এখন মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।