প্রকাশ: ৩১ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মাগুরার আট বছরের শিশু আছিয়াকে ধর্ষণ ও হত্যার মামলায় প্রধান আসামি হিটু শেখের মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখেছেন হাইকোর্ট। সোমবার হাইকোর্টের বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামান রাজার সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ এ রায় ঘোষণা করেন।
শিশু আছিয়ার ওপর সংঘটিত নির্মম নির্যাতন ও পরবর্তী মৃত্যুর ঘটনায় করা মামলাটি শুরু থেকেই দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছিল। মাত্র আট বছর বয়সী একটি শিশুর সঙ্গে এমন সহিংসতার ঘটনায় দ্রুত বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি উঠেছিল বিভিন্ন মহল থেকে। নিম্ন আদালতের দেওয়া মৃত্যুদণ্ড এবার উচ্চ আদালতেও বহাল থাকায় মামলাটির বিচারিক প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি ধাপ সম্পন্ন হলো।
এর আগে গত ২৫ আগস্ট মামলাটির রায় ঘোষণার দিন ধার্য ছিল। তবে রাষ্ট্রপক্ষের সময় আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত রায় ঘোষণার জন্য ৩১ আগস্ট দিন নির্ধারণ করেন। নির্ধারিত দিনে শুনানি শেষে হাইকোর্ট মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখার সিদ্ধান্ত জানান।
মামলার নথি ও আদালতসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, মাগুরা সদর উপজেলার নিজনান্দুয়ালী এলাকায় বোনের বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিল শিশু আছিয়া। গত বছরের ৫ মার্চ রাতে সেখানে সে ধর্ষণের শিকার হয়। মামলার অভিযোগে বলা হয়, শিশুটির বোনের শ্বশুর হিটু শেখ তাকে ধর্ষণের পর হত্যার চেষ্টা করেন।
ঘটনার পর গুরুতর অবস্থায় শিশুটিকে চিকিৎসার জন্য নেওয়া হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে ঢাকায় সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আট বছরের আছিয়ার মৃত্যু হয়। একটি শিশুর এমন মর্মান্তিক মৃত্যু পরিবার, স্থানীয় মানুষ এবং দেশজুড়ে গভীর শোক ও ক্ষোভের সৃষ্টি করে।
আছিয়ার মা বাদী হয়ে হিটু শেখসহ চারজনের বিরুদ্ধে মামলা করেন। তদন্ত শেষে পুলিশ ২০২৫ সালের ১৩ এপ্রিল আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে। মামলায় হিটু শেখকে প্রধান আসামি করা হয়। পরবর্তী সময়ে আদালত অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরু করেন এবং ২৩ এপ্রিল আনুষ্ঠানিকভাবে বিচারিক কার্যক্রম শুরু হয়।
মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয় ২৭ এপ্রিল। রাষ্ট্রপক্ষ মোট ২৯ জন সাক্ষীকে আদালতে হাজির করে। ৭ মে সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়। এরপর মামলার যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের পর্যায় আসে। দ্রুত বিচারিক কার্যক্রম শেষ হওয়ায় মামলাটি বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হয়। মাত্র ১৩ কার্যদিবসে বিচারিক কার্যক্রম শেষ করার পর গত বছরের ১৩ মে মাগুরার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে শেষ দিনের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করা হয়।
এর চার দিন পর, ১৭ মে মামলার রায় ঘোষণা করেন ট্রাইব্যুনালের বিচারক এম জাহিদ হাসান। রায়ে শিশু আছিয়া ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় হিটু শেখকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। একই সঙ্গে তাকে এক লাখ টাকা জরিমানা করা হয়।
তবে মামলার অপর তিন আসামিকে খালাস দেন বিচারিক আদালত। তারা হলেন নিহত শিশুর বোনের স্বামী সজীব শেখ, তার ছোট ভাই এবং তাদের মা জাহেদা বেগম। আদালতের রায়ের পর হিটু শেখের মৃত্যুদণ্ড অনুমোদনের জন্য মামলার নথি উচ্চ আদালতে পাঠানো হয়।
বাংলাদেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী, বিচারিক আদালত কোনো আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দিলে সেই সাজা কার্যকর করার আগে উচ্চ আদালতের অনুমোদন প্রয়োজন। এ কারণে মামলার নথি হাইকোর্টে পাঠানো হয়। ২০২৫ সালের ২১ মে মামলার নথি উচ্চ আদালতে পৌঁছায়। প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই শেষে মামলার পেপারবুক প্রস্তুতের জন্য নথি বিজি প্রেসে পাঠানো হয়।
পেপারবুক প্রস্তুত হওয়ার পর গত ৮ জুন তা হাইকোর্টে পাঠানো হয়। এরপর মামলাটি শুনানির জন্য সংশ্লিষ্ট বিশেষায়িত বেঞ্চের কার্যতালিকায় আসে। হাইকোর্টে মামলাটির শুনানির সময় রাষ্ট্রপক্ষ নিম্ন আদালতের রায় বহাল রাখার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে। অন্যদিকে হিটু শেখের পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী আদালতে আসামির পক্ষে বক্তব্য উপস্থাপন করেন।
রাষ্ট্রপক্ষে মামলাটি পরিচালনা করেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ইমাম হোসেন তারেক। তাঁকে সহযোগিতা করেন সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল রোহানী সিদ্দীকা ও মাহবুবা তাসনিম আঁখি। হিটু শেখের পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী হিসেবে ছিলেন হাফিজুর রহমান খান।
হাইকোর্টের রায়ে মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকার মধ্য দিয়ে মামলাটির বিচারিক প্রক্রিয়া আরও এক ধাপ এগিয়েছে। তবে মৃত্যুদণ্ডের ক্ষেত্রে হাইকোর্টের রায়ের পরও আইনগতভাবে আরও কিছু প্রক্রিয়া থাকে। সংশ্লিষ্ট পক্ষ উচ্চ আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বা অন্যান্য আইনগত প্রতিকার চাইতে পারে। ফলে চূড়ান্তভাবে সাজা কার্যকর হওয়ার আগে আইন অনুযায়ী পরবর্তী ধাপগুলো সম্পন্ন হওয়ার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।
শিশু আছিয়ার ঘটনা বাংলাদেশের সমাজে শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে আবারও গভীর প্রশ্ন সামনে এনেছে। পরিবারে বেড়াতে যাওয়া কিংবা পরিচিত মানুষের আশ্রয়ে থাকা একটি শিশুও যে কখনো কখনো ভয়াবহ ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে, এই ঘটনা তার নির্মম উদাহরণ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে শিশুদের ওপর যৌন সহিংসতা প্রতিরোধে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের সমন্বিত দায়িত্বের বিষয়টি নতুন করে সামনে এসেছে।
শিশুদের বিরুদ্ধে যৌন নির্যাতনের ঘটনায় বিচার নিশ্চিত করা যেমন জরুরি, তেমনি ঘটনার আগেই ঝুঁকি শনাক্ত করা এবং শিশুদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করাও গুরুত্বপূর্ণ। অনেক শিশু ভয়, সামাজিক চাপ কিংবা অপরাধীর প্রভাবের কারণে নির্যাতনের কথা প্রকাশ করতে পারে না। ফলে পরিবার ও সমাজের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের শিশুদের আচরণগত পরিবর্তন ও নিরাপত্তার বিষয়ে সচেতন থাকা প্রয়োজন।
আছিয়ার পরিবারের জন্য আদালতের রায় কোনোভাবেই হারানো শিশুকে ফিরিয়ে দিতে পারবে না। একটি শিশুর মৃত্যু যে শূন্যতা তৈরি করে, কোনো সাজাই তা পূরণ করতে পারে না। তবে বিচারপ্রক্রিয়ায় অপরাধের দায় নির্ধারণ এবং আইন অনুযায়ী শাস্তি নিশ্চিত হওয়া পরিবারের জন্য ন্যায়বিচারের প্রত্যাশাকে কিছুটা এগিয়ে নেয়।
এই মামলায় বিচারিক আদালত থেকে হাইকোর্ট পর্যন্ত তুলনামূলক দ্রুত বিচারিক অগ্রগতি বিশেষভাবে লক্ষণীয়। অভিযোগপত্র দাখিল থেকে সাক্ষ্যগ্রহণ, যুক্তিতর্ক এবং রায়—প্রতিটি ধাপ নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। শিশু ও নারী নির্যাতনের মতো গুরুতর মামলায় বিচারপ্রক্রিয়ায় অযথা দীর্ঘসূত্রতা যেন ভুক্তভোগী পরিবারকে আরও দীর্ঘ অপেক্ষার মধ্যে না ফেলে, সে বিষয়টিও এ মামলার প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
হিটু শেখের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখার হাইকোর্টের সিদ্ধান্ত এখন পরবর্তী আইনগত প্রক্রিয়ার দিকে এগোবে। চূড়ান্তভাবে মামলাটির নিষ্পত্তি এবং সাজা কার্যকরের ক্ষেত্রে উচ্চ আদালতের পরবর্তী সিদ্ধান্ত ও আইনগত প্রক্রিয়াই এখন গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে এই মামলার মাধ্যমে শিশুদের নিরাপত্তা, যৌন সহিংসতা প্রতিরোধ এবং দ্রুত ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তাও আবার সামনে এসেছে।
আছিয়ার অকাল মৃত্যু একটি পরিবারের স্বপ্ন থামিয়ে দিয়েছে। কিন্তু সেই মর্মান্তিক ঘটনা যেন কেবল একটি মামলার রায়েই সীমাবদ্ধ না থাকে—শিশুদের জন্য আরও নিরাপদ পরিবেশ তৈরির সামাজিক অঙ্গীকারেও পরিণত হয়, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা।