পার্বত্য চট্টগ্রামে বিদ্যুৎ উন্নয়নে এডিবির ঋণ

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৫৫ বার
পার্বত্য চট্টগ্রামে বিদ্যুৎ উন্নয়নে এডিবির ঋণ

প্রকাশ: ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম এলাকাগুলোতে নির্ভরযোগ্য ও সাশ্রয়ী বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়াতে ১৭ কোটি ৫০ লাখ মার্কিন ডলারের সহজ শর্তের ঋণ অনুমোদন করেছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। এই অর্থের মাধ্যমে খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবান জেলার দুর্গম ২৬টি উপজেলায় বিদ্যুৎ বিতরণব্যবস্থা সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়নের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

দীর্ঘদিন ধরে ভৌগোলিক দুর্গমতা ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে পার্বত্য চট্টগ্রামের বহু এলাকায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সুবিধা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে আছে। দেশের অধিকাংশ এলাকায় বিদ্যুতের সংযোগ পৌঁছে গেলেও পাহাড়ি এই অঞ্চলে গ্রিডভিত্তিক বিদ্যুতের আওতা তুলনামূলকভাবে কম। নতুন প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বিদ্যুৎ সুবিধার পাশাপাশি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ব্যবসা-বাণিজ্য ও স্থানীয় মানুষের জীবিকার ক্ষেত্রেও ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।

‘সাসটেইনেবল এনার্জি ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড কমিউনিটি এমপাওয়ারমেন্ট ইন দ্য চট্টগ্রাম হিল ট্র্যাক্টস’ নামের প্রকল্পটির মাধ্যমে অন্তত ৮৮ হাজার নতুন পরিবারকে বিদ্যুৎ সংযোগের আওতায় আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এসব পরিবারের মধ্যে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর প্রায় ৩৫ হাজার পরিবার রয়েছে। ফলে প্রকল্পটি শুধু বিদ্যুৎ অবকাঠামো সম্প্রসারণের উদ্যোগ নয়, দুর্গম ও পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।

প্রকল্পের আওতায় ৮০ মেগাভোল্ট-অ্যাম্পিয়ার সক্ষমতার ছয়টি ৩৩/১১ কিলোভোল্ট উপকেন্দ্র নির্মাণ করা হবে। একই সঙ্গে কম বিদ্যুৎ অপচয়কারী কন্ডাক্টর ব্যবহার করে প্রায় ৫ হাজার ৩২ কিলোমিটার নতুন বিতরণ লাইন নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এতে নতুন এলাকায় বিদ্যুৎ পৌঁছানোর পাশাপাশি বিদ্যুৎ সরবরাহের সক্ষমতাও বাড়বে।

পুরোনো অবকাঠামোর আধুনিকায়নেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে প্রকল্পে। এ জন্য ১ হাজার ৮৭৪ কিলোমিটার বিতরণ লাইন, চারটি উপকেন্দ্র, একটি সুইচিং স্টেশন এবং একটি আঞ্চলিক মেরামত কর্মশালা আধুনিকায়ন করা হবে। এসব কাজ শেষ হলে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থার কারিগরি ক্ষতি কমার পাশাপাশি পরিচালন ব্যয় কমবে এবং সামগ্রিক গ্রিড দক্ষতা বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।

পার্বত্য অঞ্চলে প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি হওয়ায় প্রকল্পে দুর্যোগ সহনশীল বিদ্যুৎব্যবস্থার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় ঝড়, অতিবৃষ্টি, ভূমিধসসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে বিদ্যুৎ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। নতুন প্রযুক্তি ও উন্নত অবকাঠামোর মাধ্যমে এসব ঝুঁকি মোকাবিলায় বিদ্যুৎব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে।

এডিবির হিসাবে, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে প্রতি বছর প্রায় ১৯ হাজার ৩০০ টন কার্বন ডাই-অক্সাইড সমপরিমাণ গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন এড়ানো সম্ভব হবে। অর্থাৎ বিদ্যুৎ সরবরাহ সম্প্রসারণের পাশাপাশি পরিবেশ সুরক্ষার বিষয়টিও প্রকল্পের অন্যতম লক্ষ্য হিসেবে রাখা হয়েছে।

বাংলাদেশে এডিবির কান্ট্রি ডিরেক্টর কিংফেং ঝ্যাং বলেছেন, নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ কর্মসংস্থান, ব্যবসা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নের পাশাপাশি স্থানীয় জনগোষ্ঠীর দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তার মতে, প্রকল্পটির মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম এলাকার মানুষ নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সুবিধা পাওয়ার পাশাপাশি জীবিকার সুযোগও বাড়াতে পারবে।

প্রকল্পে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানোর বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। কমিউনিটি সংগঠনগুলোর মাধ্যমে অন্তত ৩০টি সৌরবিদ্যুৎচালিত নিরাপদ পানির ব্যবস্থা স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। এসব ব্যবস্থাপনায় নেতৃত্বের পদে অন্তত ৩০ শতাংশ নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এর ফলে বিদ্যুৎ ও পানি সুবিধার পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে নারীর অংশগ্রহণ ও নেতৃত্বের সুযোগও বাড়তে পারে।

ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষের ব্যবহৃত বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে বিদ্যুৎ বিভ্রাটের সময় বিকল্প পরিচ্ছন্ন জ্বালানি সরবরাহের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। এ জন্য অন্তত ২০টি প্রতিষ্ঠানকে সৌরবিদ্যুতের বিকল্প ব্যবস্থার আওতায় আনা হবে। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে স্কুল, হাসপাতাল, মন্দির ও ক্লিনিক রয়েছে। দুর্গম এলাকায় জরুরি স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম সচল রাখতে এই উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

শুধু অবকাঠামো নির্মাণ নয়, স্থানীয় মানুষের আয় ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির বিষয়েও প্রকল্পে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অন্তত এক হাজার মানুষকে জীবিকা উন্নয়নবিষয়ক প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি ২০০ জনের বেশি উদ্যোক্তাকে ব্যবসা সম্প্রসারণ ও বিকাশে সহায়তা দেওয়ার কথা রয়েছে। জ্বালানি খাত ও দুর্যোগ সহনশীল জ্বালানি ব্যবস্থা সম্পর্কে ৩০০ শিক্ষার্থীকে দিকনির্দেশনা দেওয়ারও উদ্যোগ থাকবে।

গ্রাহকসেবার মান উন্নয়নেও নেওয়া হবে বিভিন্ন পদক্ষেপ। প্রকল্পের আওতায় তিনটি গ্রাহক অভিযোগ কেন্দ্র এবং ডিজিটাল পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা স্থাপন করা হবে। পাশাপাশি তিনটি শিশুযত্নকেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থার পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ, গ্রাহকসেবা, নিরাপত্তা এবং দুর্যোগ সহনশীল প্রযুক্তি বিষয়ে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের কর্মীদের প্রশিক্ষণও দেওয়া হবে।

পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রায় ১৮ লাখ ৪০ হাজার মানুষের বসবাস। এই জনগোষ্ঠীর অর্ধেকের বেশি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সদস্য। দেশের জাতীয় পর্যায়ে বিদ্যুতায়নের হার প্রায় ৯৯ শতাংশ হলেও পাহাড়ি এই অঞ্চলে গ্রিডভিত্তিক বিদ্যুতের সুবিধা এখনও অনেক পিছিয়ে। বর্তমানে খাগড়াছড়িতে গ্রিড বিদ্যুতের আওতায় প্রায় ৪৯ শতাংশ মানুষ, রাঙামাটিতে ৪৩ শতাংশ এবং বান্দরবানে ৪১ শতাংশ মানুষ রয়েছে।

প্রকল্পটি বাস্তবায়নের মাধ্যমে ২০৩২ সালের মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রামে গ্রিডভিত্তিক বিদ্যুতের আওতা ৬৮ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে সৌরবিদ্যুৎ ও ক্ষুদ্র জলবিদ্যুৎসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের উপযোগী করে গ্রিডকে প্রস্তুত করার পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে।

প্রকল্পটির অর্থায়নে এডিবির ঋণের পাশাপাশি জাপান সরকারের অর্থায়নে এডিবির মাধ্যমে পরিচালিত ‘জাপান ফান্ড ফর প্রসপারাস অ্যান্ড রেজিলিয়েন্ট এশিয়া অ্যান্ড দ্য প্যাসিফিক’ থেকে ২৭ লাখ ২০ হাজার ডলারের অনুদান দেওয়া হবে। বাংলাদেশ সরকার প্রকল্পে ৩ কোটি ৬৫ লাখ ৪০ হাজার ডলার এবং প্রকল্পের নির্বাহী ও বাস্তবায়নকারী সংস্থা বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড ৪ কোটি ৫৬ লাখ ৫০ হাজার ডলার দেবে।

দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়া শুধু ঘরে আলো জ্বালানোর বিষয় নয়। একটি নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সংযোগ একটি শিশুর পড়াশোনার সময় বাড়াতে পারে, একটি ছোট ব্যবসাকে দীর্ঘ সময় চালু রাখতে পারে, কোনো স্বাস্থ্যকেন্দ্রে জরুরি সেবা অব্যাহত রাখতে পারে এবং স্থানীয় মানুষের নতুন কর্মসংস্থানের পথ তৈরি করতে পারে। সেই বিবেচনায় পার্বত্য চট্টগ্রামের বিদ্যুৎ অবকাঠামো আধুনিকায়নের এই উদ্যোগকে অঞ্চলটির দীর্ঘমেয়াদি ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

তবে প্রকল্পের প্রকৃত সুফল নির্ভর করবে দুর্গম এলাকাগুলোতে পরিকল্পিত অবকাঠামো সময়মতো নির্মাণ, সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর কার্যকর অংশগ্রহণের ওপর। পাহাড়ি পরিবেশ ও স্থানীয় বাস্তবতা বিবেচনায় রেখে কাজ বাস্তবায়ন করা গেলে বিদ্যুৎ সুবিধার বিস্তারের পাশাপাশি পার্বত্য চট্টগ্রামে টেকসই উন্নয়ন, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং জনসেবার পরিধিও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com