সেপ্টেম্বরের পরও কাতারের এলএনজি অনিশ্চিত

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১৬ বার
সেপ্টেম্বরের পরও কাতারের এলএনজি অনিশ্চিত

প্রকাশ: ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

হরমুজ প্রণালিতে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা ও জাহাজ চলাচলে নিরাপত্তা সংকটের কারণে বাংলাদেশে কাতারের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা আরও দীর্ঘায়িত হচ্ছে। কাতারএনার্জি সেপ্টেম্বরের পরও বাংলাদেশে নির্ধারিত এলএনজি কার্গো সরবরাহ করতে না পারার কথা জানিয়েছে বলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। একই সংকটে পাকিস্তান ও ইউরোপের কয়েকটি দেশেও কাতারের এলএনজি সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে।

জ্বালানি সরবরাহের এই সংকট বাংলাদেশের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় কাতার বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান এলএনজি সরবরাহকারী। ফলে কাতারের কার্গো না এলে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানা, সার্বিক গ্যাস সরবরাহ এবং আমদানি ব্যয়—সব ক্ষেত্রেই বাড়তি চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

আন্তর্জাতিক বাজারসংশ্লিষ্ট সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে এলএনজি ট্যাংকার চলাচল স্বাভাবিক না হওয়ায় কাতারএনার্জি ক্রেতাদের সরবরাহ-চুক্তির ক্ষেত্রে ‘ফোর্স মেজার’ পরিস্থিতির মেয়াদ বাড়াচ্ছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এই ছাড়ের সময়সীমা সেপ্টেম্বরের পর পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে বলে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। তবে বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কাতারএনার্জির কাছ থেকে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক নোটিশ পাওয়ার বিষয়টি আলাদাভাবে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।

ফোর্স মেজার বলতে এমন পরিস্থিতিকে বোঝায়, যেখানে যুদ্ধ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা অন্য কোনো অনিবার্য ও নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা কারণে কোনো পক্ষ চুক্তির নির্ধারিত দায়িত্ব পালন করতে সাময়িকভাবে অক্ষম হয়ে পড়ে। হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা পরিস্থিতি ও আঞ্চলিক যুদ্ধের কারণে কাতারএনার্জি কয়েক মাস ধরে এই বিধানের আওতায় এলএনজি সরবরাহ স্থগিত রাখছে।

কাতারের এলএনজি রপ্তানি সংকটের শুরুটা হয় চলতি বছরের মার্চে। হরমুজ প্রণালি ঘিরে সামরিক উত্তেজনা বাড়ার পাশাপাশি কাতারের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামো রাস লাফানেও হামলার ঘটনা ঘটে। এতে দেশটির এলএনজি উৎপাদন সক্ষমতার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কাতারএনার্জির প্রেসিডেন্ট ও প্রধান নির্বাহী এবং দেশটির জ্বালানিবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী সাদ শেরিদা আল-কাবি জানিয়েছিলেন, হামলার কারণে কাতারের এলএনজি রপ্তানি সক্ষমতা প্রায় ১৭ শতাংশ কমে গেছে।

কাতার নিউজ এজেন্সির প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, রাস লাফানের হামলায় দেশটির ১৪টি এলএনজি প্রক্রিয়াজাতকরণ ইউনিটের মধ্যে দুটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে বছরে প্রায় ১ কোটি ২৮ লাখ টন এলএনজি উৎপাদন সক্ষমতা দীর্ঘ সময়ের জন্য ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। কাতারএনার্জি জানিয়েছিল, ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনা মেরামতে কয়েক বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। এর ফলে কেবল তাৎক্ষণিক সরবরাহ নয়, দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি বাজারেও এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

পরিস্থিতি আরও জটিল হয় হরমুজ প্রণালিতে এলএনজি পরিবহন বাধাগ্রস্ত হওয়ায়। পারস্য উপসাগর থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে কাতারের গ্যাস পৌঁছানোর জন্য এই সামুদ্রিক পথ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বের এলএনজি বাণিজ্যের একটি বড় অংশ এই পথের ওপর নির্ভরশীল। ফলে নিরাপত্তা সংকট তৈরি হওয়ার পর কাতারের সামনে বিকল্প পথে বড় পরিমাণ এলএনজি সরবরাহের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ে।

সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক বাজারের তথ্য বলছে, যুদ্ধের প্রথম ছয় মাসে কাতার মাত্র ১৮টি এলএনজি কার্গো রপ্তানি করতে পেরেছে। আগের বছরের একই সময়ে দেশটি ৫০৯টি কার্গো রপ্তানি করেছিল। অর্থাৎ স্বাভাবিক রপ্তানি কার্যক্রমের তুলনায় এবারের পতন অত্যন্ত বড়। রয়টার্সের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই সংকটে কাতারের এলএনজি রপ্তানি ব্যাপকভাবে কমে যাওয়ায় দেশটির গ্যাস বিক্রির আয় প্রায় ২৪ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত কমে যেতে পারে।

বাংলাদেশের ওপর এর প্রভাব ইতোমধ্যে দৃশ্যমান হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। কাতার বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি আমদানির অন্যতম প্রধান উৎস। স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে দেশটি কাতার থেকে বছরে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক এলএনজি কার্গো গ্রহণ করে। চলমান সংকটে নির্ধারিত কার্গো না এলে ঘাটতি পূরণ করতে বিকল্প উৎস ও স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কেনার ওপর নির্ভরতা বাড়াতে হবে।

সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের কাতার থেকে ৫৬টি কার্গো পাওয়ার কথা ছিল। যুদ্ধ ও সরবরাহ সংকটের কারণে এর একটি বড় অংশ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। পেট্রোবাংলা ইতোমধ্যে বিকল্প সরবরাহ নিশ্চিত করতে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কেনার দিকে ঝুঁকেছে। তবে স্পট মার্কেটে আন্তর্জাতিক মূল্য তুলনামূলক বেশি হওয়ায় এতে সরকারের আমদানি ব্যয়ও বাড়তে পারে।

এলএনজি সরবরাহ কমে গেলে সবচেয়ে বড় চাপ পড়তে পারে বিদ্যুৎ খাতে। বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। গ্যাসের সরবরাহ কমে গেলে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে। একই সঙ্গে শিল্পকারখানায় গ্যাসের চাপ কমে গেলে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। বড় শিল্পের পাশাপাশি সার কারখানা, সিএনজি স্টেশন এবং আবাসিক গ্রাহকদের ওপরও এর পরোক্ষ প্রভাব পড়তে পারে।

সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশ বিকল্প উৎস থেকে এলএনজি সংগ্রহের চেষ্টা করছে। পেট্রোবাংলা স্পট মার্কেট থেকে কার্গো সংগ্রহ বাড়ানোর পাশাপাশি সম্ভাব্য সরবরাহকারীর সংখ্যা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। এর উদ্দেশ্য হলো আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক দর নিশ্চিত করা এবং কোনো একটি দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানো। তবে বৈশ্বিক বাজারে কাতারের বড় সরবরাহ ঘাটতি তৈরি হওয়ায় একই সময়ে বহু দেশ বিকল্প কার্গোর সন্ধান করছে। ফলে প্রতিযোগিতা বাড়লে দামও ঊর্ধ্বমুখী হতে পারে।

ইউরোপের বাজারেও একই ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। ইতালির জ্বালানি কোম্পানি এডিসন জানিয়েছে, কাতারএনার্জি তাদের আরও পাঁচটি এলএনজি কার্গো সরবরাহ করতে পারবে না। এসব কার্গো সেপ্টেম্বরের শেষ থেকে নভেম্বরের শুরুর মধ্যে ইতালিতে পৌঁছানোর কথা ছিল। কাতারের সরবরাহ সংকটের কারণে ইউরোপ ও এশিয়ার বিভিন্ন ক্রেতাকে বিকল্প উৎস থেকে গ্যাস সংগ্রহ করতে হচ্ছে।

বাংলাদেশের জন্য সমস্যাটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে কারণ দেশটির গ্যাস চাহিদার বড় একটি অংশ বিদ্যুৎ ও শিল্প খাতে কেন্দ্রীভূত। আন্তর্জাতিক বাজারে বিকল্প এলএনজি সংগ্রহ করতে হলে বেশি দাম দিতে হতে পারে। এতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি সরকারের ভর্তুকির চাপও বাড়তে পারে। আবার বেশি দামে এলএনজি কেনার সুযোগ সীমিত হলে গ্যাস সরবরাহে অগ্রাধিকার নির্ধারণের প্রয়োজন দেখা দিতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সংকটের স্থায়ী সমাধান নির্ভর করছে হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা পরিস্থিতির ওপর। সামুদ্রিক যোগাযোগ পুরোপুরি স্বাভাবিক না হলে কাতারের এলএনজি রপ্তানি দ্রুত আগের অবস্থায় ফিরবে না। একই সঙ্গে রাস লাফানের ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো মেরামতের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। ফলে সেপ্টেম্বর পেরিয়ে গেলেই কাতারের এলএনজি সরবরাহ স্বাভাবিক হয়ে যাবে—এমন নিশ্চয়তা এখনো নেই।

অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে কাতারের ঘাটতি পূরণে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, নাইজেরিয়া ও মালয়েশিয়াসহ অন্যান্য উৎপাদক দেশের এলএনজি সরবরাহ বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। তবে বাজার বিশ্লেষকদের মতে, এসব অতিরিক্ত সরবরাহ কাতারের ঘাটতি পুরোপুরি পূরণ করতে পারছে না। ফলে এশিয়ার আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য জ্বালানি নিরাপত্তা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।

বাংলাদেশের সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—কাতারের দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহে তৈরি হওয়া ঘাটতি কতটা দ্রুত বিকল্প উৎস দিয়ে পূরণ করা সম্ভব হবে। পাশাপাশি সেই বিকল্প এলএনজির মূল্য কত হবে এবং বাড়তি ব্যয় কীভাবে সামাল দেওয়া হবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এলএনজি সরবরাহের এই সংকট শুধু জ্বালানি খাতের সমস্যা নয়; এর সঙ্গে বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পের উৎপাদন ব্যয়, পরিবহন, কর্মসংস্থান এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়েরও সরাসরি ও পরোক্ষ সম্পর্ক রয়েছে।

হরমুজ সংকট দীর্ঘায়িত হলে বাংলাদেশের জ্বালানি পরিকল্পনায়ও নতুন করে চাপ তৈরি হতে পারে। স্বল্পমেয়াদে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি সংগ্রহ এবং বিকল্প সরবরাহকারী খোঁজা প্রয়োজন হলেও দীর্ঘমেয়াদে আমদানির উৎস বহুমুখীকরণ, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

এ মুহূর্তে তাই সেপ্টেম্বরের পর কাতারের এলএনজি সরবরাহের অনিশ্চয়তা বাংলাদেশের জন্য একটি সতর্কবার্তা। বিশ্বজুড়ে ভূরাজনৈতিক সংঘাত কীভাবে একটি দেশের বিদ্যুৎ, শিল্প ও অর্থনীতিতে সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে, হরমুজ প্রণালির বর্তমান সংকট তারই বাস্তব উদাহরণ। পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক না হলে বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর জ্বালানি বাজারকে আগামী মাসগুলোতে আরও সতর্কতার সঙ্গে সরবরাহ ও ব্যয় ব্যবস্থাপনা করতে হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত