বিশ্বের অর্ধেকের বেশি মাটি অসুস্থ, খাদ্য-জীববৈচিত্র্য ঝুঁকিতে

ফারহান ফারাবী
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১৭ বার

প্রকাশ: ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বিশ্বের অর্ধেকেরও বেশি মাটি খারাপ বা অত্যন্ত খারাপ অবস্থায় রয়েছে, যা বৈশ্বিক খাদ্য সরবরাহ, জীববৈচিত্র্য ও জলবায়ু স্থিতিশীলতার জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে। মাটির স্বাস্থ্য রক্ষায় কার্যকর ও প্রমাণিত পদ্ধতি জানা থাকলেও সেগুলোর পর্যাপ্ত বাস্তবায়ন হচ্ছে না। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) নতুন এক প্রতিবেদনে এমন উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে।

বৃহস্পতিবার প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বজুড়ে ৫২ দশমিক ৫ শতাংশ অঞ্চল ও উপ-অঞ্চলে মাটির ব্যবস্থাপনা খারাপ বা অত্যন্ত খারাপ অবস্থায় রয়েছে। প্রায় এক-তৃতীয়াংশ অঞ্চলে মাটির অবস্থা মাঝারি মানের। বিপরীতে মাত্র ১৪ শতাংশ অঞ্চলে মাটির ব্যবস্থাপনা ভালো বা খুব ভালো অবস্থায় রয়েছে।

এফএও বলছে, মাটি মানবসভ্যতার খাদ্যব্যবস্থার অন্যতম প্রধান ভিত্তি। বিশ্বের মোট খাদ্য উৎপাদনের প্রায় ৯৫ শতাংশ সরাসরি মাটির ওপর নির্ভরশীল। একই সঙ্গে পৃথিবীর স্থলভাগের জীববৈচিত্র্যের বড় একটি অংশ মাটির সঙ্গে সম্পর্কিত এবং মহাসাগরের পর মাটিই গ্রহের দ্বিতীয় বৃহত্তম কার্বন সংরক্ষণাগার।

তবে এই গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদ দ্রুত অবক্ষয়ের মুখে পড়ছে। প্রতিবেদনে মাটির সবচেয়ে বড় হুমকি হিসেবে ক্ষয়কে চিহ্নিত করা হয়েছে। অনিয়ন্ত্রিত ও টেকসই নয় এমন কৃষিপদ্ধতির কারণে বৃষ্টির পানিতে মাটি ধুয়ে যাচ্ছে কিংবা বাতাসে উড়ে যাচ্ছে। এতে জমির উর্বরতা কমার পাশাপাশি কৃষি উৎপাদনের দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

মাটির ওপর চাপ বাড়ার পেছনে জনসংখ্যা বৃদ্ধিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এফএও জানিয়েছে, ২০১৫ সালের পর থেকে বিশ্বের জনসংখ্যা প্রায় ৮০ কোটি বেড়েছে। এর ফলে প্রধান প্রধান ফসল উৎপাদনের জন্য আরও প্রায় ৮ কোটি হেক্টর জমি চাষের আওতায় এসেছে, যার আয়তন ফ্রান্স ও জার্মানির সম্মিলিত আয়তনের কাছাকাছি।

মাটির ক্ষয়ের পাশাপাশি জৈব পদার্থের ঘাটতি, পুষ্টি উপাদানের ভুল ব্যবস্থাপনা, মাটির জীববৈচিত্র্য হ্রাস, লবণাক্ততা বৃদ্ধি, দূষণ এবং নগরায়ণও পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে। জলবায়ু পরিবর্তন এসব সমস্যাকে আরও তীব্র করে তুলছে। একই সময়ে মাটির অবক্ষয়ও বায়ুমণ্ডলে কার্বন নিঃসরণ বাড়িয়ে জলবায়ু পরিবর্তনের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।

এফএওর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মাটির স্বাস্থ্য উন্নত করার বিভিন্ন কার্যকর পদ্ধতি বহু বছর ধরেই পরিচিত। কিন্তু সেগুলো মাঠপর্যায়ে যথেষ্ট পরিমাণে প্রয়োগ করা হচ্ছে না। জরিপ করা অঞ্চলগুলোর মাত্র ১০ শতাংশে মৃত্তিকা ব্যবস্থাপনার উন্নতি হয়েছে। বিপরীতে ৫৮ শতাংশ এলাকায় মাটির অবস্থার আরও অবনতি ঘটেছে।

মাটির ক্ষয় কমানোর অন্যতম কার্যকর উপায় হিসেবে চাষাবাদ কমিয়ে আনা বা প্রয়োজন অনুযায়ী তা বন্ধ করার কথা বলা হয়েছে। লাঙল বা ট্রাক্টর দিয়ে অতিরিক্ত চাষ মাটির ভেতরের জৈবিক পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে এবং মাটিকে আলগা করে ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

এ ছাড়া কভার ক্রপ বা প্রতিরক্ষামূলক ফসল চাষ, কৃষি-বনায়ন এবং সার ব্যবহারে ভারসাম্য আনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অনাবাদী সময়ে শিমজাতীয় বা অন্যান্য উপযোগী ফসল চাষ করলে মাটির ওপর সরাসরি বৃষ্টির আঘাত কমে এবং পুষ্টি ধরে রাখতে সহায়তা করে। কৃষির সঙ্গে গাছপালাকে সমন্বিত করার অ্যাগ্রোফরেস্ট্রি পদ্ধতিও মাটির স্বাস্থ্য রক্ষায় কার্যকর হতে পারে।

প্রাকৃতিক ও কৃত্রিম সারের সুষম ব্যবহারও গুরুত্বপূর্ণ। অতিরিক্ত বা অনিয়ন্ত্রিত সার প্রয়োগ মাটির গুণগত মান নষ্ট করার পাশাপাশি পানি ও পরিবেশ দূষণের কারণ হতে পারে। তাই স্থানীয় পরিবেশ ও জমির প্রয়োজন অনুযায়ী সার ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছে এফএও।

সংস্থাটির মতে, কৃষকদের মধ্যে মাটি সংরক্ষণের কৌশল সম্পর্কে জ্ঞানের ঘাটতিই মূল সমস্যা নয়। বরং নতুন ও টেকসই পদ্ধতি গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রাথমিক বিনিয়োগের উচ্চ ব্যয় এবং প্রয়োজনীয় সম্পদের সীমাবদ্ধতা বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এ কারণে কৃষকদের জন্য আর্থিক প্রণোদনা বাড়ানো, স্থানীয় পর্যায়ে আরও নির্ভরযোগ্য তথ্য সরবরাহ এবং স্থানীয় ও আদিবাসী জ্ঞানকে কৃষি ব্যবস্থাপনায় অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি।

মাটির অবক্ষয়ের এই চিত্র এমন এক সময়ে সামনে এলো, যখন মঙ্গোলিয়ার রাজধানী উলানবাটারে মরুভূমিকরণ মোকাবিলায় জাতিসংঘের কনভেনশনের কপ-১৭ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। সেখানে বিশ্বজুড়ে কূটনীতিক ও বিশেষজ্ঞরা খরা ও ভূমি অবক্ষয় মোকাবিলায় একটি বৈশ্বিক সমঝোতায় পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন।

এর আগে রিয়াদে অনুষ্ঠিত কপ-১৬ সম্মেলন কোনো চুক্তিতে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়েছিল। নতুন প্রতিবেদনের তথ্য তাই বৈশ্বিক ভূমি ব্যবস্থাপনা ও খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে আন্তর্জাতিক আলোচনায় নতুন করে চাপ তৈরি করতে পারে।

এফএওর বার্তা হলো, মাটিকে কেবল উৎপাদনের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার না করে একটি জীবন্ত প্রাকৃতিক সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। মাটির স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধার করা গেলে কৃষি উৎপাদনের স্থায়িত্ব বাড়ানোর পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণেও গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি সম্ভব।

বিস্তারিত জানতে আরো পড়ুন>> 

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত