প্রকাশ: ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
কিরগিজস্তানের রাজধানী বিশকেকে অনুষ্ঠিত সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার (এসসিও) শীর্ষ সম্মেলনে সদস্য দেশগুলোর রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানরা ‘বিশকেক ঘোষণা’তে স্বাক্ষর করেছেন। বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থায় সংস্কার, আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে সব দেশের সমান অংশগ্রহণ এবং পারস্পরিক সহযোগিতা জোরদারের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে এবারের ঘোষণায়। একই সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নিরাপদ ও দায়িত্বশীল ব্যবহার, টেকসই উন্নয়ন এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক শাসনব্যবস্থার সংস্কারের মতো সমসাময়িক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও এতে স্থান পেয়েছে।
সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার সদস্য দেশগুলোর রাষ্ট্রপ্রধানদের কাউন্সিলের বৈঠকে বিশ্বের পরিবর্তিত রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা হয়। বৈঠক শেষে গৃহীত ঘোষণায় বলা হয়েছে, বর্তমান আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর, ন্যায়সংগত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করতে প্রয়োজনীয় সংস্কার জরুরি হয়ে উঠেছে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে কোনো দেশ বা গোষ্ঠী যেন এককভাবে প্রভাব বিস্তার করতে না পারে এবং সব দেশের মতামত ও স্বার্থ যেন যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয়, সে বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বিশকেক ঘোষণায় আন্তর্জাতিক আইন ও নিয়মকানুনের উন্নয়ন এবং বিশ্ব পরিচালনার কাঠামোকে আরও প্রতিনিধিত্বশীল করার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরা হয়েছে। এসসিও নেতারা এমন নীতি ও বিধিমালা প্রণয়নের ওপর জোর দিয়েছেন, যার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে সব দেশের সমান অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্তের সুফলও যেন সব দেশ ন্যায্যভাবে ভোগ করতে পারে, সেই লক্ষ্য অর্জনের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
বর্তমান বিশ্বে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা, প্রযুক্তিগত পরিবর্তন এবং নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে। এমন বাস্তবতায় এসসিওর ঘোষণায় বহুপাক্ষিক সহযোগিতাকে গুরুত্ব দেওয়া বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। সংগঠনটির নেতারা মনে করেন, পারস্পরিক সহযোগিতা ও আলোচনার মাধ্যমে বিভিন্ন দেশের মধ্যে আস্থা বাড়ানো এবং বৈশ্বিক সমস্যাগুলোর সমাধানে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব।
ঘোষণায় আগ্রহী দেশগুলোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সংস্থা, বহুপাক্ষিক জোট ও বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে সহযোগিতার বিষয়টিও স্বাগত জানানো হয়েছে। এসসিওর কাঠামোর মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা আরও বিস্তৃত করার মাধ্যমে একটি বৃহত্তর ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বৈশ্বিক অংশীদারিত্ব গড়ে তোলার প্রত্যাশা ব্যক্ত করা হয়েছে। এতে বোঝা যায়, সংগঠনটি শুধু নিজস্ব সদস্য দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা সীমাবদ্ধ না রেখে বৃহত্তর আন্তর্জাতিক পরিসরে সম্পর্ক ও সমন্বয় বাড়াতে আগ্রহী।
সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার ২৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী এবারের সম্মেলনকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে। দীর্ঘ আড়াই দশকে সংগঠনটি নিরাপত্তা, অর্থনীতি, জ্বালানি, পরিবহন, বাণিজ্য ও আঞ্চলিক সহযোগিতার বিভিন্ন ক্ষেত্রে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে বিকশিত হয়েছে। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর প্রেক্ষাপটে অনুষ্ঠিত এই শীর্ষ সম্মেলনে সংগঠনের ভবিষ্যৎ ভূমিকা এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এর কার্যক্রম আরও বিস্তৃত করার বিষয়ও গুরুত্ব পেয়েছে।
বিশকেক ঘোষণার পাশাপাশি সম্মেলনে আরও ২৭টি নথিতে স্বাক্ষর করেছেন অংশগ্রহণকারী নেতারা। এসব নথির মাধ্যমে সংগঠনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতার কাঠামো ও ভবিষ্যৎ কার্যক্রমকে আরও সুসংহত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সদস্য দেশগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো এবং পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে যৌথ উদ্যোগ জোরদারের লক্ষ্যেই এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।
সম্মেলনের আলোচনায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির বিষয়টিও বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। দ্রুত বিকাশমান এই প্রযুক্তি বিশ্ব অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ, শিল্প ও প্রশাসনসহ মানুষের জীবনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনছে। একই সঙ্গে এআইয়ের অপব্যবহার, তথ্যের নিরাপত্তা, গোপনীয়তা এবং প্রযুক্তিগত বৈষম্য নিয়ে নতুন ধরনের উদ্বেগও তৈরি হয়েছে। এ কারণে প্রযুক্তিটির নিরাপদ, দায়িত্বশীল ও মানবকল্যাণমুখী ব্যবহার নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে ঘোষণায়।
এসসিও নেতারা টেকসই উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টিও তুলে ধরেছেন। জলবায়ু পরিবর্তন, খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তা, দারিদ্র্য, বৈশ্বিক বৈষম্য এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়ানোর মতো বিষয়গুলো বর্তমানে আন্তর্জাতিক আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ঘোষণায় টেকসই উন্নয়নকে বৈশ্বিক সহযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে দেখানো হয়েছে।
বিশ্ব অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সংস্কারের বিষয়টিও এবারের ঘোষণায় গুরুত্ব পেয়েছে। বৈশ্বিক অর্থনীতিতে উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে সুযোগ ও প্রতিনিধিত্বের ভারসাম্য নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা রয়েছে। আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় উন্নয়নশীল দেশগুলোর অংশগ্রহণ বাড়ানোর দাবি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। বিশকেক ঘোষণায় বৈশ্বিক অর্থনৈতিক শাসনব্যবস্থাকে আরও ন্যায়সংগত ও কার্যকর করার প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি সেই বৃহত্তর আলোচনার সঙ্গেই সামঞ্জস্যপূর্ণ।
বিশকেকে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে ১০টি সদস্য রাষ্ট্রের শীর্ষ নেতারা অংশ নেন। তাদের উপস্থিতিতে গৃহীত ঘোষণা সংগঠনটির ভবিষ্যৎ অগ্রাধিকার ও আন্তর্জাতিক অবস্থানের একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সম্মেলনের মাধ্যমে সদস্য দেশগুলো পারস্পরিক সহযোগিতা আরও গভীর করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংকট মোকাবিলায় সমন্বিত অবস্থানের বার্তাও দিয়েছে।
বিশকেক ঘোষণার গুরুত্ব শুধু এসসিওর অভ্যন্তরীণ সহযোগিতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বহুপাক্ষিকতা, সমান অংশগ্রহণ এবং আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় সংস্কারের যে আহ্বান এতে উঠে এসেছে, তা বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। একদিকে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে রাজনৈতিক ও সামরিক উত্তেজনা বাড়ছে, অন্যদিকে অর্থনীতি ও প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তন আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পুরোনো কাঠামোকেও নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে। এমন পরিস্থিতিতে আলোচনার মাধ্যমে সহযোগিতা বাড়ানোর আহ্বান আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলাদা গুরুত্ব বহন করছে।
কিরগিজস্তানের রাজধানী বিশকেকে অনুষ্ঠিত এই সম্মেলনের মধ্য দিয়ে এসসিও তার ২৫ বছরের যাত্রাকে নতুন পর্যায়ে নেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে। সদস্য দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোর পাশাপাশি বহুপাক্ষিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করার যে লক্ষ্য ঘোষণায় তুলে ধরা হয়েছে, তা বাস্তবায়নে আগামী দিনগুলোতে সংগঠনটির কার্যক্রম গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে প্রযুক্তি, অর্থনীতি ও টেকসই উন্নয়নের মতো দ্রুত পরিবর্তনশীল ক্ষেত্রে সদস্য দেশগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ এসসিওর ভবিষ্যৎ ভূমিকা নির্ধারণে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।