লেজার দিয়ে মশা মারবে চীনের নতুন পোর্টেবল যন্ত্র

ফারহান ফারাবী
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১৬ বার

প্রকাশ: ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মশা নিধনে প্রচলিত কয়েল, স্প্রে কিংবা বৈদ্যুতিক ফাঁদের পাশাপাশি বাজারে আসছে আরও উন্নত প্রযুক্তিনির্ভর সমাধান। চীনের তৈরি লেজারভিত্তিক একটি পোর্টেবল মশা নিধন যন্ত্রের বড় পরিসরে উৎপাদন শুরু হয়েছে। প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান ফোটন ম্যাট্রিক্স ল্যাব জানিয়েছে, চলতি সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে গ্রাহকদের কাছে যন্ত্রটির প্রথম চালান পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

ছোট আকারের এই বহনযোগ্য যন্ত্রটি মশা ও অন্যান্য ছোট উড়ন্ত পোকা শনাক্ত করে সেগুলোকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করার জন্য একাধিক সেন্সর ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে বলে দাবি করেছে নির্মাতা প্রতিষ্ঠানটি। এর মধ্যে রয়েছে লিডার, মিলিমিটার-ওয়েভ রাডার, এআই-চালিত ক্যামেরা এবং নির্ভুল লেজার প্রযুক্তি।

ফোটন ম্যাট্রিক্স ল্যাবের সর্বশেষ হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, আগস্ট মাসেই যন্ত্রটির উৎপাদন শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটি একটি অনলাইন স্টোর চালু করেছে, যেখানে গ্রাহকদের জন্য ইনফ্রারেড ও ব্লু-লেজার—দুটি সংস্করণ কেনার সুযোগ রাখা হয়েছে।

প্রযুক্তিনির্ভর মশা নিধন যন্ত্রের এই নতুন উদ্যোগ এমন সময়ে সামনে এসেছে, যখন চীনে মশা প্রতিরোধ ও নিধন পণ্যের বাজার দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। প্রচলিত কয়েল, ইলেকট্রিক ভেপোরাইজার ও বিভিন্ন ধরনের ফাঁদের পাশাপাশি বাজারে এখন সেন্সর, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, কম্পিউটার ভিশন ও রোবোটিক্সভিত্তিক পণ্যের ব্যবহার বাড়ানোর চেষ্টা চলছে।

চীনা সংবাদ সংস্থা সিনহুয়ার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসে দেশটির ঝেজিয়াং প্রদেশের জিনহুয়া শহর থেকে প্রায় ৪৫ মিলিয়ন ইউয়ান বা প্রায় ৬ দশমিক ৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের মশা প্রতিরোধক পণ্য বিদেশে রপ্তানি হয়েছে। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় এই রপ্তানি ৬৫ দশমিক ১ শতাংশ বেশি।

শিল্প বিশেষজ্ঞদের উদ্ধৃত করে সিনহুয়া জানিয়েছে, চীনের মশা নিধন পণ্যের বাজার ২০২৫ সালে প্রায় ৭ দশমিক ৮৬ বিলিয়ন ইউয়ানের আকার ধারণ করেছে। বাজারটি ২০৩০ সালের মধ্যে ১২ দশমিক ৪৩ বিলিয়ন ইউয়ানে পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এতে বোঝা যায়, মশা নিয়ন্ত্রণের পণ্যের চাহিদা কেবল প্রচলিত পদ্ধতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না।

চীনে মশা নিয়ন্ত্রণে স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি ব্যবহারের উদাহরণও রয়েছে। ২০২৩ সালের হাংচৌ এশিয়ান গেমসের সময় এশিয়ান গেমস ভিলেজে স্বয়ংক্রিয় মশা নিধন রোবট মোতায়েন করা হয়েছিল। এসব প্রযুক্তির লক্ষ্য ছিল মশাকে নির্দিষ্ট উপায়ে আকৃষ্ট করে শনাক্ত করা এবং পরে সেগুলোকে নিধন করা।

চায়না ডেইলির প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ওই সময় ব্যবহৃত প্রযুক্তির মধ্যে এমন ব্যবস্থাও ছিল, যা মানবদেহের তাপমাত্রা ও শ্বাস-প্রশ্বাসের মতো বৈশিষ্ট্য অনুকরণ করে মশাকে আকৃষ্ট করত। অন্য একটি প্রতিবেদনে মশাকে আকৃষ্ট করতে কার্বন ডাই-অক্সাইড ও অতিবেগুনি রশ্মি ব্যবহারের কথা উল্লেখ করা হয়।

নতুন প্রজন্মের এসব প্রযুক্তি মূলত মশা নিয়ন্ত্রণের পুরনো পদ্ধতিকে আরও স্বয়ংক্রিয় ও নির্ভুল করার চেষ্টা করছে। প্রচলিত পণ্য সাধারণত রাসায়নিক উপাদান, আলো, তাপ বা সাধারণ ফাঁদের ওপর নির্ভর করে। বিপরীতে আধুনিক যন্ত্রগুলো মশা শনাক্ত করতে সেন্সর, ক্যামেরা, কম্পিউটার ভিশন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করছে।

চীনের ফোটন ম্যাট্রিক্স ল্যাবের পণ্যটির বিশেষত্ব হলো শনাক্ত করা মশাকে সরাসরি লেজার দিয়ে লক্ষ্য করার দাবি। অর্থাৎ যন্ত্রটি শুধু মশার অবস্থান শনাক্ত করার পরিবর্তে শনাক্তকরণ থেকে নিধন পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে সম্পন্ন করার লক্ষ্য নিয়ে তৈরি হয়েছে।

তবে মশা শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণে লেজার প্রযুক্তির ব্যবহার চীনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ইসরায়েলি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান জিগো ‘আইরিস’ নামে একটি যন্ত্র তৈরি করেছে, যা কম্পিউটার ভিশন ও ইনফ্রারেড সেন্সরের মাধ্যমে মশা শনাক্ত করতে পারে। এরপর কম শক্তির লেজার ব্যবহার করে মশার অবস্থান চিহ্নিত করে। তবে ওই যন্ত্র নিজে মশা মেরে ফেলে না; বরং ব্যবহারকারীকে মশার অবস্থান শনাক্ত করতে সহায়তা করে। প্রতিষ্ঠানটির ওয়েবসাইটে আইরিসের দাম ২৯৯ মার্কিন ডলার নির্ধারণ করা হয়েছে।

ফোটন ম্যাট্রিক্সের পদ্ধতি এ ক্ষেত্রে কিছুটা ভিন্ন। প্রতিষ্ঠানটি মশা শনাক্ত করার পর সেটিকে সরাসরি লেজার রশ্মির মাধ্যমে ধ্বংস করার প্রযুক্তি ব্যবহারের দাবি করছে। ফলে একটি পদ্ধতিতে মূলত মশার অবস্থান খুঁজে বের করাকে সহজ করা হয়, অন্যটিতে শনাক্তকরণ ও নিধন—দুই ধাপই স্বয়ংক্রিয় করার চেষ্টা করা হচ্ছে।

তবে প্রযুক্তিটির কার্যকারিতা নিয়ে এখনো কিছু প্রশ্ন রয়েছে। ফোটন ম্যাট্রিক্স ল্যাব তাদের যন্ত্রের সক্ষমতা সম্পর্কে যেসব দাবি করেছে, সেগুলো স্বাধীনভাবে পরিচালিত পরীক্ষার মাধ্যমে এখনো পুরোপুরি যাচাই করা হয়নি। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত পরীক্ষার ফলাফল এবং নিরাপত্তা-সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশ করা হবে।

এ ধরনের যন্ত্রের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। লেজার প্রযুক্তি ব্যবহার করায় যন্ত্রটি কীভাবে মানুষ, শিশু ও পোষা প্রাণীর আশপাশে নিরাপদে পরিচালিত হবে, সেটি ক্রেতাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনার বিষয়। পাশাপাশি বিভিন্ন পরিবেশে মশা শনাক্ত করার নির্ভুলতা, যন্ত্রটির ব্যাটারি ক্ষমতা, কার্যকর দূরত্ব এবং রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়ও বাস্তব ব্যবহারে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

আরেকটি বিষয় হলো দাম। প্রচলিত মশা নিধন পণ্যের তুলনায় উন্নত সেন্সর, এআই ক্যামেরা, রাডার ও লেজার প্রযুক্তির সমন্বয়ে তৈরি যন্ত্রের উৎপাদন ব্যয় স্বাভাবিকভাবেই বেশি হতে পারে। ফলে প্রযুক্তিটি ব্যাপক ভোক্তা বাজারে প্রবেশ করতে পারবে কি না, তার বড় একটি অংশ নির্ভর করবে মূল্য নির্ধারণের ওপর।

তারপরও বাজার বিশ্লেষণের দিক থেকে এ ধরনের পণ্যের আবির্ভাব একটি পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। মশা নিয়ন্ত্রণের মতো দীর্ঘদিনের সমস্যার সমাধানে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো এখন শুধু রাসায়নিক বা সাধারণ ফাঁদের ওপর নির্ভর না করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সেন্সর, কম্পিউটার ভিশন, রোবোটিক্স এবং লেজার প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটাচ্ছে।

চীনের নতুন পোর্টেবল লেজার মশা নিধন যন্ত্রটি তাই রাতারাতি প্রচলিত মশা নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির বিকল্প হয়ে উঠবে—এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার সময় এখনো আসেনি। এর কার্যকারিতা, নিরাপত্তা, নির্ভরযোগ্যতা, ব্যবহারিক সুবিধা এবং দাম সম্পর্কে আরও তথ্য ও স্বাধীন পরীক্ষার ফল প্রয়োজন। তবে সফলভাবে বাজারে জায়গা করে নিতে পারলে এটি মশা নিধন প্রযুক্তির একটি নতুন ধারার সূচনা করতে পারে।

বিস্তারিত জানতে আরো পড়ুন>> 

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত