প্রকাশ: ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
জন্মসূত্রে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব পাওয়ার সুযোগ সীমিত করার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে এবার সন্তানের পাসপোর্ট আবেদনে বাবা-মায়ের নাগরিকত্ব বা অভিবাসন স্ট্যাটাসের প্রমাণ চাওয়ার পরিকল্পনা করছে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের প্রস্তাবিত নতুন নীতিমালা কার্যকর হলে যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া শিশুর পাসপোর্টের আবেদন করার সময় বাবা-মা বা আইনগত অভিভাবকদের নিজেদের নাগরিকত্ব কিংবা বৈধ অভিবাসন অবস্থার প্রমাণ জমা দিতে হবে।
রয়টার্সের পর্যালোচনা করা পররাষ্ট্র দপ্তরের একটি খসড়া নীতিমালায় প্রথমবারের মতো বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে, কীভাবে ট্রাম্পের ৬ আগস্টের নির্বাহী আদেশ বাস্তবায়ন করা হতে পারে। ওই নির্বাহী আদেশে তথাকথিত ‘বার্থ ট্যুরিজম’ বন্ধ করার পাশাপাশি জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব পাওয়ার ক্ষেত্রে কিছু ঐতিহাসিক ব্যতিক্রমের পরিধি বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র টমি পিগট এক বিবৃতিতে বলেছেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প মার্কিন নাগরিকত্বের অর্থ ও মর্যাদা রক্ষার বিষয়ে স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছেন। সেই নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পাসপোর্ট যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়াও সাজানো হবে বলে জানান তিনি।
ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসন নীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হলো জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের পরিধি সীমিত করা। তবে এ বিষয়ে প্রশাসনের আগের উদ্যোগ আদালতে বড় ধরনের আইনি বাধার মুখে পড়েছে।
ট্রাম্পের প্রথম নির্বাহী আদেশে বলা হয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া শিশু স্বয়ংক্রিয়ভাবে নাগরিকত্ব পাবে কেবল তখনই, যখন তার বাবা অথবা মায়ের অন্তত একজন মার্কিন নাগরিক কিংবা বৈধ স্থায়ী বাসিন্দা বা গ্রিন কার্ডধারী হবেন।
তবে এই আদেশকে ঘিরে মামলা হলে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট ৬-৩ ভোটে এর বিরুদ্ধে রায় দেয়। সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারকের মত ছিল, নির্বাহী আদেশটি মার্কিন সংবিধানের ১৪তম সংশোধনীর নাগরিকত্ব-সংক্রান্ত ধারার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
এরপর ৬ আগস্ট ট্রাম্প প্রশাসন তুলনামূলকভাবে সীমিত পরিসরে আরেকটি নির্বাহী আদেশ জারি করে। এতে বিশেষভাবে ‘বার্থ ট্যুরিজম’কে লক্ষ্য করা হয়েছে। এই শব্দটি সাধারণত এমন পরিস্থিতিকে বোঝায়, যখন গর্ভবতী নারীরা সন্তান জন্ম দেওয়ার উদ্দেশ্যে যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণ করেন এবং সন্তান জন্মের পর সে দেশের নাগরিকত্ব পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
নতুন নির্বাহী আদেশের বাস্তবায়নও আদালতে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে বলে আইনজীবীরা মনে করছেন। এরই মধ্যে আগের নির্বাহী আদেশের কারণে নাগরিকত্ব থেকে বঞ্চিত হতে পারে এমন শিশুদের পক্ষে পরিচালিত ক্লাস-অ্যাকশন মামলার আইনজীবীরা পৃথক দুই ফেডারেল বিচারকের কাছে নতুন আদেশ কার্যকর ঠেকানোর আবেদন করেছেন।
এদিকে পররাষ্ট্র দপ্তরের প্রস্তাবিত খসড়া নীতিমালায় বলা হয়েছে, নতুন নির্বাহী আদেশের আওতায় কোনো শিশু পড়ছে কি না, তা নির্ধারণের জন্য বাবা-মায়ের পরিচয়, নাগরিকত্ব এবং অভিবাসন-সংক্রান্ত তথ্য যাচাই করা হবে। এজন্য পাসপোর্ট আবেদন প্রক্রিয়ায় বাবা-মায়ের কাছ থেকে অতিরিক্ত নথি চাওয়া হতে পারে।
খসড়ায় বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট আবেদনকারী নির্বাহী আদেশের আওতাভুক্ত কি না, তা নির্ধারণের অংশ হিসেবে পররাষ্ট্র দপ্তর বাবা-মায়ের তথ্য এবং তাদের নাগরিকত্ব বা অভিবাসন স্ট্যাটাসের প্রমাণ চাইবে।
প্রস্তাবটি কার্যকর হলে সন্তানের পাসপোর্টের আবেদন করার সময় বাবা-মা বা আইনগত অভিভাবকদের নিজেদের নাগরিকত্বের প্রমাণ দিতে হতে পারে। এর মধ্যে বৈধ মার্কিন পাসপোর্ট, জন্মনিবন্ধন সনদসহ নাগরিকত্বের অন্যান্য গ্রহণযোগ্য নথি থাকতে পারে। বৈধ অভিবাসন অবস্থার প্রমাণ হিসেবে আই-৯৪ ফর্ম অথবা বৈধ স্থায়ী বসবাসের কার্ড বা গ্রিন কার্ডও প্রয়োজন হতে পারে।
সরকার এসব নথি ব্যবহার করে শিশুটি জন্মসূত্রে মার্কিন নাগরিকত্ব পাওয়ার জন্য নতুন নির্বাহী আদেশের অধীনে যোগ্য কি না, তা নির্ধারণ করবে।
বর্তমান ব্যবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া শিশুর পাসপোর্টের আবেদন করার সময় বাবা-মায়ের কাছ থেকে মূলত সন্তানের সঙ্গে সম্পর্কের প্রমাণ এবং ছবিযুক্ত পরিচয়পত্র চাওয়া হয়। আবেদনপত্রে বাবা-মাকে নিজেদের মার্কিন নাগরিকত্বের বিষয়টি উল্লেখ করার সুযোগ থাকলেও এর সমর্থনে আলাদা নাগরিকত্বের প্রমাণপত্র জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা নেই।
নতুন প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে এই প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। পাসপোর্ট আবেদন যাচাইয়ের সময় শুধু শিশুর পরিচয় ও বাবা-মায়ের সঙ্গে সম্পর্ক নয়, বাবা-মায়ের নাগরিকত্ব কিংবা অভিবাসন অবস্থাও সরাসরি যাচাই করা হবে।
খসড়া নীতিমালায় আরও কিছু নির্দিষ্ট পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। নতুন নির্বাহী আদেশের আওতায় এমন কিছু শিশু নাগরিকত্বের সুবিধা থেকে বাদ পড়তে পারে, যাদের বাবা বা মায়ের কেউ বিদেশি সরকারের হয়ে কাজ করেন। একইভাবে নাগরিকত্ব পাওয়ার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের জালিয়াতি বা ব্যবসায়িক লেনদেনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা কিংবা ‘এলিয়েন এনিমি’ হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার মতো পরিস্থিতিও বিবেচনায় নেওয়া হতে পারে।
ট্রাম্প প্রশাসন এই পদক্ষেপকে মার্কিন নাগরিকত্ব ব্যবস্থার কঠোরতা ও মর্যাদা রক্ষার উদ্যোগ হিসেবে দেখছে। প্রশাসনের বক্তব্য অনুযায়ী, নাগরিকত্ব পাওয়ার অধিকার যেন অপব্যবহারের মাধ্যমে অর্জিত না হয়, তা নিশ্চিত করাই এ ধরনের নীতির লক্ষ্য।
অন্যদিকে অভিবাসন অধিকারকর্মী ও আইনজীবীদের জন্য বিষয়টি নতুন আইনি বিতর্কের জন্ম দিতে পারে। বিশেষ করে সংবিধানের ১৪তম সংশোধনীতে জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের যে অধিকার দীর্ঘদিন ধরে স্বীকৃত, তার সঙ্গে নতুন নির্বাহী আদেশের সামঞ্জস্য নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের ১৪তম সংশোধনীর নাগরিকত্ব-সংক্রান্ত ধারা বহু বছর ধরে দেশটিতে জন্ম নেওয়া অধিকাংশ শিশুর নাগরিকত্বের আইনি ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। ফলে নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে এর প্রয়োগ সীমিত করার যেকোনো উদ্যোগ আদালতে সাংবিধানিক পরীক্ষার মুখোমুখি হতে পারে।
নতুন পাসপোর্ট নীতিমালা এখনো প্রস্তাবের পর্যায়ে রয়েছে। এটি কীভাবে চূড়ান্ত হবে এবং আদালতে চ্যালেঞ্জের পর এর কোন অংশ কার্যকর থাকবে, সেটিও এখনো স্পষ্ট নয়। তবে প্রস্তাবটি বাস্তবায়িত হলে যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া শিশুর পাসপোর্ট আবেদনে বাবা-মায়ের নাগরিকত্ব ও অভিবাসন স্ট্যাটাস যাচাইয়ের বিষয়টি নতুন বাস্তবতা হয়ে উঠতে পারে।
ট্রাম্প প্রশাসনের বৃহত্তর অভিবাসন নীতির অংশ হিসেবে জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের সুযোগ সীমিত করার এই উদ্যোগ তাই শুধু পাসপোর্ট ব্যবস্থার পরিবর্তন নয়; এটি যুক্তরাষ্ট্রে নাগরিকত্বের সাংবিধানিক ব্যাখ্যা নিয়েও নতুন করে বিতর্ক তৈরি করতে পারে। সামনে আদালতের সিদ্ধান্ত ও প্রশাসনের চূড়ান্ত নীতিমালাই নির্ধারণ করবে এই প্রস্তাব বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়।
SEO: বাংলা
Suggest Focus Key phrase:
SEO Title:
Meta Description: