সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে কাবুলকে কঠিন শর্ত দিল ইসলামাবাদ

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৩৬ বার
সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে কাবুলকে কঠিন শর্ত দিল ইসলামাবাদ

প্রকাশ: ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

আফগানিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক ও উন্নত করতে আগ্রহী পাকিস্তান। তবে এ জন্য কাবুলকে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত পূরণ করতে হবে বলে স্পষ্ট করেছে ইসলামাবাদ। পাকিস্তানের দাবি, আফগানিস্তানের মাটিতে তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি), বেলুচিস্তান লিবারেশন আর্মি (বিএলএ) এবং অন্যান্য সশস্ত্র গোষ্ঠীর কার্যক্রম বন্ধে তালেবান সরকারকে দৃশ্যমান, কার্যকর ও যাচাইযোগ্য পদক্ষেপ নিতে হবে। এসব বিষয়ে অগ্রগতি ছাড়া দুই দেশের সম্পর্কের অর্থবহ উন্নতি সম্ভব নয় বলে জানিয়েছে পাকিস্তান।

বুধবার পাকিস্তানের পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র তাহির আন্দ্রাবি আফগানিস্তান প্রসঙ্গে ইসলামাবাদের অবস্থান তুলে ধরেন। তিনি বলেন, পাকিস্তান আফগানিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের বিষয়ে আগ্রহী। তবে সেই সম্পর্ক উন্নয়নের ভিত্তি হতে হবে নিরাপত্তা এবং পারস্পরিক আস্থার ওপর। পাকিস্তানের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ দূর করতে কাবুলকে বাস্তব পদক্ষেপ নিতে হবে বলেও তিনি ইঙ্গিত দেন।

দুই প্রতিবেশী দেশের সম্পর্ক বেশ কিছুদিন ধরেই টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সীমান্ত নিরাপত্তা, সন্ত্রাসবাদ, শরণার্থী এবং আফগান ভূখণ্ড থেকে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে পরিচালিত কথিত হামলার অভিযোগ নিয়ে ইসলামাবাদ ও কাবুলের মধ্যে উত্তেজনা রয়েছে। পাকিস্তানের অভিযোগ, আফগানিস্তানের ভেতরে অবস্থান করা কিছু সশস্ত্র গোষ্ঠী পাকিস্তানের নিরাপত্তার জন্য হুমকি তৈরি করছে। অন্যদিকে তালেবান সরকার অতীতে এসব অভিযোগের বিভিন্ন অংশ অস্বীকার করেছে এবং আফগান ভূখণ্ড অন্য কোনো দেশের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে না দেওয়ার নীতির কথা জানিয়েছে।

এ অবস্থায় সম্পর্ক স্বাভাবিক করার জন্য পাকিস্তান এবার কাবুলের কাছ থেকে লিখিত ও যাচাইযোগ্য নিশ্চয়তা চাওয়ার কথা জানিয়েছে। ইসলামাবাদের অবস্থান অনুযায়ী, আফগান ভূখণ্ড থেকে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালনার সুযোগ বন্ধ করতে হবে। শুধু রাজনৈতিক আশ্বাস বা মৌখিক প্রতিশ্রুতিকে যথেষ্ট মনে করছে না পাকিস্তান। তারা চায়, কাবুলের পদক্ষেপ এমন হতে হবে যা বাস্তবভাবে যাচাই করা সম্ভব।

পাকিস্তানের পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র আরও জানান, আফগানিস্তান ইস্যুতে চীনের গঠনমূলক ভূমিকা ইসলামাবাদ স্বাগত জানায়। তবে তৃতীয় কোনো দেশের মধ্যস্থতা বা কূটনৈতিক উদ্যোগ আফগানিস্তানের ভেতরে থাকা সন্ত্রাসী অবকাঠামোর বিরুদ্ধে কাবুলের নিজস্ব পদক্ষেপের বিকল্প হতে পারে না। অর্থাৎ কোনো দেশ দুই পক্ষের মধ্যে যোগাযোগ বা আলোচনার পরিবেশ তৈরিতে ভূমিকা রাখলেও মূল নিরাপত্তা উদ্বেগের সমাধান আফগান কর্তৃপক্ষকেই করতে হবে বলে পাকিস্তানের অবস্থান।

সাম্প্রতিক সময়ে আফগানিস্তান-পাকিস্তান সম্পর্ক নিয়ে চীনের কূটনৈতিক তৎপরতা নতুন করে আলোচনায় এসেছে। চীনা বিশেষ দূত ইউয়ে শিয়াওইয়ংয়ের ইসলামাবাদ সফর এবং আফগান রাষ্ট্রদূত সারদার শাকিবের ন্যাশনাল ডিফেন্স ইউনিভার্সিটিতে বক্তব্য দেওয়ার পর দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার স্বার্থে চীন দীর্ঘদিন ধরেই আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের মধ্যে যোগাযোগ এবং সহযোগিতা বাড়ানোর পক্ষে অবস্থান নিয়ে আসছে।

তবে পাকিস্তান বলছে, এসব কূটনৈতিক তৎপরতার কারণে তাদের মৌলিক অবস্থানের কোনো পরিবর্তন হয়নি। ইসলামাবাদের দৃষ্টিতে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো নিরাপত্তা। পাকিস্তান মনে করে, আফগান ভূখণ্ড থেকে পরিচালিত কোনো সশস্ত্র কার্যক্রম যদি তার ভূখণ্ডে হামলা বা অস্থিতিশীলতার কারণ হয়, তাহলে দুই দেশের মধ্যে স্বাভাবিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করা কঠিন হবে।

টিটিপিকে ঘিরে পাকিস্তানের উদ্বেগ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। পাকিস্তানের অভিযোগ, আফগানিস্তানের বিভিন্ন এলাকায় অবস্থান নিয়ে সংগঠনটির সদস্যরা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে হামলা চালানোর পরিকল্পনা ও কার্যক্রম পরিচালনা করে। এ ধরনের অভিযোগের জেরে পাকিস্তান অতীতে আফগান তালেবান সরকারের কাছে একাধিকবার ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে। সীমান্তে নিরাপত্তা জোরদার, সামরিক অভিযান এবং দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক উত্তেজনাও এর সঙ্গে সম্পর্কিত।

বিএলএ নিয়েও পাকিস্তানের একই ধরনের অভিযোগ রয়েছে। বেলুচিস্তানভিত্তিক সশস্ত্র সংগঠনটির বিরুদ্ধে পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরে দেশের নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রীয় স্থাপনার ওপর হামলার অভিযোগ করে আসছে। ইসলামাবাদের দাবি, আফগানিস্তানের ভূখণ্ড যেন এসব কর্মকাণ্ডের জন্য ব্যবহৃত না হয়। ফলে টিটিপির পাশাপাশি বিএলএ এবং অন্যান্য সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিরুদ্ধেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়াকে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার অন্যতম শর্ত হিসেবে দেখছে পাকিস্তান।

দুই দেশের সম্পর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সীমান্ত ব্যবস্থাপনা। পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যে দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে, যার বিভিন্ন অংশে নিরাপত্তা পরিস্থিতি জটিল। সীমান্তে যাতায়াত, বাণিজ্য এবং নিরাপত্তা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে প্রায়ই মতবিরোধ দেখা যায়। সীমান্তে সংঘর্ষ বা উত্তেজনা তৈরি হলে তার প্রভাব সাধারণ মানুষের জীবন ও দুই দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের ওপরও পড়ে।

আফগানিস্তানের সঙ্গে পাকিস্তানের অর্থনৈতিক ও ভৌগোলিক সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ। আফগানিস্তান একটি স্থলবেষ্টিত দেশ হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে প্রতিবেশী দেশগুলোর ভূখণ্ড ও যোগাযোগব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। পাকিস্তানের সমুদ্রবন্দর ও সড়ক যোগাযোগ ঐতিহাসিকভাবে আফগানিস্তানের বাণিজ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ফলে দুই দেশের রাজনৈতিক সম্পর্কের অবনতি হলে সীমান্ত বাণিজ্য, পণ্য পরিবহন ও সাধারণ মানুষের যাতায়াতেও এর প্রভাব পড়তে পারে।

অন্যদিকে আফগানিস্তানের জন্যও পাকিস্তানের সঙ্গে স্থিতিশীল সম্পর্ক আঞ্চলিক যোগাযোগ ও অর্থনৈতিক কার্যক্রমের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। রাজনৈতিক উত্তেজনা দীর্ঘস্থায়ী হলে বাণিজ্যিক সম্পর্কের পাশাপাশি সীমান্তবর্তী অঞ্চলের মানুষের জীবনেও অনিশ্চয়তা বাড়তে পারে। তাই দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রয়োজনীয়তা শুধু কূটনৈতিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে অর্থনীতি, নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার প্রশ্নও জড়িত।

চীনের ভূমিকার বিষয়টি এ কারণে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের সঙ্গে চীনের আলাদা আলাদা কৌশলগত ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। আঞ্চলিক যোগাযোগ, বাণিজ্য এবং নিরাপত্তার ক্ষেত্রে স্থিতিশীল পরিবেশ চীনের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। ফলে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা কমাতে বেইজিংয়ের কূটনৈতিক তৎপরতা ভবিষ্যতে আরও বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে পাকিস্তান যেহেতু স্পষ্ট করে দিয়েছে যে তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্থতা কাবুলের নিজস্ব দায়িত্বের বিকল্প নয়, তাই চীনের ভূমিকা মূলত আলোচনার পরিবেশ তৈরির মধ্যেই সীমিত থাকতে পারে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে পাকিস্তানের বার্তা মূলত দুটি দিক তুলে ধরছে। প্রথমত, ইসলামাবাদ আফগানিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক পুরোপুরি স্বাভাবিক করতে দরজা বন্ধ করে দেয়নি। দ্বিতীয়ত, সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য নিরাপত্তা ইস্যুতে কাবুলের কাছ থেকে দৃশ্যমান পদক্ষেপ চায় তারা। অর্থাৎ রাজনৈতিক যোগাযোগ বা কূটনৈতিক উদ্যোগের পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে সন্ত্রাসবিরোধী পদক্ষেপকে গুরুত্ব দিচ্ছে পাকিস্তান।

তবে এই শর্ত কতটা বাস্তবায়নযোগ্য এবং কাবুল তা কীভাবে গ্রহণ করে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। আফগানিস্তানের তালেবান সরকার যদি পাকিস্তানের উদ্বেগ বিবেচনায় নিয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়, তাহলে দুই দেশের মধ্যে নতুন করে সংলাপ ও সহযোগিতার সুযোগ তৈরি হতে পারে। সীমান্ত নিরাপত্তা, বাণিজ্য ও আঞ্চলিক যোগাযোগের ক্ষেত্রেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

অন্যদিকে পাকিস্তানের অভিযোগ ও দাবিকে কেন্দ্র করে যদি দুই পক্ষের মধ্যে অবিশ্বাস আরও বাড়ে, তাহলে সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়ার প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে সীমান্তে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হলে কূটনৈতিক যোগাযোগ বাধাগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি বাণিজ্যিক কার্যক্রমও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

সব মিলিয়ে আফগানিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে পাকিস্তান আপাতত কঠোর কিন্তু আলোচনার সুযোগ খোলা একটি অবস্থান নিয়েছে। ইসলামাবাদ বলছে, তারা সম্পর্ক উন্নয়নে আগ্রহী; তবে সেই পথের প্রথম শর্ত নিরাপত্তা। আফগান ভূখণ্ড থেকে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠীর কার্যক্রম বন্ধে কাবুল কতটা দৃশ্যমান ও যাচাইযোগ্য পদক্ষেপ নেয়, তার ওপরই অনেকটা নির্ভর করছে দুই প্রতিবেশী দেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্কের গতি।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com