প্রকাশ: ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বর্তমান সরকারকে আন্দোলনের মাধ্যমে তাৎক্ষণিকভাবে পতনের কোনো লক্ষ্য নেই বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। তিনি বলেছেন, তাদের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের ঘোষিত লং মার্চ সরকার উৎখাতের কর্মসূচি নয়। বরং গণভোটের গণরায় বাস্তবায়নসহ ছয় দফা দাবি আদায়ের লক্ষ্যেই এই রাজনৈতিক কর্মসূচি আয়োজন করা হয়েছে।
শুক্রবার ৪ সেপ্টেম্বর ১১ দলীয় ঐক্যের সর্বশেষ প্রস্তুতি বৈঠক শেষে আয়োজিত ব্রিফিংয়ে মিয়া গোলাম পরওয়ার এসব কথা বলেন। আগামী শনিবার ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম অভিমুখে ১১ দলীয় ঐক্যের লং মার্চ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। কর্মসূচিতে প্রায় দেড় হাজার গাড়ি অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে বলেও জানিয়েছেন তিনি।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ‘আমরা এই সরকারকে আন্দোলন করে আগামীকালকেই পতন করতে চাই না। উৎখাতের কোনো আন্দোলন আমরা করছি না।’ তার ভাষ্য অনুযায়ী, বিরোধী রাজনৈতিক দল হিসেবে দাবি আদায়ে শান্তিপূর্ণ ও নিয়মতান্ত্রিক কর্মসূচি পালন করা গণতান্ত্রিক রাজনীতির স্বাভাবিক অংশ।
তিনি বলেন, ১১ দলীয় ঐক্যের কর্মসূচিকে সরকারবিরোধী কোনো উৎখাত আন্দোলন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তাদের দাবি বাস্তবায়নে সরকারকে সহযোগিতা করার আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে প্রশাসনের কাছে লং মার্চ চলাকালে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ও সহযোগিতা প্রত্যাশা করেন জামায়াতের এই নেতা।
আগামী ৫ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিতব্য ঢাকা-চট্টগ্রাম লং মার্চকে কেন্দ্র করে ইতোমধ্যে ব্যাপক সাংগঠনিক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। সকাল ৭টায় রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে উদ্বোধনী সমাবেশের মাধ্যমে কর্মসূচির সূচনা হওয়ার কথা রয়েছে। এরপর গাড়িবহর চট্টগ্রামের উদ্দেশে যাত্রা করবে এবং দিন শেষে লালদীঘি ময়দানে সমাবেশের পরিকল্পনা রয়েছে।
গোলাম পরওয়ার জানান, ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে সংক্ষিপ্ত পথসভা অনুষ্ঠিত হবে। সম্ভাব্য পথসভাগুলোর মধ্যে রয়েছে কাচপুর ব্রিজসংলগ্ন ট্রাকস্ট্যান্ড, পদুয়ার বাজার বিশ্বরোড, কুমিল্লার নুরজান হোটেল এলাকা, চৌদ্দগ্রাম, মহিপাল ও মিরসরাই। সবকিছু স্বাভাবিক থাকলে সন্ধ্যার দিকে গাড়িবহর চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানে পৌঁছানোর আশা করছে ১১ দলীয় ঐক্য।
দীর্ঘ পথের এই রাজনৈতিক কর্মসূচিকে সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করতে বিশেষ কৌশল নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি। একটি পথসভা চলাকালে অগ্রবর্তী একটি দল পরবর্তী নির্ধারিত স্থানে পৌঁছে কর্মসূচির প্রস্তুতি নেবে। এরপর মূল গাড়িবহর ও শীর্ষ নেতারা সেখানে পৌঁছাবেন। এভাবে ধারাবাহিকভাবে পথসভাগুলো পরিচালনা করে সময় সাশ্রয়ের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
লং মার্চে অংশগ্রহণকারী গাড়িবহরের মধ্যে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে বিস্তারিত সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে জানান গোলাম পরওয়ার। অংশগ্রহণকারীদের ডেলিগেট কার্ড দেওয়া হবে এবং প্রতিটি গাড়িতে স্টিকার ও নম্বর ব্যবহার করা হবে। বহরে শীর্ষ নেতাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছাড়াও মেডিকেল টিম, কার্ডিয়াক ও অন্যান্য অ্যাম্বুলেন্স, সাংস্কৃতিক দল, আইটি টিম এবং গণমাধ্যমকর্মীদের জন্য পৃথক ব্যবস্থার কথা জানানো হয়েছে।
তিনি বলেন, গাড়িবহরের শৃঙ্খলা বজায় রাখতে অংশগ্রহণকারীদের নির্ধারিত নিয়ম অনুসরণ করতে হবে। পথসভাগুলোতে স্থানীয় পর্যায়ের নেতাকর্মীরা অংশ নেবেন। অন্যদিকে মূল গাড়িবহরের ডেলিগেটদের অধিকাংশকে নিজ নিজ গাড়িতে অবস্থান করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কেবল নির্ধারিত নেতারা বক্তব্য দেওয়ার প্রয়োজনে গাড়ি থেকে নামবেন।
পথে নতুন গাড়ি বহরে যুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রেও বিশেষ নিয়ম আরোপ করা হয়েছে। গোলাম পরওয়ার জানান, চলমান গাড়িবহরের মাঝখানে কোনো নতুন গাড়ি যুক্ত হতে পারবে না। কেউ কর্মসূচিতে অংশ নিতে চাইলে তাকে বহরের শেষ প্রান্তে গিয়ে যুক্ত হতে হবে। এতে দীর্ঘ গাড়িবহরের নিরাপত্তা এবং চলাচলের শৃঙ্খলা বজায় রাখা সহজ হবে বলে আয়োজকদের ধারণা।
লং মার্চের ছয় দফা দাবির মধ্যে রয়েছে গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার এবং বিদ্যুৎ, তেল, গ্যাস ও সারসংকট নিরসন। একই সঙ্গে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং সংকীর্ণ দলীয়করণ বন্ধের দাবিও জানিয়েছে ১১ দলীয় ঐক্য।
গোলাম পরওয়ারের বক্তব্যে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে কর্মসূচিটির রাজনৈতিক উদ্দেশ্য। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, তাদের আন্দোলনের লক্ষ্য সরকার উৎখাত করা নয়। বিরোধী দল হিসেবে জনগণের বিভিন্ন দাবি সামনে রেখে রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন করা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অংশ বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
তার মতে, সংসদীয় গণতন্ত্রে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি সরকারের জন্য কোনো হুমকি হিসেবে বিবেচিত হওয়ার কথা নয়। বরং ভিন্নমতকে সম্মান করা এবং রাজনৈতিক কর্মসূচি পালনে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা নিশ্চিত করাই গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির পরিচায়ক।
সরকারের উদ্দেশে গোলাম পরওয়ার বলেন, রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দেশে ভিন্নমতের প্রতি সহনশীলতা এবং বিরোধী দলের কর্মসূচির প্রতি সম্মান প্রদর্শনের একটি সুযোগ তৈরি হয়েছে। অতীতে রাজনৈতিক সহিংসতা এবং ভিন্নমতের ওপর দমন-পীড়নের যে সংস্কৃতির অভিযোগ ছিল, সেখান থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ এখন সরকারের সামনে রয়েছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
তিনি বলেন, ১১ দলীয় ঐক্যের লং মার্চ শান্তিপূর্ণ ও নিয়মতান্ত্রিকভাবে সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে। এজন্য সরকারের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক সহযোগিতা কামনা করেছেন তিনি। তার ভাষ্য অনুযায়ী, একটি বড় রাজনৈতিক কর্মসূচির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে।
তবে একই সঙ্গে লং মার্চে কোনো ধরনের বাধা বা প্রতিকূল পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে তার রাজনৈতিক প্রভাব নিয়েও সতর্ক করেছেন গোলাম পরওয়ার। তিনি বলেন, সরকারি দলের কোনো অংশ, অঙ্গসংগঠন কিংবা প্রশাসনের কোনো অংশ যদি কর্মসূচিকে বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করে, তাহলে সরকারের প্রতি জনগণের আস্থা আরও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং জনরোষ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিতে পারে।
তার এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে একদিকে যেমন শান্তিপূর্ণ কর্মসূচির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, অন্যদিকে সরকারের কাছে রাজনৈতিক কর্মসূচি নির্বিঘ্নে পালনের পরিবেশ নিশ্চিত করার আহ্বানও জানানো হয়েছে।
চট্টগ্রামে লং মার্চের সমাপনী সমাবেশ নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন গোলাম পরওয়ার। তিনি দাবি করেন, কর্মসূচি ঘিরে ব্যাপক সাড়া পাওয়া যাচ্ছে এবং লালদীঘি ময়দানে বড় ধরনের জনসমাগম ঘটতে পারে। আয়োজকদের প্রত্যাশা, সমাপনী কর্মসূচিতে ১১ দলীয় ঐক্যের নেতাকর্মীদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষেরও অংশগ্রহণ থাকবে।
এদিকে ১১ দলীয় ঐক্যের বৈঠক ও ব্রিফিংয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীও লং মার্চ নিয়ে বক্তব্য দেন। তিনি কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে কোনো ধরনের নাশকতা বা বিশৃঙ্খলার আশঙ্কা করছেন না বলে জানান। তবে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটলে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ এবং অংশগ্রহণকারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকারের ওপরই বর্তাবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তি একসঙ্গে ও ঐক্যবদ্ধভাবে কর্মসূচিতে অংশ নিলে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের সুযোগ কমে যায়। তিনি আশা প্রকাশ করেন, লং মার্চ শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হবে এবং সরকার কর্মসূচিতে পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।
বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় ১১ দলীয় ঐক্যের এই লং মার্চ বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার পর বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলোর বড় আকারের রাজপথের কর্মসূচিগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম হতে যাচ্ছে বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। তাই কর্মসূচিটি শুধু রাজনৈতিক শক্তি প্রদর্শনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং দেশের রাজনৈতিক সহনশীলতা এবং বিরোধী দলের কর্মসূচির প্রতি সরকারের অবস্থানও আলোচনায় আসতে পারে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষণে প্রায়ই বলা হয়, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বিরোধী দলের শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি এবং সরকারের সহনশীল আচরণ একটি কার্যকর রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ১১ দলীয় ঐক্যের নেতাদের বক্তব্যেও সেই বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।
গোলাম পরওয়ারের বক্তব্যের মূল বার্তা তাই স্পষ্ট—সরকার পতনের তাৎক্ষণিক কোনো আন্দোলন নয়, বরং নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট দাবি আদায়ের লক্ষ্যেই তারা মাঠে নামছেন। গণভোটের গণরায় বাস্তবায়নসহ ছয় দফা দাবির পক্ষে জনমত গড়ে তোলাই এই লং মার্চের প্রধান উদ্দেশ্য বলে জানিয়েছেন তিনি।
এখন সবার দৃষ্টি শনিবারের ঢাকা-চট্টগ্রাম লং মার্চের দিকে। কর্মসূচি কতটা শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়, কতসংখ্যক মানুষ ও যানবাহন এতে অংশ নেয় এবং সরকারের প্রশাসনিক সহযোগিতা কেমন থাকে—এসব বিষয় আগামী দিনের রাজনৈতিক আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।