কোটি টাকা খরচ, চিকিৎসা শুরুর আগেই বদল বার্ন ইউনিটে

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৬ বার
কোটি টাকা খরচ, চিকিৎসা শুরুর আগেই বদল বার্ন ইউনিটে

প্রকাশ: ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বগুড়ার ২৫০ শয্যার মোহাম্মদ আলী হাসপাতালে অগ্নিদগ্ধ রোগীদের চিকিৎসার জন্য প্রায় চার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত বার্ন ইউনিটটি ছয় বছরেও চালু করা যায়নি। প্রয়োজনীয় চিকিৎসক, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মী ও চিকিৎসা সরঞ্জামের অভাবে নির্মাণ শেষ হওয়ার পর থেকেই কার্যত অব্যবহৃত পড়ে থাকা ইউনিটটি এবার বার্ন চিকিৎসার জন্য না খুলে আইসিইউ ও সিসিইউ হিসেবে ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ফলে যে অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়েছিল আগুনে পোড়া মানুষের চিকিৎসার জন্য, সেটির নির্ধারিত ব্যবহার শুরুর আগেই পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে।

স্বাস্থ্য বিভাগের সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, গত ১৯ আগস্ট বগুড়া সফরের সময় স্বাস্থ্য সচিব কামরুজ্জামান চৌধুরী মোহাম্মদ আলী হাসপাতালের নির্মিত বার্ন ইউনিট পরিদর্শন করেন। পরিদর্শনের পর তিনি ইউনিটটি বার্ন চিকিৎসার জন্য চালু না করে বিদ্যমান অবকাঠামোকে আইসিইউ ও সিসিইউ হিসেবে ব্যবহারের নির্দেশনা দেন। এরপর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বার্ন ইউনিট হিসেবে চালুর প্রক্রিয়া থেকে সরে এসে সেখানে নিবিড় পরিচর্যা ও করোনারি কেয়ার সুবিধা চালুর উদ্যোগ নিয়েছে।

সরকারি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, মোহাম্মদ আলী হাসপাতালটি বগুড়ার ২৫০ শয্যার একটি জেলা পর্যায়ের সরকারি হাসপাতাল। একই জেলায় রয়েছে শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। কিন্তু অগ্নিদগ্ধ রোগীদের জন্য মোহাম্মদ আলী হাসপাতালে আলাদা পূর্ণাঙ্গ বার্ন ইউনিট চালু না হওয়ায় গুরুতর পোড়া রোগীদের চিকিৎসায় এখনও বিদ্যমান সার্জারি ও অন্যান্য ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।

হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, বগুড়া অঞ্চলের অগ্নিদগ্ধ রোগীদের চিকিৎসার সুবিধা বাড়াতে মোহাম্মদ আলী হাসপাতাল চত্বরে পৃথক বার্ন ইউনিট নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল ২০১৫ সালে। ২০১৭ সালে প্রকল্পের জন্য অর্থ বরাদ্দ পাওয়ার পর গণপূর্ত বিভাগ দরপত্র আহ্বান করে। এরপর ২০১৮ সালে নির্মাণকাজ শুরু হয়। প্রায় ৩ কোটি ৬৪ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মাণকাজ শেষ হয় ২০১৯ সালের অক্টোবরে। পরে নির্মিত অবকাঠামো হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার পরও ইউনিটটি চালু করা সম্ভব হয়নি। কারণ, শুধু ভবন তৈরি হলেও সেখানে চিকিৎসা দেওয়ার মতো প্রয়োজনীয় জনবল ও যন্ত্রপাতি নিয়োগ ও বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ একাধিকবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়ে চিকিৎসক, নার্সসহ প্রয়োজনীয় জনবল এবং চিকিৎসা সরঞ্জাম চাইলেও দীর্ঘ সময়েও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের হিসাব অনুযায়ী, ইউনিটটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করতে একজন সিনিয়র কনসালট্যান্ট, দুজন জুনিয়র কনসালট্যান্ট, দুজন সহকারী রেজিস্ট্রার, চারজন ইনডোর চিকিৎসা কর্মকর্তা, চারজন চিকিৎসা কর্মকর্তা এবং দুজন অবেদনবিদ প্রয়োজন। এর পাশাপাশি প্রয়োজন ১৬ জন সিনিয়র স্টাফ নার্স, ১২ জন অফিস সহায়ক, ১২ জন ওয়ার্ডবয় এবং আটজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী। কিন্তু এসব পদের অধিকাংশই সৃষ্টি বা পদায়ন করা হয়নি। ফলে কোটি টাকা ব্যয়ে তৈরি অবকাঠামো থাকলেও সেখানে রোগী ভর্তি করে চিকিৎসা দেওয়ার মতো জনবল কাঠামো গড়ে ওঠেনি।

শুধু জনবল সংকটই নয়, বার্ন চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় বিশেষায়িত সরঞ্জামও পাওয়া যায়নি। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে ইউনিটটির দরজা বন্ধ থেকেছে। চিকিৎসাসেবা দেওয়ার কথা ছিল যে ভবনে, সেখানে রোগী না থাকায় সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অবকাঠামো ও যন্ত্রপাতির কার্যকারিতা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সরকারি অর্থে নির্মিত একটি বিশেষায়িত চিকিৎসা অবকাঠামো ব্যবহার না করে ফেলে রাখার বিষয়টি স্বাস্থ্য খাতের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে।

বার্ন ইউনিটটিতে আধুনিক চিকিৎসাসেবার জন্য বিভিন্ন অবকাঠামো রাখা হয়েছিল। সেখানে রয়েছে বিশেষায়িত ওয়ার্ড, অস্ত্রোপচার কক্ষ, পর্যবেক্ষণ ইউনিট, চিকিৎসকদের বিশ্রামকক্ষ ও কর্তব্যরত চিকিৎসকদের জন্য আলাদা চেম্বার। এসব সুবিধা নির্মাণে বিপুল অর্থ ব্যয় হলেও চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী না থাকায় এগুলো এতদিন কার্যকর স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার অংশ হতে পারেনি।

এদিকে বগুড়া অঞ্চলে অগ্নিদগ্ধ রোগীর চিকিৎসার প্রয়োজন রয়েছে। গত তিন বছরে বগুড়ার দুটি সরকারি হাসপাতালে ৩৮৯ জন অগ্নিদগ্ধ রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন বলে হাসপাতাল-সংশ্লিষ্ট তথ্য থেকে জানা গেছে। তাদের মধ্যে ৩৮ জনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠাতে হয়েছে। স্থানীয়ভাবে পূর্ণাঙ্গ বার্ন চিকিৎসার সুযোগ থাকলে এসব রোগীর একটি অংশকে বগুড়াতেই চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হতে পারত বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা।

বিশেষ করে গুরুতর দগ্ধ রোগীর ক্ষেত্রে দ্রুত চিকিৎসা শুরু করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শরীরের বড় অংশ পুড়ে গেলে রোগীর দ্রুত তরল ব্যবস্থাপনা, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ, অস্ত্রোপচার, নিবিড় পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী নিবিড় পরিচর্যার প্রয়োজন হয়। দূরের হাসপাতালে স্থানান্তরের কারণে চিকিৎসা শুরুতে সময় নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি রোগী ও স্বজনদের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক ও মানসিক চাপ তৈরি হতে পারে। বগুড়ার মতো বড় একটি অঞ্চলে স্থানীয় পর্যায়ে বিশেষায়িত বার্ন চিকিৎসার ব্যবস্থা না থাকা তাই দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগের বিষয়।

মোহাম্মদ আলী হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বার্ন ইউনিট চালুর জন্য সর্বশেষ গত ২ আগস্ট স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে জনবল চেয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছিল। এর কিছুদিন পর স্বাস্থ্য সচিব হাসপাতালটি পরিদর্শন করেন। পরিদর্শনের পর মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়, মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ছাড়া ওই হাসপাতালে পৃথক বার্ন ইউনিট চালু করা সম্ভব নয়। বিদ্যমান অবকাঠামোকে আইসিইউ ও সিসিইউ হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে বলে নির্দেশনা দেওয়া হয়।

মোহাম্মদ আলী হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মজিদুল ইসলাম জানিয়েছেন, ভবন হস্তান্তরের পর থেকেই বার্ন ইউনিট চালুর জন্য প্রয়োজনীয় জনবল ও চিকিৎসা সরঞ্জাম চেয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও মন্ত্রণালয়ে একাধিকবার চিঠি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীর পদ সৃষ্টি হয়নি এবং প্রয়োজনীয় সরঞ্জামও বরাদ্দ পাওয়া যায়নি। সর্বশেষ চিঠিতেও ইউনিট চালুর জন্য জনবল ও সরঞ্জাম চাওয়া হয়েছিল। তবে স্বাস্থ্য সচিব পরিদর্শনের পর ইউনিটটি বার্ন চিকিৎসার পরিবর্তে আইসিইউ ও সিসিইউ হিসেবে ব্যবহারের নির্দেশনা দিয়েছেন।

এরই মধ্যে মোহাম্মদ আলী হাসপাতালকে ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার উপযোগী করার উদ্যোগের কথাও সামনে এসেছে। হাসপাতালটির শয্যা সংখ্যা ২৫০ থেকে ৫০০-তে উন্নীত করার পরিকল্পনার পাশাপাশি আধুনিক আইসিইউ চালুর উদ্যোগের কথাও স্থানীয়ভাবে আলোচিত হয়েছে। সেই প্রেক্ষাপটে বার্ন ইউনিটের অবকাঠামোকে আইসিইউ ও সিসিইউতে রূপান্তরের সিদ্ধান্ত হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা সক্ষমতা বাড়ানোর অংশ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।

তবে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে, একটি নির্দিষ্ট চিকিৎসা চাহিদা পূরণের জন্য নির্মিত অবকাঠামো কেন ছয় বছরেও নির্ধারিত কাজে ব্যবহার করা গেল না। ভবন নির্মাণের আগে প্রয়োজনীয় জনবল, যন্ত্রপাতি, পরিচালন কাঠামো এবং অর্থের সংস্থান নিশ্চিত করা হয়েছিল কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। কারণ শুধু অবকাঠামো নির্মাণ করলেই কোনো বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবা কার্যকর হয় না; সেই সেবার জন্য প্রশিক্ষিত চিকিৎসক, নার্স, টেকনিশিয়ান, সহায়ক কর্মী, ওষুধ ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জামের সমন্বিত ব্যবস্থা প্রয়োজন।

এখন কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত বার্ন ইউনিটটি আইসিইউ ও সিসিইউ হিসেবে ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হলেও সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, এতে যেন আগের মতো দীর্ঘসূত্রতা তৈরি না হয়। নতুন করে যদি জনবল ও সরঞ্জাম বরাদ্দে বিলম্ব হয়, তাহলে একই অবকাঠামো আবারও দীর্ঘদিন অব্যবহৃত থাকার ঝুঁকি তৈরি হবে।

বগুড়ার মানুষের কাছে বিষয়টি শুধু একটি ভবনের ব্যবহার পরিবর্তনের ঘটনা নয়। আগুনে পুড়ে যাওয়া একজন রোগীর জন্য দ্রুত চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ অনেক সময় জীবন-মৃত্যুর ব্যবধান তৈরি করতে পারে। সেই প্রয়োজন বিবেচনায় স্থানীয় পর্যায়ে বার্ন চিকিৎসার সক্ষমতা বাড়ানো এবং একই সঙ্গে আইসিইউ-সিসিইউ সেবা কার্যকর করা—দুই ক্ষেত্রেই বাস্তবসম্মত ও দ্রুত পদক্ষেপ প্রয়োজন। সরকারি অর্থে নির্মিত অবকাঠামো যেন আর অব্যবহৃত পড়ে না থাকে, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত