রোহিঙ্গা সংকট দীর্ঘ হলে বাড়বে নিরাপত্তাঝুঁকি

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৬ বার
রোহিঙ্গা সংকট দীর্ঘ হলে বাড়বে নিরাপত্তাঝুঁকি

প্রকাশ: ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রোহিঙ্গা সংকট যত দীর্ঘায়িত হচ্ছে, বাংলাদেশে এর মানবিক চাপের পাশাপাশি নিরাপত্তা ও সামাজিক ঝুঁকিও বাড়ছে। দীর্ঘদিন ধরে শরণার্থী হিসেবে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গার অবস্থান, প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় অচলাবস্থা, ক্যাম্পের ভেতরের নানা অপরাধমূলক তৎপরতা এবং মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের অস্থিতিশীল পরিস্থিতি—সব মিলিয়ে সংকটটি এখন আর কেবল মানবিক সহায়তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জাতীয় নিরাপত্তা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থের প্রশ্ন।

রাজধানীর রমনায় রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আয়োজিত ‘রোহিঙ্গা সংকট: নতুন চ্যালেঞ্জসমূহ এবং টেকসই কৌশল’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় বক্তারা এ উদ্বেগের কথা তুলে ধরেছেন। গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট ফর গ্লোবাল কো-অপারেশন ফাউন্ডেশন (আইজিসিএফ) আয়োজিত এ আলোচনায় সরকারের মন্ত্রী, কূটনীতিক, নিরাপত্তা বিশ্লেষক, গবেষক ও আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিরা অংশ নেন। আলোচনায় সংকটের দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হিসেবে প্রত্যাবাসনের পাশাপাশি ক্যাম্পের নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক সম্পৃক্ততা এবং জাতীয় পর্যায়ে সমন্বিত কৌশলের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান যত বিলম্বিত হবে, এর সার্বিক প্রভাব তত বিস্তৃত হবে। এতে বাংলাদেশের স্থানীয় জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি রোহিঙ্গারাও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই শুধু মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে তাদের নিরাপদ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের পথ তৈরি করতে হবে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মতে, রোহিঙ্গা সংকট বর্তমানে শুধু মানবিক সংকট নয়; এর সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা মাত্রা যুক্ত হয়েছে। ক্যাম্পগুলোতে নারীর প্রতি সহিংসতা, মাদক চোরাচালানসহ বিভিন্ন ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে একই পরিবেশে বিপুলসংখ্যক মানুষের বসবাস এবং প্রত্যাবাসনের অনিশ্চয়তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। ফলে বিষয়টিকে জাতীয় নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখার প্রয়োজন রয়েছে।

তিনি বলেন, রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় শুধু বেসামরিক প্রশাসনের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় করলেই হবে না। নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা সংস্থাগুলোকেও এর সঙ্গে কার্যকরভাবে যুক্ত করতে হবে। কারণ সংকটের প্রকৃতি পরিবর্তিত হয়েছে এবং এর প্রভাবও এখন বহুমাত্রিক। মানবিক সহায়তা, নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা, কূটনৈতিক উদ্যোগ এবং প্রত্যাবাসন—সবগুলো বিষয়কে একই কৌশলের আওতায় আনতে হবে।

বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে আসছে। বিশেষ করে ২০১৭ সালে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সহিংসতার পর কয়েক লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করে। এর আগে বিভিন্ন সময়েও রোহিঙ্গাদের একটি অংশ বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছিল। ফলে কক্সবাজারের শরণার্থীশিবিরগুলোতে দীর্ঘস্থায়ী জনবসতি তৈরি হয়েছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই শিবিরগুলো শুধু মানবিক সহায়তা পরিচালনার স্থান নয়, বরং একটি জটিল সামাজিক ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে।

দীর্ঘমেয়াদি এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের ওপর অর্থনৈতিক, সামাজিক ও পরিবেশগত চাপও তৈরি হয়েছে। স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে শরণার্থী জনগোষ্ঠীর সহাবস্থান, সীমিত সম্পদের ওপর চাপ, কর্মসংস্থানের সংকট, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার চাহিদা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি—সবকিছুর ওপর এর প্রভাব পড়ছে। ফলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছ থেকে দীর্ঘমেয়াদি সহায়তার পাশাপাশি সংকটের মূল কারণ সমাধানের উদ্যোগও জরুরি হয়ে উঠেছে।

সেমিনারে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেন, প্রকৃত প্রত্যাবাসনের দিকে এগোতে রোহিঙ্গাদের যাচাইপ্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করা প্রয়োজন। তাঁর মতে, যাচাইপ্রক্রিয়া অনির্দিষ্টকাল ধরে চলতে পারে না। বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় ব্যবস্থার ভিত্তিতে এই প্রক্রিয়া দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি শিবিরে জন্ম নেওয়া এবং ২০১৭ সালের পর রাখাইন থেকে আসা রোহিঙ্গাদের বাস্তব পরিস্থিতিও বিবেচনায় নিতে হবে।

প্রত্যাবাসন প্রশ্নে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি। সেখানে স্থিতিশীলতা না ফিরলে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরি করা কঠিন। একই সঙ্গে যারা ফিরে যাবেন, তাদের নিরাপত্তা, নাগরিক অধিকার, বসবাসের সুযোগ এবং ভবিষ্যৎ জীবনের নিশ্চয়তার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। শুধু সীমান্ত পার করে মানুষকে ফেরত পাঠানোকে টেকসই প্রত্যাবাসন হিসেবে দেখলে সংকটের স্থায়ী সমাধান হবে না।

এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের কূটনৈতিক তৎপরতাকেও আরও কার্যকর করার প্রয়োজনীয়তার কথা উঠে এসেছে আলোচনায়। মিয়ানমারের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় যোগাযোগের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সক্রিয় সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করা জরুরি। কারণ রোহিঙ্গা সংকটের উৎপত্তি বাংলাদেশের বাইরে হলেও এর দীর্ঘমেয়াদি মানবিক ও নিরাপত্তা বোঝা বহন করছে বাংলাদেশ।

প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসনবিষয়ক উপদেষ্টা মো. ইসমাইল জবিউল্লাহ রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে অগ্রগতি না হওয়ার জন্য বিগত সরকারের কূটনৈতিক ব্যর্থতার কথা উল্লেখ করেন। তিনি শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের কার্যালয়ের কার্যক্রম নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট হয়, দীর্ঘস্থায়ী সংকট মোকাবিলায় শুধু আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উদ্যোগ গ্রহণ যথেষ্ট নয়; দেশের ভেতরেও প্রশাসনিক কাঠামোকে আরও কার্যকর করতে হবে।

শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, সরকারের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনার অভাবে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের জন্য ক্যাম্পের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে কার্যকরভাবে সাড়া দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। তাঁর বক্তব্যে ক্যাম্প ব্যবস্থাপনায় একটি সুস্পষ্ট জাতীয় নীতির প্রয়োজনীয়তা আরও স্পষ্ট হয়েছে।

অন্যদিকে অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল মো. মাহফুজুর রহমান সংকট মোকাবিলায় প্রণোদনা, পরিণতি ও প্রেরণার সমন্বিত কৌশলের কথা বলেন। তাঁর মতে, মিয়ানমারকে বাংলাদেশের কৌশলগত ধৈর্যের সীমা সম্পর্কে স্পষ্ট বার্তা দিতে হবে। সীমান্ত দিয়ে রোহিঙ্গাদের নতুন করে প্রবেশের সম্ভাবনা এবং দীর্ঘস্থায়ী অবস্থান বাংলাদেশের জন্য যে অতিরিক্ত চাপ তৈরি করছে, তা বিবেচনায় রেখে আরও কার্যকর কূটনৈতিক ও নিরাপত্তা পদক্ষেপ প্রয়োজন।

মানবিক সহায়তা নিয়ে কাজ করা সংস্থাগুলোও সংকটটির পরিবর্তিত প্রকৃতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। একশনএইডের এ দেশীয় পরিচালক ফারাহ কবির বলেন, রোহিঙ্গা সংকটকে শুধু মানবিক সংকট হিসেবে দেখলে এর প্রকৃত চিত্র ধরা পড়বে না। এর সঙ্গে ভূরাজনীতি, নিরাপত্তা ও দুর্যোগঝুঁকিও জড়িত। সংকটের সবচেয়ে বড় বোঝা বাংলাদেশ বহন করছে—আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিষয়টি আরও জোরালোভাবে তুলে ধরার প্রয়োজন রয়েছে।

এদিকে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর হিসাবেও বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের দীর্ঘস্থায়ী অবস্থান একটি বড় মানবিক বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। বিপুলসংখ্যক মানুষের খাদ্য, বাসস্থান, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, সুরক্ষা ও দুর্যোগ মোকাবিলার ব্যবস্থা চালিয়ে যেতে আন্তর্জাতিক সহায়তার প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি সহায়তা ব্যবস্থা কখনোই প্রত্যাবাসনের বিকল্প হতে পারে না। বরং নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও টেকসই প্রত্যাবাসনের উপযোগী পরিবেশ তৈরিই সংকট সমাধানের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত।

রোহিঙ্গা শিবিরে নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়েও নতুন করে ভাবতে হচ্ছে। অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড, মাদক পাচার, নারী ও শিশুর নিরাপত্তা, মানবপাচারের ঝুঁকি এবং বিভিন্ন গোষ্ঠীর প্রভাব বিস্তারের মতো বিষয়গুলো শিবির ব্যবস্থাপনার জন্য বাড়তি চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। এসব সমস্যা মোকাবিলায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, প্রশাসন, মানবিক সংস্থা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় প্রয়োজন।

তবে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার নামে রোহিঙ্গাদের মানবিক অধিকার যেন ক্ষুণ্ন না হয়, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিন বাস্তুচ্যুত অবস্থায় থাকা এই জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা, মর্যাদা ও ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার দায়িত্ব শুধু বাংলাদেশের নয়; আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়েরও রয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের উপস্থিতির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত স্থানীয় জনগোষ্ঠীর স্বার্থকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

সব মিলিয়ে রোহিঙ্গা সংকট এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে শুধু ত্রাণ ও মানবিক সহায়তা দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব নয়। একদিকে ক্যাম্পের নিরাপত্তা ও মানবিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে, অন্যদিকে মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনের জন্য রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক চাপ বাড়াতে হবে। এর পাশাপাশি বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা, সীমান্ত সুরক্ষা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর স্বার্থকে সমন্বিত করে দীর্ঘমেয়াদি একটি জাতীয় কৌশল প্রণয়ন করা জরুরি।

রোহিঙ্গাদের জন্য প্রত্যাবাসন যেমন নিজ দেশে ফেরার আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে যুক্ত, বাংলাদেশের জন্য এটি তেমনি একটি দীর্ঘস্থায়ী জাতীয় সংকটের সমাধানের প্রশ্ন। তাই সংকট যত দীর্ঘ হবে, সমাধানের প্রয়োজনীয়তাও তত জরুরি হয়ে উঠবে। মানবিক দায়িত্ব ও জাতীয় নিরাপত্তার মধ্যে ভারসাম্য রেখে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাই এখন বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত