প্রকাশ: ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
সুনামগঞ্জের ছাতক পৌরসভায় দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে স্থায়ী সচিব না থাকায় নাগরিক সেবায় নানা জটিলতা ও ভোগান্তির অভিযোগ উঠেছে। অন্য একটি পৌরসভায় কর্মরত একজন সচিবকে অতিরিক্ত দায়িত্ব দিয়ে ছাতক পৌরসভার প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। একই কর্মকর্তাকে দুটি পৌরসভার দায়িত্ব সামলাতে হওয়ায় নিয়মিত প্রশাসনিক তদারকি ব্যাহত হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় সেবাগ্রহীতা ও নাগরিকরা।
ছাতক একটি এ গ্রেডের পৌরসভা। শহর ও আশপাশের এলাকার মানুষের জন্মনিবন্ধন, নাগরিক সনদ, ট্রেড লাইসেন্স, হোল্ডিং-সংক্রান্ত কাজ, বিভিন্ন প্রত্যয়নপত্র, নথি অনুমোদনসহ নানা নাগরিক সেবার জন্য পৌরসভার ওপর নির্ভর করতে হয়। এসব সেবা ক্রমেই অনলাইননির্ভর হয়ে উঠলেও দায়িত্বপ্রাপ্ত সচিবের নিয়মিত উপস্থিতি না থাকায় অনলাইনে আবেদন করার পরও কিছু ক্ষেত্রে অনুমোদন পেতে অপেক্ষা করতে হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, পৌরসভার কোনো একটি সেবা নেওয়ার জন্য অনলাইনে আবেদন করার পর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বা কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের প্রয়োজন হয়। কিন্তু অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা সচিব একই সময়ে অন্য একটি পৌরসভার দায়িত্ব পালন করায় সব সময় ছাতক পৌরসভায় উপস্থিত থাকতে পারেন না। ফলে কোনো কোনো আবেদন নির্দিষ্ট কর্মকর্তার অনুমোদনের অপেক্ষায় পড়ে থাকে। এতে সাধারণ মানুষকে একই কাজের জন্য একাধিকবার পৌরসভায় যেতে হচ্ছে।
গণক্ষাই এলাকার সেবাগ্রহীতা মোহাম্মদ মাহফুজুর রহমানের অভিজ্ঞতা এর একটি উদাহরণ। তিনি জানান, নাগরিক সনদের জন্য অনলাইনে আবেদন করার পর প্রয়োজনীয় অনুমোদন পেতে তাকে পৌরসভা ও উপজেলা কার্যালয়ে একাধিকবার যাতায়াত করতে হয়েছে। তাঁর দাবি, আগে সরাসরি আবেদন করে তুলনামূলক কম সময়ে নাগরিক সনদ পাওয়া গেলেও অনলাইন ব্যবস্থা চালুর পরও সংশ্লিষ্ট অনুমোদনের জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছে।
মাহফুজুর রহমানের ভাষ্য অনুযায়ী, অনলাইনে আবেদন করার পর পৌরসভার সচিবের অনুমোদন না হলে আবেদনটি পরবর্তী পর্যায়ে পৌর প্রশাসক বা মেয়রের কাছে যায় না। অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা সচিব অন্য পৌরসভায় কর্মরত থাকায় তাঁর উপস্থিতির জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছে। এতে জরুরি প্রয়োজনে সনদ নিতে আসা সাধারণ মানুষ সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়ছেন বলে তাঁর অভিযোগ।
দূরবর্তী এলাকা থেকে যারা পৌরসভায় সেবা নিতে আসেন, তাদের জন্য এ ধরনের বিলম্ব আরও বেশি ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। একটি কাগজ বা সনদের জন্য একবারের বদলে একাধিকবার যাতায়াত করতে হলে সময় ও অর্থ দুটিই ব্যয় হয়। বিশেষ করে দিনমজুর, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থী কিংবা জরুরি প্রশাসনিক কাজে সনদ প্রয়োজন এমন মানুষের ক্ষেত্রে এই অতিরিক্ত যাতায়াত বড় ধরনের সমস্যায় পরিণত হতে পারে।
স্থানীয় বাসিন্দা রাসেল মাহমুদ বলেন, ছাতক পৌরসভা একটি এ গ্রেডের গুরুত্বপূর্ণ পৌরসভা। এখানে স্থায়ী সচিব না থাকায় নাগরিকদের কাঙ্ক্ষিত সেবা পেতে ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে বলে তিনি মনে করেন। তাঁর মতে, একটি বড় পৌরসভার প্রশাসনিক কার্যক্রম দীর্ঘদিন অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার ওপর নির্ভরশীল রাখা কোনোভাবেই কাঙ্ক্ষিত নয়। নাগরিকদের দ্রুত ও নির্বিঘ্ন সেবা নিশ্চিত করতে ছাতক পৌরসভায় দ্রুত একজন স্থায়ী সচিব নিয়োগের দাবি জানান তিনি।
তবে নাগরিকদের অভিযোগের বিষয়ে ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন ছাতক পৌরসভার অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত সচিব শরদিন্দু রায়। তিনি জানান, ২০২৪ সালের জুন মাসে তিনি ছাতক পৌরসভায় অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে যোগ দেন। তাঁর মূল কর্মস্থল কানাইঘাট পৌরসভা। এর আগে তিনি কুলাউড়া পৌরসভায় সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
শরদিন্দু রায় বলেন, তিনি সপ্তাহের কোনো কোনো সময় দুই দিন এবং কোনো কোনো সপ্তাহে তিন দিন ছাতক পৌরসভায় অফিস করেন। তিনি দাবি করেন, দেশের অনেক পৌরসভাতেই বর্তমানে সচিবের পদ শূন্য রয়েছে। তারপরও ছাতক পৌরসভার জরুরি কাজসহ তাঁর ওপর অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালনের চেষ্টা করছেন তিনি।
ছাতকে উপস্থিত না থাকার দিনগুলোতেও কোনো জরুরি প্রশাসনিক কাজ থাকলে পৌরসভার কর্মচারীরা তাকে জানালে তিনি কানাইঘাট থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করেন বলে জানান। তাঁর দাবি, নাগরিকদের বড় ধরনের কোনো ভোগান্তি হচ্ছে না। তবে অনিচ্ছাকৃতভাবে কোনো কোনো আবেদন বাকি পড়ে যেতে পারে বলেও তিনি স্বীকার করেছেন।
স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকেও ছাতক পৌরসভায় স্থায়ী সচিবের প্রয়োজনীয়তার কথা উঠে এসেছে। পৌর প্রশাসক মো. মহিউদ্দিন বলেন, ছাতক একটি বড় ও এ গ্রেডের পৌরসভা হওয়ায় এখানে একজন স্থায়ী সচিব থাকা অত্যন্ত জরুরি। তবে এখন পর্যন্ত নাগরিক সেবা নিয়ে কোনো ধরনের ভোগান্তির অভিযোগ তাঁর কাছে আসেনি বলে জানান তিনি।
পৌর প্রশাসকের ভাষ্য, দেশের অনেক পৌরসভাতেই বর্তমানে সচিবের পদ শূন্য রয়েছে। এই বাস্তবতার মধ্যেও ছাতক পৌরসভার নাগরিকদের সেবা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্টরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছেন। তবে দীর্ঘমেয়াদে অতিরিক্ত দায়িত্বের মাধ্যমে একটি বড় পৌরসভার প্রশাসনিক কার্যক্রম চালানো কতটা কার্যকর, সে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
ছাতক পৌরসভার সাম্প্রতিক কার্যক্রম সম্পর্কে প্রকাশিত স্থানীয় তথ্যেও দেখা যায়, পৌর প্রশাসনের বিভিন্ন কার্যক্রমে পৌর নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে শরদিন্দু রায়ের সম্পৃক্ততা রয়েছে। অর্থাৎ একই কর্মকর্তা একাধিক দায়িত্ব পালন করছেন—যা স্থানীয় প্রশাসনে জনবল সংকটের একটি চিত্র তুলে ধরে।
বর্তমানে সরকারি ও স্থানীয় পর্যায়ের বহু সেবা অনলাইনে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এর ফলে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা ছিল সেবা আরও দ্রুত ও সহজ হবে। কিন্তু অনলাইন আবেদন প্রক্রিয়ার পর কোনো নির্দিষ্ট পর্যায়ে কর্মকর্তা-নির্ভর অনুমোদন আটকে গেলে প্রযুক্তিনির্ভর সেবার সুফল অনেকটাই কমে যায়। আবেদনকারীকে তখন অনলাইনে আবেদন করার পরও সরাসরি অফিসে গিয়ে খোঁজ নিতে হয়।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে নাগরিকদের মধ্যে অনাস্থাও তৈরি হতে পারে। কারণ অনলাইন সেবার অন্যতম উদ্দেশ্য হলো মানুষের সময় ও খরচ কমানো এবং সরকারি দপ্তরে অপ্রয়োজনীয় যাতায়াত কমিয়ে আনা। কিন্তু অনুমোদনের ধাপে দীর্ঘ অপেক্ষা তৈরি হলে সেই উদ্দেশ্য ব্যাহত হয়। ছাতক পৌরসভার ক্ষেত্রেও নাগরিকদের অভিযোগ মূলত এই জায়গাতেই।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পৌরসভা পর্যায়ে একজন সচিব শুধু নথিতে স্বাক্ষর বা অনুমোদনের কাজ করেন না; তিনি প্রশাসনিক কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা, বিভিন্ন দপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ, নথি ব্যবস্থাপনা এবং নাগরিক সেবা কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ফলে একটি বড় পৌরসভায় দীর্ঘদিন স্থায়ী সচিব না থাকলে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নে চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
তবে একই সঙ্গে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তাদের ওপরও অতিরিক্ত চাপের বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। একজন কর্মকর্তাকে একাধিক পৌরসভার দায়িত্ব দিলে তাঁকে দুই জায়গার প্রশাসনিক কাজ সমন্বয় করতে হয়। জরুরি কোনো কাজের ক্ষেত্রে শারীরিক উপস্থিতি প্রয়োজন হলে এই ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
স্থানীয় সরকার বিভাগের উপপরিচালক অসীম চন্দ্র বণিক এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেছেন। ফলে ছাতক পৌরসভায় স্থায়ী সচিব নিয়োগের বিষয়টি শেষ পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত ও জনবল ব্যবস্থাপনার ওপরই নির্ভর করছে।
ছাতকের নাগরিকদের প্রত্যাশা, দীর্ঘদিনের এই প্রশাসনিক শূন্যতা দ্রুত পূরণ করা হবে। কারণ নাগরিক সনদ থেকে শুরু করে জন্মনিবন্ধন, ট্রেড লাইসেন্স, হোল্ডিং, প্রত্যয়নপত্র কিংবা অন্যান্য পৌরসেবা—এসবের সঙ্গে সরাসরি সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন ও জীবিকা জড়িত। একটি সনদের জন্য বারবার অফিসে যাওয়া বা একজন কর্মকর্তার উপস্থিতির জন্য অপেক্ষা করা তাদের কাছে নিছক প্রশাসনিক বিলম্ব নয়; এটি সময়, অর্থ ও কর্মঘণ্টার ক্ষতি।
তাই ছাতক পৌরসভায় স্থায়ী সচিব নিয়োগের পাশাপাশি অনলাইন সেবা ব্যবস্থার অনুমোদন প্রক্রিয়াও আরও কার্যকর করার দাবি উঠেছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার অনুপস্থিতিতেও যাতে জরুরি আবেদন নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নিষ্পত্তি করা যায়, সে জন্য বিকল্প প্রশাসনিক ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। একই সঙ্গে নাগরিকদের অভিযোগ দ্রুত গ্রহণ ও নিষ্পত্তির ব্যবস্থা জোরদার করা গেলে পৌরসভার প্রতি মানুষের আস্থাও বাড়বে।
দীর্ঘদিনের জনবল সংকটের অবসান ঘটিয়ে ছাতক পৌরসভায় নিয়মিত প্রশাসনিক কার্যক্রম নিশ্চিত করা এখন স্থানীয় মানুষের অন্যতম প্রত্যাশা। এ গ্রেডের একটি গুরুত্বপূর্ণ পৌরসভায় স্থায়ী প্রশাসনিক নেতৃত্ব ও নিয়মিত কর্মকর্তা উপস্থিতি নিশ্চিত করা গেলে নাগরিক সেবার গতি বাড়বে এবং সাধারণ মানুষের অপ্রয়োজনীয় দৌড়ঝাঁপও কমবে—এমনটাই আশা করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।