৩৬ বিলিয়ন ডলারের রিজার্ভে নতুন আশার আলো

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৫ বার
৩৬ বিলিয়ন ডলারের রিজার্ভে নতুন আশার আলো

প্রকাশ: ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আবারও ৩৬ বিলিয়ন ডলারের ঘর অতিক্রম করেছে। এতে আমদানি ব্যয় পরিশোধ, জ্বালানি কেনা এবং বিদেশি ঋণের কিস্তি পরিশোধের ক্ষেত্রে দেশের সক্ষমতা আগের তুলনায় শক্তিশালী হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, রোববার দেশের মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩৬ দশমিক ৩৯ বিলিয়ন ডলারে। গত ছয় মাসে রিজার্ভ বেড়েছে প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার।

রিজার্ভ বৃদ্ধির এই চিত্র অর্থনীতির বৈদেশিক খাতে কিছুটা স্বস্তির বার্তা দিচ্ছে। কারণ পর্যাপ্ত বৈদেশিক মুদ্রার মজুত থাকলে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে প্রয়োজনীয় পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক অর্থসংকটে পড়তে হয় না। একই সঙ্গে বিদেশি ঋণের দায় পরিশোধ, জ্বালানি আমদানি এবং বৈদেশিক লেনদেন পরিচালনাও তুলনামূলক সহজ হয়। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে আমদানি ব্যয় বাড়লেও রিজার্ভে থাকা ডলার সেই অতিরিক্ত চাপ সামাল দিতে সহায়তা করছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত সপ্তাহেও দেশের মোট রিজার্ভ সাড়ে ৩৭ বিলিয়ন ডলারের ওপরে উঠেছিল। পরে ১ দশমিক ৩৯ বিলিয়ন ডলারের একটি বড় বিল পরিশোধের কারণে রিজার্ভ কিছুটা কমে আসে। এতে বোঝা যায়, রিজার্ভের আকার বাড়লেও আন্তর্জাতিক দায় ও আমদানি ব্যয় মেটাতে নিয়মিত বড় অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রা দেশের বাইরে যাচ্ছে।

রিজার্ভের মোট হিসাবের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের শর্ত অনুযায়ী বাংলাদেশের প্রকৃত ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভের হিসাবও আলাদাভাবে বিবেচনা করা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে বিপিএম-৬ পদ্ধতিতে দেশের রিজার্ভ ৩১ বিলিয়ন ডলারের বেশি। মোট রিজার্ভের তুলনায় এই হিসাব কম হওয়ার কারণ হলো, সব বৈদেশিক সম্পদ তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবহারযোগ্য নয়। ফলে দেশের বৈদেশিক সক্ষমতা মূল্যায়নে মোট রিজার্ভের পাশাপাশি বিপিএম-৬ হিসাবও গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে রিজার্ভের গুরুত্ব গত কয়েক বছরে আরও স্পষ্ট হয়েছে। ২০২১ সালের আগস্টে দেশের রিজার্ভ রেকর্ড প্রায় ৪৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছিল। করোনা মহামারির সময়ে আমদানি চাহিদা কমে যাওয়া এবং প্রবাসী আয়ের প্রবাহ বেড়ে যাওয়ায় তখন রিজার্ভ দ্রুত জমা হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে বৈশ্বিক বাজারে পণ্যের দাম বৃদ্ধি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, জ্বালানি ব্যয়ের চাপ এবং আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়।

ডলারের সংকট তীব্র হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার বাজারেও চাপ তৈরি হয়। আমদানি বিল পরিশোধে ব্যাংকগুলোকে বেশি দামে ডলার সংগ্রহ করতে হয়েছে। ডলারের বিনিময় হার বেড়ে যাওয়ার প্রভাব পড়েছে আমদানি করা খাদ্য, জ্বালানি, শিল্পের কাঁচামাল এবং অন্যান্য পণ্যের দামে। এর সঙ্গে মূল্যস্ফীতির চাপও যুক্ত হয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে গেলে শুধু আমদানি নয়, বিদেশি ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়।

সাম্প্রতিক সময়ে পরিস্থিতিতে কিছুটা পরিবর্তন এসেছে। বৈধ পথে প্রবাসী আয় বাড়ার পাশাপাশি রপ্তানি আয় থেকে ডলারের প্রবাহও অব্যাহত রয়েছে। একই সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রার বাজারকে তুলনামূলকভাবে বাজারভিত্তিক করার উদ্যোগ ডলারের সরবরাহ ও চাহিদার মধ্যে ভারসাম্য তৈরিতে ভূমিকা রেখেছে। ফলে আগের মতো ডলার সংকট নিয়ে ব্যাংকিং খাতে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা যাচ্ছে না।

রিজার্ভ বাড়ার আরেকটি বড় সুবিধা হলো জ্বালানি আমদানির ক্ষেত্রে অর্থ পরিশোধের সক্ষমতা বৃদ্ধি। সাম্প্রতিক মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম বেড়েছে। ফলে একই পরিমাণ জ্বালানি আমদানি করতে বাংলাদেশকে আগের তুলনায় বেশি ডলার ব্যয় করতে হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে রিজার্ভ পর্যাপ্ত না থাকলে জ্বালানি আমদানি, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং শিল্পকারখানার কার্যক্রমে বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারত।

অর্থনীতিবিদদের মতে, রিজার্ভের বর্তমান অবস্থান বাংলাদেশকে এই অতিরিক্ত ব্যয়ের ধাক্কা সামলানোর কিছুটা সক্ষমতা দিয়েছে। রিজার্ভ ভালো থাকায় আমদানি বিল পরিশোধে আস্থা বজায় থাকে এবং বিদেশি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছেও দেশের বৈদেশিক লেনদেন সক্ষমতা নিয়ে ইতিবাচক বার্তা যায়। বিনিময় হারও তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল রাখা সম্ভব হয়।

তবে রিজার্ভ বাড়ার এই স্বস্তির মধ্যেই অর্থনীতির অভ্যন্তরীণ একটি গুরুত্বপূর্ণ দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে উঠছে। সেটি হলো বিনিয়োগের গতি কমে যাওয়া। বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ দুর্বল থাকায় নতুন শিল্প স্থাপন ও বিদ্যমান শিল্পে সম্প্রসারণের উদ্যোগ কমেছে। উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগের আগ্রহ কম থাকায় মূলধনি যন্ত্রপাতি, শিল্পের কাঁচামাল এবং মধ্যবর্তী পণ্যের আমদানির চাহিদাও কমেছে। ফলে অর্থনীতিতে ডলারের ব্যবহার কম হওয়ায় রিজার্ভের ওপর চাপ তুলনামূলকভাবে কম রয়েছে।

অর্থাৎ রিজার্ভ বৃদ্ধিকে একদিকে ইতিবাচক অর্থনৈতিক সূচক হিসেবে দেখা গেলেও এর পেছনে আমদানি চাহিদা ও বিনিয়োগের দুর্বলতাও আংশিকভাবে কাজ করছে। একটি অর্থনীতি যখন দ্রুত সম্প্রসারিত হয়, তখন শিল্পের কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি ও মূলধনি পণ্য আমদানি বাড়ে। সে ক্ষেত্রে বৈদেশিক মুদ্রার ব্যবহারও বৃদ্ধি পায়। বাংলাদেশে এখন সেই চাহিদা প্রত্যাশিত মাত্রায় না থাকায় রিজার্ভের ওপর তাৎক্ষণিক চাপ কম।

তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির ঋণপত্র নিষ্পত্তি আগের বছরের তুলনায় কমেছে। মধ্যবর্তী পণ্যের আমদানিতেও পতন দেখা গেছে। শিল্পের কাঁচামাল আমদানিও প্রত্যাশিত হারে বাড়েনি। এসব প্রবণতা দেশের শিল্প ও বিনিয়োগ পরিস্থিতির ওপর কিছুটা চাপের ইঙ্গিত দেয়।

এ অবস্থায় আগামী দিনের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে রিজার্ভের এই স্বস্তিকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে যুক্ত করা। শুধু রিজার্ভ বাড়লেই অর্থনীতি শক্তিশালী হয় না; একই সঙ্গে উৎপাদন, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও রপ্তানি সক্ষমতাও বাড়াতে হয়। অর্থনীতিতে বিনিয়োগ ও আমদানি চাহিদা বাড়লে রিজার্ভের ওপর চাপ তৈরি হবে। তখন পর্যাপ্ত ডলার সরবরাহ নিশ্চিত করাই হবে বড় পরীক্ষা।

এর সঙ্গে রয়েছে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের চাপ। আগামী কয়েক বছরে বাংলাদেশের বিদেশি ঋণের কিস্তি ও সুদ পরিশোধের পরিমাণ বাড়বে। ফলে রিজার্ভের বর্তমান অবস্থান ধরে রাখতে প্রবাসী আয় ও রপ্তানি আয় বাড়ানোর পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রার ব্যয়ের ক্ষেত্রেও কার্যকর ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখা, বৈদেশিক ঋণের দায় সময়মতো পরিশোধ, বিনিয়োগ বাড়ার পরও প্রয়োজনীয় আমদানি সক্ষমতা ধরে রাখা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম বেড়ে গেলে তার প্রভাব মোকাবিলা—এই বিষয়গুলোতে নীতিনির্ধারকদের নজর রাখতে হবে। একই সঙ্গে অর্থনীতির অভ্যন্তরীণ চাহিদা ও বিনিয়োগকে গতিশীল করার উদ্যোগও জরুরি।

সব মিলিয়ে, ৩৬ বিলিয়ন ডলারের বেশি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য নিঃসন্দেহে একটি স্বস্তির খবর। এতে আমদানি ব্যয় ও বিদেশি ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা বেড়েছে এবং আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতার মধ্যেও কিছুটা সুরক্ষা তৈরি হয়েছে। কিন্তু এই অর্জনকে দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপ দিতে হলে রিজার্ভ বৃদ্ধির পাশাপাশি বিনিয়োগ, উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও রপ্তানির প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে হবে। কারণ একটি দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতার প্রকৃত পরীক্ষা শুধু কত ডলার রিজার্ভে জমা আছে, তা নয়; সেই বৈদেশিক মুদ্রা কতটা দক্ষতার সঙ্গে অর্থনীতির উৎপাদনশীল কর্মকাণ্ডে কাজে লাগানো যাচ্ছে, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত