৩০ দিন পেরিয়ে হাসিনার আপিলের সুযোগ নেই

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৪ বার
৩০ দিন পেরিয়ে হাসিনার আপিলের সুযোগ নেই

প্রকাশ: ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম বলেছেন, ট্রাইব্যুনালের রায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত কোনো আসামি নির্ধারিত ৩০ দিনের মধ্যে আপিল না করলে পরে আর আপিল করার সুযোগ থাকে না। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ওই সময়সীমার মধ্যে আপিল না করায় তার ক্ষেত্রে আপিলের সুযোগ আর নেই। সোমবার দুপুরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এ কথা জানান।

চিফ প্রসিকিউটরের এই বক্তব্য এমন সময়ে সামনে এলো, যখন শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের দেওয়া মৃত্যুদণ্ডের রায় এবং এর পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া নিয়ে রাজনৈতিক ও আইনাঙ্গনে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। বিশেষ করে মৃত্যুদণ্ডের রায়ের পর আসামির আপিলের অধিকার, নির্ধারিত সময়সীমা এবং পলাতক আসামির ক্ষেত্রে আইনি প্রক্রিয়া কীভাবে কার্যকর হবে—এসব বিষয় নিয়ে জনপরিসরে নানা প্রশ্ন রয়েছে।

আমিনুল ইসলাম বলেন, আইন অনুযায়ী ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার জন্য ৩০ দিনের সময়সীমা নির্ধারিত রয়েছে। কোনো মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি ওই সময়ের মধ্যে আপিল না করলে পরবর্তীতে তার আপিল করার সুযোগ থাকে না। তিনি একই ব্যাখ্যা শেখ হাসিনার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য বলে উল্লেখ করেন।

এর আগে চলতি বছরের জুলাই মাসেও শেখ হাসিনার আপিলের সুযোগ নিয়ে একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছিলেন চিফ প্রসিকিউটর। তখন তিনি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের সংশ্লিষ্ট ধারার কথা উল্লেখ করে বলেছিলেন, নির্ধারিত ৩০ দিনের পর আপিল করার সুযোগ নেই। একই সঙ্গে শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে তার বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায়ের পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ কী হবে, সে বিষয়েও তিনি বক্তব্য দিয়েছিলেন।

তবে শেখ হাসিনার মামলাকে ঘিরে আইনি প্রক্রিয়া শুধু আপিলের প্রশ্নেই সীমাবদ্ধ নয়। তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়টিও এর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। শেখ হাসিনা বর্তমানে দেশের বাইরে অবস্থান করছেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে তার বিরুদ্ধে দেওয়া রায় কার্যকর করার ক্ষেত্রে প্রত্যর্পণ বা তাকে বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা কর্তৃপক্ষের আওতায় আনার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

চিফ প্রসিকিউটরের বক্তব্য অনুযায়ী, কোনো মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামির জন্য আপিলের নির্ধারিত সময়সীমা অতিক্রম করার পর নতুন করে আপিলের সুযোগ তৈরি হয় না। তবে পলাতক অবস্থায় থাকা আসামিদের আইনি অধিকার এবং আদালতের প্রক্রিয়ায় তাদের অংশগ্রহণের বিষয়টি নিয়ে পৃথক আইনি ব্যাখ্যাও রয়েছে। এ কারণে বিষয়টি নিয়ে আইনজীবী ও আইনবিশেষজ্ঞদের মধ্যে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।

সোমবারের বক্তব্যে শুধু শেখ হাসিনার আপিলের বিষয়টিই নয়, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিভিন্ন মামলার সঙ্গে সম্পর্কিত আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ তুলে ধরেন চিফ প্রসিকিউটর। ট্রাইব্যুনালের রায়ে দণ্ডপ্রাপ্ত যেসব আসামির সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে, সেগুলো কী প্রক্রিয়ায় জব্দ করা হবে, তা নিয়েও পর্যালোচনা চলছে বলে জানান তিনি।

সম্পদ বাজেয়াপ্তের বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে মৃত্যুদণ্ড ও অন্যান্য দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের বিরুদ্ধে দেওয়া রায়ের পর। আদালতের রায়ে কোনো আসামির সম্পদ বাজেয়াপ্তের নির্দেশ থাকলে সেই নির্দেশ কীভাবে বাস্তবায়ন করা হবে, কোন কর্তৃপক্ষ সম্পদ শনাক্ত ও জব্দ করবে এবং সংশ্লিষ্ট সম্পদের ব্যবস্থাপনা কীভাবে হবে—এসব বিষয় নিয়ে প্রশাসনিক ও আইনি প্রক্রিয়া প্রয়োজন। আমিনুল ইসলাম জানিয়েছেন, বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট পর্যায়ে পর্যালোচনা চলছে।

সংবাদ সম্মেলনে গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন নিয়েও বক্তব্য দেন চিফ প্রসিকিউটর। তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কোনো ব্যক্তিকে ২৪ ঘণ্টার বেশি আটক রেখে গ্রেপ্তার না দেখালে এবং তাকে আইনি লড়াইয়ের সুযোগ না দিলে অতিরিক্ত সময়টুকু ‘গুম’ হিসেবে গণ্য হবে। তাঁর বক্তব্যে বিষয়টি নতুন করে মানবাধিকার ও আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে আলোচনায় এসেছে।

বাংলাদেশে গুমের অভিযোগ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই মানবাধিকার অঙ্গনে আলোচনা রয়েছে। বিভিন্ন সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে মানুষকে আটক করে দীর্ঘ সময় নিখোঁজ রাখার অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং দায় নির্ধারণের জন্য তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়া কীভাবে পরিচালিত হবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

আমিনুল ইসলাম বলেন, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইনের সঙ্গে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের আইনের কোনো অসংগতি থাকবে না। গুমের সব অভিযোগ ও রিপোর্ট যাচাই-বাছাই করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। অর্থাৎ অভিযোগের ধরন, ব্যাপকতা এবং ঘটনার প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে সংশ্লিষ্ট আইনি কাঠামোর আওতায় ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি নির্ধারণ করা হবে।

চিফ প্রসিকিউটরের বক্তব্যে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, গুমের অভিযোগকে এককভাবে দেখার পরিবর্তে যাচাই-বাছাইয়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়া। কারণ কোনো ব্যক্তির নিখোঁজ হওয়া, বেআইনিভাবে আটক থাকা কিংবা জোরপূর্বক গুমের অভিযোগ—প্রতিটি ঘটনার আইনি চরিত্র এক নয়। তদন্তের মাধ্যমে ঘটনার প্রকৃতি নির্ধারণ করেই পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে তিনি জানিয়েছেন।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল বর্তমানে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক সহিংসতা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ নিয়ে একাধিক মামলার বিচার ও তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এসব মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ, সাক্ষ্য-প্রমাণ, বিচারিক সিদ্ধান্ত এবং আপিলের সুযোগ নিয়ে জনমনে ব্যাপক আগ্রহ রয়েছে।

শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় সেই বিচারপ্রক্রিয়ার সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি। রায়ের পর থেকেই তার পরবর্তী আইনি অবস্থান, দেশে প্রত্যাবর্তন এবং সাজা কার্যকরের সম্ভাব্য প্রক্রিয়া নিয়ে রাজনৈতিক ও আইনাঙ্গনে আলোচনা চলছে। এখন চিফ প্রসিকিউটরের সর্বশেষ বক্তব্য সেই আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

তবে মৃত্যুদণ্ডের মতো সর্বোচ্চ শাস্তির ক্ষেত্রে আইনি প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিচারিক রায়ের পর আপিল, রায় বাস্তবায়ন এবং আসামির আইনগত অধিকার—সবকিছুই নির্ধারিত আইন ও বিধানের আলোকে পরিচালিত হওয়ার কথা। ফলে চিফ প্রসিকিউটরের বক্তব্যের পাশাপাশি আদালতের আনুষ্ঠানিক নথি ও সংশ্লিষ্ট আইনি বিধানই শেষ পর্যন্ত বিষয়টির চূড়ান্ত ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হবে।

শেখ হাসিনার আপিলের সুযোগ শেষ হয়েছে—চিফ প্রসিকিউটরের এই বক্তব্য এখন রাজনৈতিক আলোচনার পাশাপাশি আইনি বিতর্কেও গুরুত্ব পাচ্ছে। একই সঙ্গে গুমের অভিযোগ যাচাই, আটক ব্যক্তির আইনি অধিকার এবং দণ্ডপ্রাপ্তদের সম্পদ বাজেয়াপ্তের প্রক্রিয়া নিয়ে তার বক্তব্যও সামনে এনেছে বিচার ও মানবাধিকার ব্যবস্থার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

সব মিলিয়ে সোমবারের বক্তব্যে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারপ্রক্রিয়ার পরবর্তী ধাপগুলোর একটি সামগ্রিক চিত্র উঠে এসেছে। শেখ হাসিনার আপিলের সময়সীমা, দণ্ডপ্রাপ্তদের সম্পদ জব্দ এবং গুমের অভিযোগ যাচাই—তিনটি বিষয়ই এখন সংশ্লিষ্ট মহলে গভীর নজরদারির মধ্যে রয়েছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত