প্রকাশ: ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
এশিয়ান গেমসে ভারতীয় ক্রিকেট দলের আবাসন নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন আলোচনা। তারকা ক্রিকেটার জাসপ্রীত বুমরা, বৈভব সূর্যবংশীসহ ভারতীয় পুরুষ ক্রিকেট দলের জন্য পাঁচতারা হোটেলের ব্যবস্থা চেয়েছিল ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড (বিসিসিআই)। তবে বোর্ডের এই চাহিদায় সম্মতি দেয়নি ভারতীয় অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশন (আইওএ)। সংস্থাটির অবস্থান, এশিয়ান গেমসে অংশ নেওয়া সব ক্রীড়াবিদ ও দলের জন্য একই নীতিমালা অনুসরণ করা হবে; ক্রিকেটারদের জন্য আলাদা বা বিশেষ সুবিধা দেওয়ার সুযোগ নেই।
জাপানের আইচি-নাগোয়ায় অনুষ্ঠিতব্য এশিয়ান গেমসকে সামনে রেখে ভারতের বিভিন্ন ক্রীড়া দলের আবাসন, যাতায়াত ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার পরিকল্পনা করছে আইওএ। সেই ব্যবস্থার অংশ হিসেবে ভারতীয় পুরুষ ক্রিকেট দলকে তিনতারা এবং নারী ক্রিকেট দলকে চারতারা হোটেলে রাখার পরিকল্পনা করা হয়েছে। দুই দলের ক্ষেত্রেই কক্ষ ভাগাভাগি করে থাকার ব্যবস্থা থাকবে। তবে ক্রিকেটারদের তারকা হোটেলের মান নিয়ে বিসিসিআইয়ের আপত্তি থাকায় বিষয়টি এখন দুই পক্ষের আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে।
ভারতীয় ক্রিকেট দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের জন্য আবাসন গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। আন্তর্জাতিক পর্যায়ের ক্রিকেটারদের নিয়মিত অনুশীলন, বিশ্রাম, খাদ্যাভ্যাস ও ম্যাচের প্রস্তুতির জন্য নির্দিষ্ট পরিবেশ প্রয়োজন হয়। বিশেষ করে এশিয়ান গেমসের মতো বহুজাতিক ক্রীড়া আসরে বিভিন্ন ইভেন্টের সময়সূচি, ভেন্যুর দূরত্ব এবং যাতায়াতের সময়ের সঙ্গে সমন্বয় করে খেলোয়াড়দের দৈনন্দিন প্রস্তুতি নিতে হয়। ফলে হোটেলের অবস্থান ও সুযোগ-সুবিধা নিয়ে দলগুলোর আলাদা প্রত্যাশা থাকা অস্বাভাবিক নয়।
তবে আইওএর দৃষ্টিভঙ্গি ভিন্ন। সংস্থাটি মনে করছে, এশিয়ান গেমসে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করা প্রতিটি খেলাই সমান গুরুত্বপূর্ণ। ক্রিকেট দলের তারকা খেলোয়াড়দের জন্য আলাদা মানের আবাসন নিশ্চিত করা হলে অন্য খেলোয়াড়দের সঙ্গে বৈষম্যের প্রশ্ন উঠতে পারে। তাই ক্রিকেটারদের জন্য অন্য ক্রীড়াবিদদের তুলনায় বিশেষ ব্যবস্থা না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে তারা।
আইওএর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রঘুরাম আইয়ার জানিয়েছেন, ক্রিকেটারদের পাশাপাশি ভারতের পুরো প্রতিনিধিদলের সব খেলোয়াড়, কোচ ও কর্মকর্তাকে সমানভাবে বিবেচনা করা হচ্ছে। তার বক্তব্যের মূল বিষয় হলো, কোনো নির্দিষ্ট খেলা বা খেলোয়াড়ের জনপ্রিয়তার ভিত্তিতে আবাসন বা সুযোগ-সুবিধায় পার্থক্য করা হবে না। এশিয়ান গেমসে ভারতের হয়ে অংশ নেওয়া সব ক্রীড়াবিদই একই প্রতিনিধিদলের অংশ।
এর ফলে বিসিসিআইয়ের সামনে এখন মূলত দুটি পথ খোলা রয়েছে। একদিকে আয়োজকদের নির্ধারিত আবাসন ব্যবস্থায় ভারতীয় ক্রিকেট দলকে থাকতে হবে, অন্যদিকে বোর্ড চাইলে নিজেদের অর্থায়নে আলাদা হোটেলের ব্যবস্থা করতে পারবে। আইওএর পক্ষ থেকে স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে, নিজেদের খরচে ক্রিকেটারদের জন্য আলাদা আবাসন বেছে নিলে সেই ব্যবস্থাপনার দায়িত্বও বিসিসিআইকেই নিতে হবে।
শুধু হোটেলের ভাড়া পরিশোধ করলেই দায়িত্ব শেষ হবে না। আলাদা ব্যবস্থা নেওয়া হলে ক্রিকেটারদের থাকা ও খাওয়ার পাশাপাশি অনুশীলন ও ম্যাচের ভেন্যুতে যাতায়াত নিশ্চিত করতে হবে বিসিসিআইকে। খেলোয়াড়দের নির্ধারিত সময়ে মাঠে পৌঁছানো, প্রয়োজনীয় পরিবহন ব্যবস্থা এবং অন্যান্য লজিস্টিক বিষয়ও তখন বোর্ডের ব্যবস্থাপনার আওতায় পড়বে। অর্থাৎ বিশেষ আবাসনের স্বাধীনতা থাকলেও এর সঙ্গে বাড়তি আর্থিক ও সাংগঠনিক দায়িত্বও যুক্ত হবে।
এই পরিস্থিতিতে বিসিসিআই ইতোমধ্যে জাপানে একটি প্রতিনিধিদল পাঠানোর পরিকল্পনা করেছে। তারা সেখানে গিয়ে ক্রিকেটারদের জন্য নির্ধারিত হোটেল, খাবার, যাতায়াত এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা সরেজমিনে পরিদর্শন করবে। পরিদর্শনের পরই বোর্ড চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে—আয়োজকদের নির্ধারিত আবাসনে দলকে রাখা হবে, নাকি নিজেদের উদ্যোগে বিকল্প ব্যবস্থা করা হবে।
ভারতীয় ক্রিকেটের জনপ্রিয়তা ও আর্থিক সক্ষমতার কারণে বিসিসিআইয়ের পক্ষে নিজেদের ব্যবস্থাপনায় উন্নত আবাসন নিশ্চিত করা তুলনামূলকভাবে সহজ হতে পারে। কিন্তু বিষয়টি শুধু অর্থের নয়। এশিয়ান গেমস একটি বহুজাতিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, যেখানে ক্রিকেটসহ বিভিন্ন ডিসিপ্লিনের খেলোয়াড়রা একই জাতীয় দলের প্রতিনিধিত্ব করেন। ফলে একটি দলের জন্য বিশেষ সুবিধা নেওয়া হলে তা অন্য ক্রীড়াবিদদের মধ্যে কী ধরনের প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে, সেটিও বিবেচনায় রাখতে হবে।
অন্যদিকে ক্রিকেটারদের পারফরম্যান্সের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। ভারতের পুরুষ ক্রিকেট দলে জাসপ্রীত বুমরার মতো আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত খেলোয়াড় এবং বৈভব সূর্যবংশীর মতো তরুণ প্রতিভা থাকায় তাদের নিয়ে দর্শক ও গণমাধ্যমের আগ্রহ স্বাভাবিকভাবেই বেশি। এশিয়ান গেমসে ক্রিকেটের প্রতিযোগিতায় ভারতের অংশগ্রহণও তাই বাড়তি মনোযোগ পাবে। খেলোয়াড়দের প্রস্তুতি ও শারীরিক সক্ষমতা ধরে রাখতে পর্যাপ্ত বিশ্রাম এবং অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করা দলের ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
তবে আবাসন নিয়ে এই টানাপোড়েনের মধ্যেও আইওএ যে বিষয়টি স্পষ্ট করেছে, তা হলো জাতীয় দলের মর্যাদা সবার জন্য সমান। ক্রিকেট ভারতের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলাগুলোর একটি হলেও এশিয়ান গেমসে অংশ নেওয়া অ্যাথলেটিকস, শুটিং, বক্সিং, কুস্তি, ব্যাডমিন্টনসহ অন্যান্য ডিসিপ্লিনের খেলোয়াড়দের গুরুত্বও একইভাবে বিবেচনা করা হবে। এ নীতির মাধ্যমে সংস্থাটি মূলত জাতীয় প্রতিনিধিদলের মধ্যে সমতা বজায় রাখার অবস্থান তুলে ধরেছে।
এশিয়ান গেমসের মতো বড় আয়োজনে আবাসন ব্যবস্থাপনা সবসময়ই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ। একই সময়ে হাজারো ক্রীড়াবিদ, কোচ ও কর্মকর্তার থাকা, খাওয়া ও যাতায়াতের ব্যবস্থা করতে হয় আয়োজকদের। প্রতিটি দেশের দল তাদের খেলোয়াড়দের প্রয়োজন অনুযায়ী সুবিধা প্রত্যাশা করলেও আয়োজকদের সক্ষমতা ও নির্ধারিত নীতিমালার সঙ্গে সেটি সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হয়।
ভারতের ক্ষেত্রেও এখন মূল প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে, বিসিসিআই শেষ পর্যন্ত কোন পথ বেছে নেয়। বোর্ডের প্রতিনিধিদল জাপানে গিয়ে বাস্তব পরিস্থিতি দেখার পর সিদ্ধান্ত নেবে। যদি আয়োজকদের দেওয়া ব্যবস্থা আন্তর্জাতিক ক্রিকেটারদের প্রয়োজন মেটানোর মতো যথেষ্ট মনে হয়, তাহলে সেই আবাসনেই দল থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। আর যদি বোর্ড মনে করে আরও উন্নত বা আলাদা ব্যবস্থা প্রয়োজন, তাহলে নিজেদের অর্থায়নে হোটেল বেছে নেওয়ার সুযোগ তাদের রয়েছে।
ফলে এশিয়ান গেমসে ভারতীয় ক্রিকেট দলের অংশগ্রহণের আগে মাঠের বাইরেই তৈরি হয়েছে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক প্রশ্ন। একদিকে তারকা ক্রিকেটারদের জন্য উন্নত সুবিধা নিশ্চিত করার বিসিসিআইয়ের আগ্রহ, অন্যদিকে সব ক্রীড়াবিদের জন্য সমান আচরণ নিশ্চিত করার আইওএর নীতি—দুই অবস্থানের মধ্যে সমন্বয়ই এখন সবচেয়ে বড় বিষয়। জাপানে বিসিসিআইয়ের পরিদর্শন শেষে নেওয়া সিদ্ধান্তেই নির্ধারিত হবে বুমরা-সূর্যবংশীদের শেষ পর্যন্ত কোথায় এবং কী ধরনের ব্যবস্থায় থাকতে হবে।