দেশে মাথাপিছু ঋণ এখন ১ লাখ ২৯ হাজার ২৩৯ টাকা

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৪ বার
দেশে মাথাপিছু ঋণ এখন ১ লাখ ২৯ হাজার ২৩৯ টাকা

প্রকাশ: ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশের মানুষের মাথাপিছু ঋণের পরিমাণ বেড়ে এখন ১ লাখ ২৯ হাজার ২৩৯ টাকায় দাঁড়িয়েছে। চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত হিসাব অনুযায়ী এ পরিমাণ ঋণের তথ্য জাতীয় সংসদে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। সরকারের ঋণ ব্যবস্থাপনা, রাজস্ব আয় বৃদ্ধি এবং সরকারি ব্যয় নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সংসদে এক প্রশ্নের জবাবে এসব তথ্য তুলে ধরেন তিনি।

রোববার জাতীয় সংসদে সংসদ সদস্য রেজা আহমেদের এক প্রশ্নের লিখিত জবাবে অর্থমন্ত্রী জানান, মানুষের ওপর ঋণের বোঝা কমাতে সরকার রাজস্ব আদায় বাড়ানোর পাশাপাশি সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। একই সঙ্গে সরকারি ঋণ গ্রহণ ও ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা আনার জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। সরকারের লক্ষ্য হচ্ছে নিজস্ব আয় বাড়িয়ে ঋণের প্রয়োজনীয়তা ধীরে ধীরে কমিয়ে আনা।

মাথাপিছু ঋণের পরিমাণ সাধারণ মানুষের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সূচক। রাষ্ট্রের মোট ঋণকে জনসংখ্যার হিসাবে ভাগ করলে মাথাপিছু ঋণের একটি ধারণা পাওয়া যায়। তবে এই হিসাব সরাসরি প্রত্যেক নাগরিকের ব্যক্তিগত ঋণ বা প্রত্যেক ব্যক্তির কাছ থেকে আদায়যোগ্য অর্থ বোঝায় না। বরং এটি দেশের মোট সরকারি ঋণের পরিমাণকে জনসংখ্যার অনুপাতে প্রকাশ করে। তাই এই পরিসংখ্যানের মাধ্যমে দেশের ঋণের সামগ্রিক চাপ সম্পর্কে একটি ধারণা পাওয়া যায়।

অর্থমন্ত্রী সংসদে জানিয়েছেন, সরকারি ঋণের বোঝা নিয়ন্ত্রণে সরকারের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো রাজস্ব আদায় বাড়ানো। বর্তমানে সরকারের উন্নয়ন ও পরিচালন ব্যয়ের একটি বড় অংশ নিজস্ব রাজস্ব থেকে মেটানো হলেও বিভিন্ন প্রয়োজন পূরণে ঋণের ওপরও নির্ভর করতে হয়। নিজস্ব আয় বাড়ানো গেলে সরকারি ব্যয়ের অর্থায়নে ঋণের প্রয়োজন কমবে। একই সঙ্গে ঋণের সুদ পরিশোধে সরকারের যে অর্থ ব্যয় হয়, সেটিও নিয়ন্ত্রণে রাখার সুযোগ তৈরি হবে।

এ জন্য কর ও কর-বহির্ভূত রাজস্ব আদায় বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। কর ব্যবস্থার আওতা ও কার্যকারিতা বাড়ানোর পাশাপাশি সরকারের অন্যান্য নিজস্ব আয়ের উৎসকে আরও কার্যকর করার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। সরকারের আয় ও ব্যয়ের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করা গেলে বাজেট ঘাটতি কমবে এবং ঘাটতি পূরণে অতিরিক্ত ঋণ নেওয়ার প্রয়োজনও কমতে পারে।

ঋণের পাশাপাশি সরকারি ব্যয় নিয়ন্ত্রণের বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে। অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন, অপ্রয়োজনীয় ও কম গুরুত্বপূর্ণ খাতে সরকারি ব্যয় কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করার মাধ্যমে অপচয় কমানো হবে। এতে একদিকে রাষ্ট্রীয় অর্থের সাশ্রয় হবে, অন্যদিকে প্রয়োজনীয় খাতে অর্থ বরাদ্দ দেওয়ার সক্ষমতা বাড়বে।

সরকারি ঋণের সুদের হার এবং পুনর্বিত্তায়নের ঝুঁকি কমানোর বিষয়েও ঋণ ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনার কথা জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। সরকারি ঋণ শুধু কত টাকা নেওয়া হচ্ছে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ নয়; কী সুদে, কত মেয়াদে এবং কোন উৎস থেকে ঋণ নেওয়া হচ্ছে, সেটিও রাষ্ট্রের আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বেশি সুদের ঋণ দীর্ঘমেয়াদে সরকারের ব্যয়ের ওপর চাপ তৈরি করতে পারে। ফলে ঋণের কাঠামো আরও কার্যকর করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

এ লক্ষ্যে সরকারি সিকিউরিটিজের বাজারকে আরও কার্যকর ও প্রতিযোগিতামূলক করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে দেশের অভ্যন্তরীণ ঋণের বাজার সংস্কার এবং বিনিয়োগকারীর সংখ্যা বাড়ানোর পরিকল্পনার কথাও সংসদে তুলে ধরেছেন অর্থমন্ত্রী। একটি কার্যকর অভ্যন্তরীণ ঋণবাজার থাকলে সরকার তুলনামূলকভাবে পরিকল্পিতভাবে অর্থ সংগ্রহ করতে পারে। একই সঙ্গে ঋণের উৎসে বৈচিত্র্য তৈরি হলে নির্দিষ্ট একটি উৎসের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতার ঝুঁকি কমানো সম্ভব হয়।

সঞ্চয়পত্রের মাধ্যমেও অতিরিক্ত ঋণ গ্রহণ নিয়ন্ত্রণে রাখার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন, এ ক্ষেত্রে নির্ধারিত সীমা অনুসরণ করা হচ্ছে। পাশাপাশি সঞ্চয়পত্রের সুদ বা মুনাফার হারকে বাজার পরিস্থিতি এবং প্রচলিত সুদের হারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে সরকারের ঋণ গ্রহণের ব্যয় এবং বাজারের বিভিন্ন ঋণ উৎসের মধ্যে ভারসাম্য তৈরির চেষ্টা করা হচ্ছে।

সরকারের ঋণ ব্যবস্থাপনায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সুদ ব্যয়। সরকারের নেওয়া ঋণের ওপর নিয়মিত সুদ পরিশোধ করতে হয়। ঋণের পরিমাণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সুদ পরিশোধের চাপও বাড়তে পারে। ফলে বাজেটের অর্থের একটি বড় অংশ যদি সুদ পরিশোধে চলে যায়, তাহলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো ও সামাজিক সুরক্ষার মতো খাতে সরকারের ব্যয় করার সুযোগ সীমিত হতে পারে। এ কারণেই সরকার বেশি সুদের ঋণের ওপর নির্ভরতা কমাতে চায় বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী।

অর্থমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, সরকারের নেওয়া পদক্ষেপগুলোর ফলে উচ্চ সুদের ঋণের ওপর নির্ভরতা কমবে এবং সুদ ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে সরকারি ঋণের ক্ষেত্রে ভারসাম্য তৈরি করা যাবে। অর্থাৎ সরকারের লক্ষ্য শুধু ঋণের পরিমাণ কমানো নয়, বরং ঋণ নেওয়ার পদ্ধতি, উৎস, সুদের হার এবং পরিশোধের সক্ষমতাকে সমন্বিতভাবে বিবেচনা করা।

অপরিকল্পিত ঋণ গ্রহণ ঠেকাতেও নতুন পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। সরকার প্রতিবছরের জন্য একটি নির্দিষ্ট ঋণ গ্রহণ পরিকল্পনা করবে এবং সেই পরিকল্পনার ভিত্তিতেই ঋণ নেওয়ার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। এর ফলে প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত ঋণ নেওয়ার ঝুঁকি কমবে এবং রাষ্ট্রের সামগ্রিক ঋণ ব্যবস্থাপনায় পূর্বপরিকল্পনা তৈরি হবে।

অর্থনীতিবিদদের দৃষ্টিতে, সরকারি ঋণ সবসময় নেতিবাচক বিষয় নয়। উন্নয়ন প্রকল্প, অবকাঠামো নির্মাণ বা উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগের জন্য পরিকল্পিত ঋণ অর্থনীতিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু ঋণের অর্থ যদি অনুৎপাদনশীল খাতে ব্যয় হয় অথবা ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা বিবেচনা না করে ধারাবাহিকভাবে ঋণ নেওয়া হয়, তাহলে ভবিষ্যতে রাষ্ট্রের আর্থিক চাপ বাড়তে পারে। তাই ঋণের পরিমাণের পাশাপাশি সেই অর্থ কোথায় ব্যবহার হচ্ছে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে তার কী অবদান থাকছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

মাথাপিছু ১ লাখ ২৯ হাজার ২৩৯ টাকার ঋণের তথ্য প্রকাশের ফলে দেশের সরকারি ঋণ ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়, মূল্যস্ফীতি এবং আয়-ব্যয়ের চাপের মধ্যে রাষ্ট্রের ঋণের পরিমাণ বাড়লে তার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব কী হতে পারে, তা নিয়ে আগ্রহ রয়েছে। তবে মাথাপিছু ঋণের পরিসংখ্যানকে ব্যক্তিগত ঋণের সঙ্গে সরাসরি তুলনা করলে ভুল ধারণা তৈরি হতে পারে। এটি মূলত দেশের সামগ্রিক সরকারি ঋণের একটি গড় হিসাব।

এখন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে রাজস্ব আয় বাড়ানো, অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানো এবং ঋণ গ্রহণকে একটি টেকসই কাঠামোর মধ্যে রাখা। একই সঙ্গে ঋণের অর্থ উৎপাদনশীল খাতে ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে সেই বিনিয়োগ থেকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও রাজস্ব আয় বাড়ে। তা না হলে ঋণের সুদ ও আসল পরিশোধের চাপ ক্রমেই বাড়তে পারে।

জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রীর দেওয়া তথ্য তাই শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়; এটি দেশের সামগ্রিক আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি বার্তাও দিচ্ছে। মানুষের মাথাপিছু সরকারি ঋণ ১ লাখ ২৯ হাজার ২৩৯ টাকায় পৌঁছানোর পর সরকারের সামনে এখন রাজস্ব বৃদ্ধি, ব্যয় সংযম ও সুশৃঙ্খল ঋণ ব্যবস্থাপনার সমন্বয় কতটা কার্যকরভাবে করা যায়, সেটিই বড় প্রশ্ন। রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও দক্ষতা বাড়ানো গেলে ঋণের চাপ নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতাও নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত