যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের, খেসারত দিচ্ছে পুরো বিশ্ব: ইরান

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৪ বার
যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের, খেসারত দিচ্ছে বিশ্ব: ইরান

প্রকাশ: ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের চলমান সংঘাতকে কেন্দ্র করে বিশ্বজুড়ে তৈরি হওয়া অর্থনৈতিক ও জ্বালানি সংকটের দায় ওয়াশিংটনের ওপর চাপিয়েছেন ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই। তাঁর অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যে সামরিক সংঘাত শুরু করেছে, সেটির প্রভাব এখন বিশ্ব অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ছড়িয়ে পড়েছে। অথচ সেই সংকটের দায় ইরানের ওপর চাপিয়ে দিয়ে পুরো বিশ্বের কাছ থেকে এর মূল্য আদায় করার চেষ্টা করছে ওয়াশিংটন।

রোববার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় বাঘাই বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক হামলা শুরুর আগে হরমুজ প্রণালি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য উন্মুক্ত ছিল। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, সংঘাত শুরুর পর থেকেই গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে তেল ও অন্যান্য পণ্য পরিবহনে, আর সেই চাপ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে আন্তর্জাতিক বাজারে।

ইরানি মুখপাত্রের বক্তব্য এমন এক সময়ে এসেছে, যখন হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা আবারও তীব্র হয়েছে। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে এই জলপথ এবং এর আশপাশে তেলবাহী জাহাজকে লক্ষ্য করে পাল্টাপাল্টি হামলার খবর পাওয়া যাচ্ছে। ফলে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

হরমুজ প্রণালি পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরকে সংযুক্ত করা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ। মধ্যপ্রাচ্যের তেল ও গ্যাস রপ্তানির বড় একটি অংশ এই পথ দিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পৌঁছে। ফলে এখানে দীর্ঘ সময় ধরে জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হলে শুধু সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর অর্থনীতিই নয়, এশিয়া, ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের জ্বালানি বাজারেও তার প্রভাব পড়তে পারে।

সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, সংঘাতের কারণে প্রণালিটির বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। গত কয়েক দিনে সেখানে পণ্যবাহী জাহাজের চলাচল আরও কমেছে বলে বিভিন্ন সামুদ্রিক পরিবহন তথ্য থেকে জানা গেছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ছে এবং জ্বালানির ভবিষ্যৎ মূল্য নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দামও বেড়েছে। কয়েক দফা সামরিক উত্তেজনার পর ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৯০ ডলারের ওপরে উঠে গেছে। সর্বশেষ পরিস্থিতিতে বাজার বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, হরমুজ প্রণালিতে দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা তৈরি হলে অপরিশোধিত তেলের দাম আরও বাড়তে পারে। তেলের দাম বাড়লে তার প্রভাব শুধু পেট্রল বা ডিজেলের বাজারে সীমাবদ্ধ থাকে না; পরিবহন ব্যয়, বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পের কাঁচামাল এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামেও এর প্রভাব পড়তে পারে।

ইরানের অভিযোগের মূল জায়গাটি এখানেই। তেহরানের বক্তব্য, যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট সরবরাহ সংকট এবং আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতাকে ইরানের আচরণের ফল হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করা হচ্ছে। বাঘাইয়ের ভাষায়, যুক্তরাষ্ট্র নিজেই যে পরিস্থিতি তৈরি করেছে, এখন সেই পরিস্থিতির জন্য ইরানকে দায়ী করে বিশ্ববাসীর সামনে এর ‘বিল’ তুলে ধরছে ওয়াশিংটন।

ইরানি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র আরও দাবি করেন, যুদ্ধ শুরুর আগে হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক নৌ চলাচল স্বাভাবিক ছিল। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের পর পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়েছে। তাঁর অভিযোগ, ওই সংঘাত আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাকে বিপর্যস্ত করেছে এবং এর আর্থিক বোঝা এখন সাধারণ মানুষসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ওপর পড়ছে।

তবে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের এই অভিযোগের সঙ্গে একমত নয়। ওয়াশিংটনের বক্তব্য, হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ইরানের সামরিক ও জ্বালানি সক্ষমতার ওপর চাপ সৃষ্টি করা তাদের সামরিক কৌশলের অংশ। অন্যদিকে তেহরান দাবি করছে, আন্তর্জাতিক নৌপথে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক তৎপরতাই পরিস্থিতিকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে।

দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি অবস্থানের কারণে হরমুজ প্রণালি এখন শুধু সামরিক সংঘাতের ক্ষেত্র নয়, আন্তর্জাতিক অর্থনীতির জন্যও বড় উদ্বেগের কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ব্যবসায়ী ও আমদানিকারকেরা জ্বালানি সরবরাহের সম্ভাব্য সংকট এবং পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির বিষয়টি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন।

এই পরিস্থিতির প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেও দেখা যাচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে দেশটিতে ডিজেল ও জ্বালানির দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বড় অর্থনীতিগুলোতে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়তে পারে বলে অর্থনীতিবিদদের একটি অংশ আশঙ্কা করছেন। বিশেষ করে পরিবহন ও শিল্প খাতে জ্বালানি ব্যয় বেড়ে গেলে তার প্রভাব ভোক্তা পর্যায়েও পৌঁছাতে পারে।

ইউরোপ ও এশিয়ার দেশগুলোর জন্য ঝুঁকি আরও বেশি। এশিয়ার অনেক দেশ মধ্যপ্রাচ্যের তেল ও গ্যাসের ওপর উল্লেখযোগ্যভাবে নির্ভরশীল। হরমুজ প্রণালির মাধ্যমে সরবরাহ কমে গেলে তাদের বিকল্প উৎস খুঁজতে হবে, যা স্বাভাবিকভাবেই বাড়তি ব্যয় তৈরি করবে। জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশগুলোতে সেই ব্যয়ের চাপ শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার খরচ বাড়িয়ে দিতে পারে।

বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতির দেশগুলোর জন্যও মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লে জ্বালানি আমদানির ব্যয় বাড়তে পারে। এর সঙ্গে পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয়ও বাড়ার আশঙ্কা থাকে। ফলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং আমদানি ব্যয় ব্যবস্থাপনায় বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে।

অন্যদিকে সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে শুধু তেল নয়, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসসহ অন্যান্য জ্বালানি সরবরাহেও অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর আস্থার সংকট তৈরি হলে পণ্য পরিবহনের জন্য জাহাজের ভাড়া এবং বিমা ব্যয়ও বাড়তে পারে। এর প্রভাব বিশ্ব বাণিজ্যের সামগ্রিক ব্যয়কে আরও উঁচুতে নিয়ে যেতে পারে।

এ অবস্থায় ইরানের বক্তব্য আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তেহরান একদিকে যুক্তরাষ্ট্রকে যুদ্ধের জন্য দায়ী করছে, অন্যদিকে ওয়াশিংটন ইরানের ওপর সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপ অব্যাহত রাখছে। দুই পক্ষের মধ্যে রাজনৈতিক সমঝোতার সম্ভাবনা স্পষ্ট না হওয়ায় সংঘাতের ভবিষ্যৎ নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।

বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে, হরমুজ প্রণালিতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এখন শুধু ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিপক্ষীয় স্বার্থের বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং কোটি কোটি মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়। সামরিক সংঘাত যত দীর্ঘ হবে, অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিধিও তত বাড়ার আশঙ্কা থাকবে।

ফলে ইরানের এই অভিযোগকে কেন্দ্র করে নতুন করে যে প্রশ্নটি সামনে এসেছে তা হলো—যুদ্ধের সামরিক ফলাফল যাই হোক, এর অর্থনৈতিক বোঝা শেষ পর্যন্ত কতটা বহন করতে হবে সাধারণ বিশ্ববাসীকে। হরমুজ প্রণালিতে দ্রুত স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা না গেলে সেই প্রশ্নের উত্তর আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত