প্রকাশ: ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
সরকারি চাকরির ১১ থেকে ২০তম গ্রেডে সরাসরি নিয়োগের পরীক্ষাপদ্ধতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের উদ্যোগ ঘিরে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। প্রস্তাবিত বিধিমালায় মৌখিক পরীক্ষার নম্বর উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানোর পাশাপাশি লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার ন্যূনতম নম্বর কমানোর কথা বলা হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে এটিকে নিয়োগপ্রক্রিয়ায় অভিন্নতা আনা, প্রক্সি ও পরীক্ষাজালিয়াতি ঠেকানো এবং যোগ্য জনবল বাছাইয়ের উদ্যোগ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হলেও চাকরিপ্রার্থী, শিক্ষার্থী, বিরোধী রাজনৈতিক পক্ষ ও প্রশাসনের সাবেক কর্মকর্তাদের একটি অংশ এ সিদ্ধান্ত নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
প্রস্তাবিত ‘মন্ত্রণালয় বা বিভাগ এবং এর আওতাধীন অধিদপ্তর, পরিদপ্তর, দপ্তর ও সংস্থার ১১-২০তম গ্রেডে সরাসরি নিয়োগের জন্য পরীক্ষার মানবণ্টন (বিশেষ বিধান) বিধিমালা, ২০২৬’-এর খসড়া প্রশাসনিক উন্নয়ন-সংক্রান্ত সচিব কমিটিতে অনুমোদন পেয়েছে। এখন সরকারের চূড়ান্ত অনুমোদনের পর এটি কার্যকর হওয়ার কথা। নতুন কাঠামো কার্যকর হলে সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের নিম্ন ও মধ্যম স্তরের বিপুলসংখ্যক পদে নিয়োগ পরীক্ষার প্রচলিত মানবণ্টনে পরিবর্তন আসবে।
প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় ১১ ও ১২তম গ্রেডের চাকরিতে লিখিত পরীক্ষা হবে ১০০ নম্বরে এবং মৌখিক পরীক্ষা হবে ৫০ নম্বরে। ১৩ থেকে ১৬তম গ্রেডে লিখিত পরীক্ষার নম্বর নির্ধারণ করা হয়েছে ৬০ এবং মৌখিক পরীক্ষার নম্বর ৪০। আর ১৭ থেকে ২০তম গ্রেডে লিখিত ও মৌখিক—দুই পরীক্ষাতেই ২৫ করে নম্বর থাকবে। ফলে বর্তমানে যেসব পদে লিখিত পরীক্ষার ওজন তুলনামূলক বেশি, সেসব ক্ষেত্রে মৌখিক পরীক্ষার গুরুত্ব অনেকটাই বেড়ে যাবে।
শুধু মানবণ্টনেই পরিবর্তন আসছে না, লিখিত পরীক্ষায় পাসের ন্যূনতম নম্বরও কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। ১১ ও ১২তম গ্রেডে লিখিত পরীক্ষার পাস নম্বর ৫০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩৫ শতাংশ করার কথা বলা হয়েছে। ১৩ থেকে ১৬তম গ্রেডের ক্ষেত্রে তা ৫০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৪০ শতাংশ করার প্রস্তাব রয়েছে। এর ফলে তুলনামূলক কম নম্বর পেয়েও একজন প্রার্থী মৌখিক পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ পাবেন।
বর্তমান ব্যবস্থায় বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর, পরিদপ্তর ও দপ্তরের নিয়োগবিধিতে পরীক্ষার ধরন ও নম্বর বণ্টনে পার্থক্য রয়েছে। কোথাও লিখিত পরীক্ষার নম্বর বেশি, কোথাও মৌখিকের নম্বর ভিন্ন। আবার কিছু ক্ষেত্রে ব্যবহারিক পরীক্ষা, সাঁটলিপি বা কম্পিউটার মুদ্রাক্ষর পরীক্ষাও থাকে। সরকারের যুক্তি হলো, এই ভিন্নতা দূর করে একটি অভিন্ন কাঠামোর মধ্যে নিয়োগ পরীক্ষা পরিচালনা করলে প্রক্রিয়াটি আরও সমন্বিত হবে।
সরকারি চাকরির ১১ থেকে ২০তম গ্রেডের বড় একটি অংশের নিয়োগ সরাসরি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিভাগ, অধিদপ্তর, পরিদপ্তর বা সরকারি সংস্থার মাধ্যমে হয়ে থাকে। এসব নিয়োগ পরীক্ষায় বিভিন্ন সময়ে অনিয়ম, প্রক্সি বা একজনের হয়ে অন্যজন পরীক্ষা দেওয়ার অভিযোগও সামনে এসেছে। এই ধরনের জালিয়াতি ঠেকানোর প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেই নতুন মানবণ্টনের পক্ষে যুক্তি দিচ্ছে সরকার।
তবে সমালোচকদের আপত্তির মূল জায়গা হলো মৌখিক পরীক্ষার নম্বরের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি। তাদের আশঙ্কা, লিখিত পরীক্ষায় একজন প্রার্থী তুলনামূলকভাবে ভালো করলেও মৌখিক পরীক্ষায় কম নম্বর দিয়ে তাকে পিছিয়ে দেওয়া সম্ভব হতে পারে। বিপরীতে লিখিত পরীক্ষায় অপেক্ষাকৃত কম নম্বর পাওয়া কোনো প্রার্থীকে মৌখিক পরীক্ষায় বেশি নম্বর দিয়ে চূড়ান্ত তালিকায় এগিয়ে দেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে মৌখিক পরীক্ষা যেহেতু তুলনামূলকভাবে বিষয়ভিত্তিক ও মূল্যায়নকারীর ওপর নির্ভরশীল, তাই এখানে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা কঠিন হতে পারে বলে তারা মনে করছেন।
চাকরিপ্রত্যাশীদের একটি অংশের উদ্বেগও মূলত এখানেই। সরকারি চাকরির জন্য দীর্ঘ সময় ধরে প্রস্তুতি নেওয়া প্রার্থীরা সাধারণত লিখিত পরীক্ষাকে মেধা যাচাইয়ের প্রধান ধাপ হিসেবে দেখেন। লিখিত পরীক্ষায় ভালো ফল করার পরও যদি মৌখিক পরীক্ষার নম্বরের বড় ব্যবধানে চূড়ান্ত ফল পরিবর্তিত হয়, তাহলে পরীক্ষার্থীদের মধ্যে নিয়োগপ্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনা দেখা গেছে।
প্রস্তাবিত পরিবর্তনের প্রতিবাদে মঙ্গলবার রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ হয়েছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা মিছিল ও সমাবেশ করে মৌখিক পরীক্ষার নম্বর বাড়ানোর সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও শিক্ষার্থীদের একটি অংশ ভাইভার নম্বর বৃদ্ধিকে নতুন ধরনের কোটা হিসেবে আখ্যা দিয়ে প্রতিবাদ জানিয়েছে। তাদের বক্তব্য, লিখিত পরীক্ষার তুলনায় মৌখিক পরীক্ষার প্রভাব অতিরিক্ত বেড়ে গেলে মেধাভিত্তিক প্রতিযোগিতার জায়গা দুর্বল হতে পারে।
বিষয়টি জাতীয় সংসদেও আলোচনায় এসেছে। জামায়াতের সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম মাসুদ সরকারি চাকরির ১১ থেকে ২০তম গ্রেডে লিখিত পরীক্ষার পাস নম্বর কমানো এবং মৌখিক পরীক্ষার নম্বর বাড়ানোর সমালোচনা করেছেন। তার অভিযোগ, এই পদ্ধতি মেধার মূল্যায়নকে দুর্বল করে পছন্দের প্রার্থীকে নিয়োগ দেওয়ার সুযোগ তৈরি করতে পারে। তবে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, চলমান কোনো বিষয়ে পয়েন্ট অব অর্ডার তোলার সুযোগ নেই।
অন্যদিকে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, নতুন পদ্ধতির উদ্দেশ্য কোনো নির্দিষ্ট প্রার্থী বা গোষ্ঠীকে সুবিধা দেওয়া নয়। প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান জানিয়েছেন, শুধু লিখিত পরীক্ষায় ভালো ফল করাই চাকরির জন্য যথেষ্ট নয়; একজন প্রার্থীর যোগাযোগ দক্ষতা, আচরণ, মানসিক সক্ষমতা ও অন্যান্য যোগ্যতাও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। সেই বিবেচনায় মৌখিক পরীক্ষার গুরুত্ব বাড়ানো হয়েছে বলে তিনি ব্যাখ্যা দিয়েছেন।
তবে মৌখিক পরীক্ষা তুলনামূলকভাবে বেশি বিষয়নির্ভর এবং এখানে মূল্যায়নকারীর ব্যক্তিগত বিচার-বিবেচনার প্রভাব থাকার সম্ভাবনা রয়েছে—এ বিষয়টি সরকারপক্ষও অস্বীকার করেনি। উপদেষ্টা নিজেই বলেছেন, মৌখিক পরীক্ষায় কারসাজি বা পছন্দের কাউকে সুবিধা দেওয়ার সুযোগ তুলনামূলকভাবে বেশি। এই বাস্তবতার মধ্যেই ভাইভার নম্বর বাড়ানোর সিদ্ধান্ত কেন নেওয়া হচ্ছে, সেটিই এখন বিতর্কের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু।
সরকারের পক্ষ থেকে আরও বলা হয়েছে, নিয়োগ পরীক্ষায় প্রক্সি ও জালিয়াতি ঠেকাতে অভিন্ন মানবণ্টন প্রয়োজন। কারিগরি পদে লিখিত পরীক্ষার পাশাপাশি ব্যবহারিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়াকেও বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব রয়েছে। ব্যবহারিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ প্রার্থীরাই মৌখিক পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ পাবেন। অর্থাৎ নতুন ব্যবস্থায় পদভেদে লিখিত, ব্যবহারিক ও মৌখিক পরীক্ষার সমন্বিত মূল্যায়নের কাঠামো তৈরি করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
তবে সাবেক প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের কেউ কেউ মনে করছেন, নিয়োগে অনিয়ম ঠেকাতে মৌখিক পরীক্ষার নম্বর বাড়ানোর পরিবর্তে পরীক্ষার পুরো প্রক্রিয়ায় প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, পরিচয় গোপন রেখে খাতা মূল্যায়ন, প্রশ্নপত্রের নিরাপত্তা, কেন্দ্র ব্যবস্থাপনা এবং ফল প্রকাশে স্বচ্ছতা বাড়ানো বেশি কার্যকর হতে পারে। এতে প্রক্সি বা জালিয়াতির পাশাপাশি মূল্যায়ন প্রক্রিয়াতেও আস্থা বাড়ানোর সুযোগ থাকবে।
প্রস্তাবিত বিধিমালা কার্যকর হওয়ার আগে সরকারের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো নিয়োগপ্রক্রিয়ার প্রতি চাকরিপ্রত্যাশীদের আস্থা নিশ্চিত করা। সরকারি চাকরি বাংলাদেশের তরুণদের কাছে শুধু একটি কর্মসংস্থানের সুযোগ নয়, সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তারও গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। ফলে নিয়োগের নিয়মে বড় কোনো পরিবর্তন হলে তার যৌক্তিকতা, স্বচ্ছতা এবং বাস্তব প্রয়োগ নিয়ে পরিষ্কার ব্যাখ্যা থাকা জরুরি।
শেষ পর্যন্ত নতুন বিধিমালা কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে শুধু লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার নম্বরের ওপর নয়; বরং পুরো নিয়োগপ্রক্রিয়া কতটা নিরপেক্ষভাবে পরিচালিত হয় তার ওপর। সরকারের উদ্দেশ্য যদি প্রক্সি ও নিয়োগজালিয়াতি বন্ধ করে প্রকৃত যোগ্য প্রার্থী বাছাই করা হয়, তাহলে সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নে প্রতিটি ধাপে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করাই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আর চাকরিপ্রত্যাশীদের আস্থা অর্জন করতে হলে মৌখিক পরীক্ষার মূল্যায়নেও এমন সুরক্ষা ব্যবস্থা প্রয়োজন, যাতে লিখিত পরীক্ষায় অর্জিত মেধা অযৌক্তিকভাবে উপেক্ষিত হওয়ার সুযোগ না থাকে।