বৈশ্বিক সংকট সমাধানে চেষ্টা অব্যাহত থাকবে: খলিলুর রহমান

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১২ বার
বৈশ্বিক সংকট সমাধানে চেষ্টা অব্যাহত থাকবে: খলিলুর রহমান

প্রকাশ: ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব নেওয়ার পর বৈশ্বিক বিভিন্ন সংকট মোকাবিলায় সংলাপ, সহযোগিতা ও সহাবস্থানের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানিয়েছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। তিনি বলেছেন, বিশ্বের সব সমস্যার দ্রুত ও বন্ধুত্বপূর্ণ সমাধান সব সময় সম্ভব নাও হতে পারে। কিছু সংকট দীর্ঘ সময় ধরে চলতে পারে, আবার কিছু সমস্যা হয়তো পুরোপুরি সমাধানও হবে না। তবে যেখানে সমাধানের সুযোগ রয়েছে, সেখানে আন্তরিক প্রচেষ্টার কোনো ঘাটতি রাখা হবে না।

মঙ্গলবার নিউইয়র্কে জাতিসংঘের ৮০তম অধিবেশনের সমাপ্তির পর আনুষ্ঠানিক শপথের মাধ্যমে ৮১তম অধিবেশনের সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন খলিলুর রহমান। এর মধ্য দিয়ে প্রায় চার দশক পর আবারও একজন বাংলাদেশি জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতির গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে এলেন। এর আগে ১৯৮৬ সালে বাংলাদেশের কূটনীতিক ও রাজনীতিবিদ হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী সাধারণ পরিষদের ৪১তম অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

দায়িত্ব গ্রহণের পর জাতিসংঘ সদর দপ্তরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে খলিলুর রহমান বৈশ্বিক বাস্তবতার জটিলতা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, পৃথিবীর প্রতিটি সমস্যা দ্রুত সমাধান হয়ে যাবে—এমন প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয়। কিছু বিষয়ে সমাধানে পৌঁছাতে দীর্ঘ সময় লাগতে পারে এবং কিছু বিষয় হয়তো অমীমাংসিতও থেকে যেতে পারে। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে দেশগুলোর মধ্যে সহাবস্থান, বোঝাপড়া ও সহযোগিতা প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা থেমে থাকবে।

খলিলুর রহমানের বক্তব্যে আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে বাস্তববাদী অবস্থানের পাশাপাশি আলোচনার ওপর আস্থার বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। তাঁর মতে, মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও দেশগুলোর মধ্যে যোগাযোগ বজায় রাখা এবং সম্ভাব্য জায়গাগুলোতে সমঝোতা খোঁজা জরুরি। বর্তমান বিশ্বে যুদ্ধ, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, মানবিক সংকট, বাস্তুচ্যুতি, জলবায়ু পরিবর্তন, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং উন্নয়ন ঘাটতির মতো একাধিক সমস্যা একসঙ্গে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ওপর চাপ তৈরি করছে। এসব সংকটের কোনো একক বা তাৎক্ষণিক সমাধান নেই বলেই বহুপক্ষীয় সহযোগিতাকে তিনি গুরুত্ব দিচ্ছেন।

জাতিসংঘের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে তাঁর দায়িত্বের পরিধি মূলত বিভিন্ন সদস্যরাষ্ট্রের মধ্যে আলোচনা ও সমন্বয় এগিয়ে নেওয়ার সঙ্গে যুক্ত। ১৯৩ সদস্যের সাধারণ পরিষদে বিশ্বের প্রায় সব রাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্ব রয়েছে। ফলে এই পরিষদের সভাপতির অন্যতম বড় দায়িত্ব হলো বিভিন্ন দেশের মতপার্থক্যের মধ্যেও আলোচনার পরিবেশ বজায় রাখা এবং গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক ইস্যুতে সংলাপের পথ খোলা রাখা।

খলিলুর রহমান বলেছেন, তাঁর কাজ সহজ হবে যদি জাতিসংঘের সদস্যরাষ্ট্রগুলো নিজেদের মধ্যে সহযোগিতা বাড়ায়। তিনি প্রত্যাশা করেন, দেশগুলো অভিন্ন স্বার্থের জায়গাগুলো চিহ্নিত করে একসঙ্গে কাজ করবে। বিশেষ করে যেসব বিষয়ে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ছাড়া অগ্রগতি সম্ভব নয়, সেসব ক্ষেত্রে পারস্পরিক আস্থা ও সমন্বয় বাড়ানোর ওপর তিনি গুরুত্ব দিতে চান।

জাতিসংঘের সংস্কারের বিষয়টিও তাঁর দায়িত্বকালের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে। মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস জাতিসংঘকে আরও কার্যকর, আধুনিক ও জবাবদিহিমূলক করার লক্ষ্যে বিভিন্ন সংস্কার উদ্যোগের প্রস্তাব দিয়েছেন। খলিলুর রহমান জানিয়েছেন, এসব উদ্যোগ এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে তিনি সক্রিয় ভূমিকা রাখবেন। একই সঙ্গে জাতিসংঘের কার্যক্রমে শুধু রাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের নয়, নাগরিক সমাজ, ব্যবসায়ী গোষ্ঠী, শিক্ষাবিদ ও অন্যান্য অংশীজনের অংশগ্রহণ বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেছেন তিনি।

বিশ্ব রাজনীতির বর্তমান বাস্তবতায় জাতিসংঘের কার্যকারিতা নিয়ে নানা প্রশ্ন রয়েছে। বিভিন্ন সংঘাতের ক্ষেত্রে সদস্যরাষ্ট্রগুলোর ভিন্ন অবস্থান, নিরাপত্তা পরিষদের সীমাবদ্ধতা, অর্থসংকট এবং বহুপক্ষীয় ব্যবস্থার প্রতি আস্থার ঘাটতি আন্তর্জাতিক সংস্থাটির সামনে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। এমন পরিস্থিতিতে সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে খলিলুর রহমানের বক্তব্যে সমঝোতা ও বাস্তবভিত্তিক কূটনীতির ওপর গুরুত্ব পাওয়াকে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এদিকে তাঁর দায়িত্ব গ্রহণ বাংলাদেশের কূটনীতির জন্যও বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। গত ২ জুন অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ১৯০টি ভোটের মধ্যে ৯৯ ভোট পেয়ে সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হন খলিলুর রহমান। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী সাইপ্রাসের প্রার্থী আন্দ্রেয়াস এস কাকোরিস পেয়েছিলেন ৯১ ভোট। এ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের জন্য নির্ধারিত সভাপতির পদটি বাংলাদেশ পায়। জাতিসংঘের প্রচলিত আঞ্চলিক ঘূর্ণন ব্যবস্থার আওতায় ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচনের সুযোগ ছিল এ অঞ্চলের।

নির্বাচনের পর থেকেই খলিলুর রহমান তাঁর দায়িত্বের অগ্রাধিকার নিয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে কথা বলে আসছেন। বহুপক্ষীয় ব্যবস্থাকে কার্যকর করা, উন্নয়নশীল দেশগুলোর স্বার্থ তুলে ধরা, জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর উদ্বেগকে গুরুত্ব দেওয়া, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নে গতি আনা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদারের বিষয়গুলো তাঁর দৃষ্টিভঙ্গির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

তাঁর দায়িত্বের সময়কাল আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে মিলে যাচ্ছে। ২০২৬ সালের শেষ দিকে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের বর্তমান মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। ফলে তাঁর সভাপতিত্বের এক বছরের সময় আন্তর্জাতিক সংস্থাটির নেতৃত্ব, সংস্কার এবং ভবিষ্যৎ ভূমিকা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা সামনে আসতে পারে। এ সময় সাধারণ পরিষদে বিভিন্ন দেশের অবস্থান সমন্বয় করাও সভাপতির জন্য একটি বড় কূটনৈতিক দায়িত্ব হয়ে উঠবে।

রোহিঙ্গা সংকট নিয়েও খলিলুর রহমানের অভিজ্ঞতা রয়েছে। বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের বিষয়ে জাতিসংঘের প্ল্যাটফর্মে তাদের প্রতিনিধিত্বের প্রশ্ন উঠলে তিনি তাঁর পূর্ব অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন। এর আগে বাংলাদেশের সরকারপ্রধানের রোহিঙ্গাবিষয়ক হাই রিপ্রেজেন্টেটিভ হিসেবে কাজ করার সময় তিনি বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের পরিস্থিতি সরাসরি দেখেছেন। তাদের দুর্ভোগ, নিরাপত্তাহীনতা এবং নিজ ভূমিতে ফিরে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা সম্পর্কে তিনি প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন।

রোহিঙ্গাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ভূমিকা বাংলাদেশের জন্য দীর্ঘদিনের গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক ইস্যু। মিয়ানমারের রাখাইনে নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরি এবং রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করা নিয়ে বাংলাদেশ নিয়মিত আন্তর্জাতিক সহযোগিতা চেয়ে আসছে। সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্বে থাকা অবস্থায় খলিলুর রহমান এই সংকট নিয়ে কী ধরনের কূটনৈতিক উদ্যোগ নেন, সেদিকেও বাংলাদেশের মানুষের আগ্রহ থাকবে।

চার দশক পর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতির আসনে আরেক বাংলাদেশির বসা দেশের জন্য নিঃসন্দেহে একটি উল্লেখযোগ্য কূটনৈতিক অর্জন। তবে এই দায়িত্ব শুধু মর্যাদার নয়, একই সঙ্গে কঠিন রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জেরও। কারণ, বর্তমান বিশ্বে একদিকে সংঘাত ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা বাড়ছে, অন্যদিকে জলবায়ু পরিবর্তন, খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ সৃষ্টি করছে।

এই বাস্তবতায় খলিলুর রহমানের বক্তব্যে যে বিষয়টি সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, তা হলো প্রত্যাশা ও বাস্তবতার মধ্যে ভারসাম্য রেখে কাজ করার অঙ্গীকার। বিশ্বের সব সংকট এক বছরে সমাধান হবে—এমন প্রতিশ্রুতি না দিয়ে তিনি বরং সংলাপের পথ খোলা রাখা এবং যেখানে সম্ভব সেখানে সমঝোতা তৈরির ওপর জোর দিয়েছেন। আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে অনেক সময় বড় অগ্রগতি আসে দীর্ঘ আলোচনার পর ছোট ছোট সমঝোতার মাধ্যমে। সেই জায়গায় আস্থা ও সহযোগিতার পরিবেশ তৈরি করাই তাঁর সভাপতিত্বের অন্যতম বড় পরীক্ষা হতে পারে।

খলিলুর রহমানের ভাষায়, কিছু সমস্যার সমাধান পেতে সময় লাগবে। কিন্তু সে কারণে চেষ্টা থেমে থাকতে পারে না। তাঁর এক বছরের দায়িত্বকালে জাতিসংঘের ১৯৩ সদস্যরাষ্ট্রের মধ্যে মতপার্থক্য কতটা কমানো যায়, আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ক্ষেত্র কতটা বিস্তৃত করা যায় এবং বহুপক্ষীয় ব্যবস্থার প্রতি আস্থা কতটা পুনর্গঠন করা যায়—তা এখন সময়ই বলে দেবে। তবে দায়িত্বের শুরুতেই যে বার্তা তিনি দিয়েছেন, তাতে সংঘাতের পরিবর্তে সংলাপ এবং বিভেদের পরিবর্তে সহযোগিতাকেই অগ্রাধিকার দেওয়ার একটি স্পষ্ট অবস্থান ফুটে উঠেছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত