দুর্গাপূজায় পদ্মার ইলিশ চেয়ে বাংলাদেশের কাছে ভারতের চিঠি

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ২০ বার
দুর্গাপূজায় পদ্মার ইলিশ চেয়ে বাংলাদেশের কাছে ভারতের চিঠি

প্রকাশ: ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দুর্গাপূজাকে সামনে রেখে বাংলাদেশ থেকে আবারও ইলিশ আমদানির আগ্রহ প্রকাশ করেছে ভারতের ব্যবসায়ী ও আমদানিকারকরা। পূজার সময় পশ্চিমবঙ্গসহ ভারতের কয়েকটি রাজ্যে বাংলাদেশের ইলিশের ব্যাপক চাহিদাকে সামনে রেখে সীমিত পরিমাণে হলেও পদ্মার ইলিশ রপ্তানির অনুমতি চেয়ে বাংলাদেশ সরকারের কাছে আবেদন জানিয়েছে ভারতের ফিশ ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন।

ভারতীয় ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে পৃথক চিঠি পাঠানো হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। চিঠিতে পূজার বাজারে বাংলাদেশের ইলিশ সরবরাহের পাশাপাশি রপ্তানির ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সময়সীমা ও নানা সীমাবদ্ধতা শিথিল করার অনুরোধ জানানো হয়েছে। তাদের প্রত্যাশা, এ বছর আগের তুলনায় বেশি পরিমাণ ইলিশ ভারতে পাঠানোর সুযোগ দেওয়া হবে।

দুই বাংলার মানুষের ভাষা, সংস্কৃতি ও খাদ্যাভ্যাসের মধ্যে দীর্ঘদিনের যে ঘনিষ্ঠতা রয়েছে, ইলিশ তার অন্যতম পরিচিত প্রতীক। বিশেষ করে দুর্গাপূজার সময় পশ্চিমবঙ্গের বাজারে বাংলাদেশের ইলিশ নিয়ে আলাদা আগ্রহ তৈরি হয়। ফলে পূজার আগে বাংলাদেশের ইলিশের সরবরাহ নিয়ে ভারতীয় ব্যবসায়ীদের তৎপরতা নতুন নয়। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশে ইলিশের উৎপাদন, অভ্যন্তরীণ চাহিদা এবং রপ্তানি নীতি নিয়ে নানা বিবেচনার কারণে ভারতে ইলিশ পাঠানোর বিষয়টি সীমিত পর্যায়ে রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে জানা গেছে, এবার শুধু চিঠি পাঠিয়েই থেমে থাকেননি ভারতীয় আমদানিকারকরা। সংগঠনটির প্রতিনিধিরা বাংলাদেশ সফর করে বাণিজ্য সচিবের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। একই সঙ্গে কলকাতায় বাংলাদেশের ডেপুটি হাইকমিশনের কর্মকর্তাদের সঙ্গেও তারা বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছেন। বৈঠকে পূজার আগে ইলিশ রপ্তানির অনুমোদন দেওয়ার পাশাপাশি অনুমোদিত মাছ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ভারতে পাঠানোর সুযোগ বাড়ানোর বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে।

ভারতীয় ব্যবসায়ীদের যুক্তি, দুর্গাপূজার সঙ্গে বাংলাদেশের ইলিশের একটি আবেগ ও ঐতিহ্যগত সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ ছাড়াও আসাম, ত্রিপুরাসহ ভারতের পার্শ্ববর্তী কয়েকটি অঞ্চলে বাংলাদেশের ইলিশের ক্রেতা রয়েছে। পূজার মৌসুমে এই চাহিদা আরও বেড়ে যায়। এ কারণে প্রতিবছরই তারা বাংলাদেশ সরকারের কাছে ইলিশ রপ্তানির সুযোগ দেওয়ার আবেদন করে আসছেন।

বাংলাদেশের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ও বিষয়টি একেবারে নাকচ করছে না। বরং পূজা উপলক্ষে ইলিশ রপ্তানির সম্ভাবনাকে ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। তবে এ বছর কী পরিমাণ ইলিশ রপ্তানির অনুমতি দেওয়া হবে, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। রপ্তানির পরিমাণ নির্ধারণের আগে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করা হবে। দেশের বাজারে ইলিশের সরবরাহ, উৎপাদন পরিস্থিতি এবং ভোক্তাদের চাহিদার বিষয়গুলোও বিবেচনায় নেওয়া হতে পারে।

ভারতীয় ব্যবসায়ীদের চিঠিতে বাংলাদেশের ইলিশ রপ্তানির অতীত চিত্রও তুলে ধরা হয়েছে। তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৬ সালের পর দীর্ঘ সময় ধরে বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর গড়ে প্রায় পাঁচ হাজার টন ইলিশ ভারতে রপ্তানি করা হতো। পরে ২০১২ সালের পর সেই রপ্তানি বন্ধ হয়ে যায়। এরপর কয়েক বছর বিরতির পর ২০১৯ সালে দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে সীমিত পরিসরে আবার ইলিশ রপ্তানির অনুমতি দেওয়া হয়।

২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে দীর্ঘ বিরতির পর ৫০০ টন ইলিশ ভারতে পাঠানোর অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। পরের বছর অনুমোদনের পরিমাণ বাড়িয়ে এক হাজার ৮৫০ টন করা হলেও পুরো পরিমাণ রপ্তানি হয়নি। ২০২১ সালে চার হাজার ৬০০ টন রপ্তানির অনুমোদনের বিপরীতে ভারতে যায় প্রায় এক হাজার ২০০ টন। ২০২২ সালে দুই হাজার ৯০০ টন অনুমোদন দেওয়া হলেও বাস্তবে রপ্তানি হয় প্রায় এক হাজার ৩০০ টন।

পরবর্তী বছরগুলোতেও অনুমোদন ও বাস্তব রপ্তানির মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য দেখা গেছে। ২০২৩ সালে তিন হাজার ৯৫০ টন ইলিশ রপ্তানির অনুমোদন থাকলেও ভারতে পাঠানো হয় প্রায় এক হাজার ৩০০ টন। ২০২৫ সালে দুই হাজার ৪২০ টন রপ্তানির অনুমতি দেওয়া হলেও রপ্তানি হয়েছে মাত্র ৫৭৭ টন। সর্বশেষ পর্যায়ে এক হাজার ২০০ টন রপ্তানির অনুমোদনের বিপরীতে ভারতে গেছে প্রায় ১৫০ টন ইলিশ।

ভারতীয় আমদানিকারকদের দাবি, অনুমোদিত পরিমাণের পুরোটা তারা অনেক সময় নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আমদানি করতে পারেন না। বিশেষ করে রপ্তানির অনুমোদন পেতে দেরি হলে এবং মাত্র এক মাসের সময়সীমা নির্ধারণ করে দেওয়া হলে সরবরাহ প্রক্রিয়ায় নানা জটিলতা তৈরি হয়। ফলে কাগজে অনুমোদিত পরিমাণ বড় হলেও বাস্তবে তার তুলনায় অনেক কম ইলিশ ভারতে পৌঁছায়।

এই পরিস্থিতিতে এবার অনুমোদনের সময় এগিয়ে আনার পাশাপাশি রপ্তানির সময়সীমা আরও নমনীয় করার অনুরোধ জানিয়েছে ভারতীয় সংগঠনটি। তাদের বক্তব্য, নির্দিষ্ট একটি মাসের মধ্যে পুরো রপ্তানি সম্পন্ন করার বাধ্যবাধকতা থাকলে অনুমোদিত ইলিশের সবটুকু ভারতে নেওয়া সম্ভব হয় না। সময়সীমা কিছুটা বাড়ানো হলে অনুমোদিত পরিমাণের আরও বেশি অংশ বাজারে পৌঁছানো সম্ভব হবে বলে তারা মনে করছে।

তবে শুধু রপ্তানির পরিমাণ বাড়ানো নয়, কারা ইলিশ রপ্তানির সুযোগ পাবেন, সেটিও ভারতীয় ব্যবসায়ীদের আবেদনে গুরুত্ব পেয়েছে। তাদের অভিযোগ, অতীতে কখনো কখনো প্রকৃত ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত নন এমন ব্যক্তিরাও ইলিশ রপ্তানির অনুমতি পেয়েছেন। এর ফলে অনুমোদিত পরিমাণের মাছ শেষ পর্যন্ত ভারতে পাঠানো সম্ভব হয়নি। এবার অভিজ্ঞ ও প্রকৃত রপ্তানিকারকদের অগ্রাধিকার দেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।

পশ্চিমবঙ্গের ইলিশ আমদানিকারকদের পক্ষ থেকেও এ বিষয়ে আশাবাদ প্রকাশ করা হয়েছে। সংগঠনটির একজন প্রতিনিধি জানিয়েছেন, তারা আশা করছেন এবার তুলনামূলক বেশি পরিমাণ ইলিশ আমদানির সুযোগ পাওয়া যাবে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা ও বৈঠক হয়েছে বলেও তিনি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে ইলিশ রপ্তানির ক্ষেত্রে এক মাসের সময়সীমা তুলে দেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।

তবে বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি কেবল প্রতিবেশী দেশের চাহিদা পূরণের প্রশ্ন নয়। দেশের মানুষের খাদ্যচাহিদা, বাজারদর, জেলেদের স্বার্থ, ইলিশের প্রজনন ও সংরক্ষণ এবং সামগ্রিক মৎস্যসম্পদ ব্যবস্থাপনার বিষয়ও এর সঙ্গে যুক্ত। ফলে রপ্তানির সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে এসব বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হবে বলেই সংশ্লিষ্ট মহলের ধারণা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ইলিশ বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় মৎস্যসম্পদ। দেশীয় বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক রেখে সীমিত রপ্তানি করা গেলে একদিকে বৈদেশিক বাণিজ্য থেকে আয় বাড়তে পারে, অন্যদিকে প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে দীর্ঘদিনের খাদ্য ও সাংস্কৃতিক সম্পর্কও বজায় থাকে। কিন্তু রপ্তানির পরিমাণ নির্ধারণে ভারসাম্য না থাকলে দেশের বাজারে দাম বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে। তাই উৎপাদন ও অভ্যন্তরীণ চাহিদার বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।

দুর্গাপূজা ঘিরে ভারতের বাজারে বাংলাদেশের ইলিশের চাহিদা প্রতিবছরই আলোচনায় আসে। এবারও সেই ধারাবাহিকতায় ভারতীয় ব্যবসায়ীরা আগেভাগেই অনুমতির জন্য আবেদন করেছেন। এখন বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর পর্যালোচনা এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে, আসন্ন পূজায় ভারতের বাজারে কতটা পদ্মার ইলিশ পৌঁছাবে। দেশের বাজার ও উৎপাদকদের স্বার্থ সুরক্ষার পাশাপাশি প্রতিবেশী দেশের চাহিদা—দুই দিক বিবেচনা করেই এবার সিদ্ধান্ত নেওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে সংশ্লিষ্টরা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত