প্রকাশ: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ফ্লাশিং মিডোজে যুক্তরাষ্ট্রের টেনিসপ্রেমীদের অপেক্ষার যেন শেষ হতে চলেছে। ২০০৩ সালে অ্যান্ডি রডিকের হাতে ইউএস ওপেনের পুরুষ এককের শিরোপা ওঠার পর দীর্ঘ ২৩ বছর ধরে কোনো মার্কিন পুরুষ খেলোয়াড়কে এই আসরের চ্যাম্পিয়ন হতে দেখেনি দেশটি। সেই দীর্ঘ অপেক্ষার অবসানের সম্ভাবনা এবার তৈরি করেছেন বেন শেলটন। তবে তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে আছেন জার্মানির তারকা আলেক্সান্দার জভেরেভ—যিনি নিজেও শিরোপার দাবিদার এবং আমেরিকান স্বপ্ন থামিয়ে দেওয়ার প্রত্যয় নিয়েই ফাইনালে নামবেন।
ইউএস ওপেনের পুরুষ এককের ফাইনালে রোববার মুখোমুখি হবেন শেলটন ও জভেরেভ। একদিকে ঘরের মাটিতে প্রথম গ্র্যান্ড স্লাম শিরোপা জয়ের স্বপ্নে বিভোর ২৩ বছর বয়সী মার্কিন তারকা, অন্যদিকে বহুদিনের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে ক্যারিয়ারের আরেকটি বড় শিরোপা জয়ের লক্ষ্যে থাকা জার্মান খেলোয়াড়। ফলে ফাইনালটি শুধু একটি শিরোপার লড়াই নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দুই খেলোয়াড়ের ব্যক্তিগত ইতিহাস, প্রত্যাশা ও আবেগও।
জভেরেভ ফাইনালে উঠে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করে দিয়েছেন। শেলটনের বিপক্ষে ‘অল-আমেরিকান’ সেমিফাইনাল দেখার পরই জার্মান তারকা বলেন, তিনি আশা করছেন রোববার আমেরিকান স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ নিতে দেবেন না। তাঁর এই বক্তব্যই ফাইনালের লড়াইয়ে বাড়তি উত্তাপ যোগ করেছে।
জভেরেভের জন্য ইউএস ওপেনের সঙ্গে পুরোনো একটি ক্ষতও জড়িয়ে আছে। ছয় বছর আগে এই টুর্নামেন্টের ফাইনালে ডমিনিক থিয়েমের কাছে হেরে অল্পের জন্য গ্র্যান্ড স্লাম শিরোপা হাতছাড়া করেছিলেন তিনি। সেই হতাশা এখনো পুরোপুরি মুছে যায়নি। এবার তাই একই মঞ্চে ফিরে এসে শিরোপা জয়ের সুযোগকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছেন জার্মান তারকা।
সেমিফাইনালে রাশিয়ার অবাছাই খেলোয়াড় কারেন খাচানভকে সরাসরি তিন সেটে হারিয়ে ফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করেন জভেরেভ। ৬-৩, ৭-৬ (৯-৭), ৭-৬ (৯-৬) গেমের জয় তাঁকে টানা তৃতীয় গ্র্যান্ড স্লামের ফাইনালে নিয়ে গেছে। একই সঙ্গে বছরের দ্বিতীয় গ্র্যান্ড স্লাম শিরোপা জয়ের সুযোগও তৈরি হয়েছে তাঁর সামনে। অভিজ্ঞতা, বড় ম্যাচ খেলার সামর্থ্য এবং শক্তিশালী বেসলাইন গেম—সব মিলিয়ে ফাইনালে শেলটনের জন্য কঠিন পরীক্ষাই অপেক্ষা করছে।
অন্যদিকে শেলটনের ফাইনালে ওঠার পথটিও ছিল নাটকীয় এবং ঐতিহাসিক। সেমিফাইনালে তাঁর প্রতিপক্ষ ছিলেন স্বদেশি ও ঘনিষ্ঠ বন্ধু ফ্রান্সিস তিয়াফো। বয়সে পাঁচ বছরের বড় তিয়াফোকে শেলটন অনেক সময় ‘বড় ভাই’ বলে সম্বোধন করেন। কোর্টের বাইরে দুজনের বন্ধুত্ব থাকলেও গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে সেই সম্পর্কের কোনো প্রভাব পড়েনি। বরং লড়াইয়ের উত্তেজনা একপর্যায়ে তীব্র হয়ে ওঠে এবং আম্পায়ারের সঙ্গে শেলটনের কথাকাটাকাটিও নজরে আসে।
শেষ পর্যন্ত অভিজ্ঞ তিয়াফোকে ৪-৬, ৬-৩, ৬-৩, ৭-৫ গেমে হারিয়ে ক্যারিয়ারের প্রথম গ্র্যান্ড স্লাম ফাইনালে ওঠেন শেলটন। প্রায় তিন ঘণ্টা ১৭ মিনিটের লড়াই শেষে জয় নিশ্চিত হওয়ার পর তাঁর উদ্যাপনে ফুটে ওঠে দীর্ঘদিনের স্বপ্নপূরণের আবেগ।
শেলটনের এই ফাইনালে ওঠা শুধু তাঁর ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, মার্কিন টেনিসের ইতিহাসেও তা বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। ১৯৭২ সালের পর এই প্রথম ইউএস ওপেনের পুরুষ এককে কোনো দুই কৃষ্ণাঙ্গ মার্কিন খেলোয়াড় সেমিফাইনালে মুখোমুখি হন। সেই ম্যাচের ফল যাই হোক, একটি বিষয় আগে থেকেই নিশ্চিত ছিল—অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় পর কোনো কৃষ্ণাঙ্গ মার্কিন পুরুষ খেলোয়াড় ইউএস ওপেনের ফাইনালে উঠবেন।
১৯৭২ সালে কিংবদন্তি আর্থার অ্যাশ এই কৃতিত্ব অর্জন করেছিলেন। তবে সেবারের ফাইনালে রোমানিয়ার ইলি নাস্তাসের কাছে পাঁচ সেটের লড়াইয়ে হারতে হয়েছিল তাঁকে। এর আগে অবশ্য ১৯৬৮ সালে ইউএস ওপেন জিতে ইতিহাসের প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ পুরুষ খেলোয়াড় হিসেবে গ্র্যান্ড স্লাম শিরোপা জয়ের নজির গড়েছিলেন অ্যাশ। পরে ১৯৮৩ সালে ফ্রেঞ্চ ওপেন জিতে সেই ধারায় যুক্ত হন ফ্রান্সের ইয়ানিক নোয়া।
শেলটনের সামনে তাই এখন ইতিহাসের আরেকটি দরজা খুলে গেছে। জভেরেভকে হারাতে পারলে ইতিহাসের তৃতীয় কৃষ্ণাঙ্গ পুরুষ খেলোয়াড় হিসেবে গ্র্যান্ড স্লাম জয়ের কৃতিত্ব অর্জন করবেন তিনি। আর সবচেয়ে প্রতীকী বিষয় হলো, সেই ইতিহাস লেখা হতে পারে আর্থার অ্যাশ স্টেডিয়ামেই—যে স্টেডিয়ামের নামটি যুক্তরাষ্ট্রের টেনিস ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে।
তবে শেলটনের জন্য সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা সম্ভবত নিজের দেশের দীর্ঘ অপেক্ষা। অ্যান্ডি রডিক ২০০৩ সালে ইউএস ওপেন জেতার সময় শেলটন ছিলেন মাত্র ১১ মাসের শিশু। সেই সময় থেকে শুরু হয়েছে মার্কিন পুরুষ টেনিসে দীর্ঘ অপেক্ষা। এরপর এই টুর্নামেন্টে একাধিক প্রতিভাবান খেলোয়াড় উঠে এলেও শিরোপা আর ঘরের ছেলের হাতে ওঠেনি।
এই সময়ে মাত্র ছয়জন মার্কিন পুরুষ খেলোয়াড় গ্র্যান্ড স্লামের ফাইনালে উঠতে পেরেছেন। সর্বশেষ উদাহরণ টেলর ফ্রিটজ, যিনি দুই বছর আগে নিউইয়র্কে ইউএস ওপেনের ফাইনালে খেলেছিলেন। কিন্তু শিরোপা জয়ের স্বপ্ন পূরণ হয়নি তাঁর। এবার সেই অপূর্ণতা পূরণের দায়িত্ব যেন নতুন প্রজন্মের হাতে তুলে দিয়েছেন শেলটন।
সেমিফাইনালে জয়ের পর নিজের বন্ধুত্ব ও প্রতিপক্ষ তিয়াফোর প্রসঙ্গেও আবেগঘন কথা বলেছেন শেলটন। তাঁর ভাষায়, তিয়াফো বড় ভাইয়ের মতো এবং একই কোর্টে তাঁর সঙ্গে খেলার প্রতিটি সুযোগই বিশেষ। কিন্তু সেই বিশেষ মুহূর্তকে আরও ঐতিহাসিক করে তুলেছে ম্যাচটির ফল এবং দুই খেলোয়াড়ের লড়াইয়ের গুরুত্ব।
ফাইনালে অবশ্য আবেগের জায়গা খুব কম। সেখানে থাকবে কৌশল, ধৈর্য, সার্ভিসের গতি, রিটার্ন এবং চাপ সামলে রাখার ক্ষমতার পরীক্ষা। শেলটনের সবচেয়ে বড় অস্ত্র তাঁর গতিময় সার্ভিস ও আক্রমণাত্মক খেলা। অন্যদিকে জভেরেভ বড় ম্যাচে নিজের ছন্দ ধরে রাখার পাশাপাশি শক্তিশালী গ্রাউন্ডস্ট্রোক ও অভিজ্ঞতা দিয়ে প্রতিপক্ষকে চাপে ফেলতে পারেন।
কার হাতে উঠবে ইউএস ওপেনের শিরোপা, সেই উত্তর মিলবে ফাইনালের পর। তবে তার আগেই নিশ্চিত হয়ে গেছে, এবারের ফাইনাল মার্কিন টেনিসের জন্য একটি বিশেষ মুহূর্ত তৈরি করেছে। একদিকে ২৩ বছরের অপেক্ষা শেষ করার স্বপ্ন, অন্যদিকে ক্যারিয়ারের আরেকটি বড় শিরোপা জয়ের তীব্র আকাঙ্ক্ষা।
বেন শেলটনের সামনে তাই শুধু আলেক্সান্দার জভেরেভ নন; সামনে রয়েছে দীর্ঘদিনের অপেক্ষা, ইতিহাস এবং নিজের দেশের টেনিসপ্রেমীদের প্রত্যাশা। আর জভেরেভের সামনে রয়েছে সেই স্বপ্ন থামিয়ে দেওয়ার কঠিন দায়িত্ব। নিউইয়র্কের আর্থার অ্যাশ স্টেডিয়ামে রোববারের ফাইনাল তাই কেবল দুই খেলোয়াড়ের লড়াই নয়, হয়ে উঠতে পারে একটি প্রজন্মের স্বপ্ন পূরণের মুহূর্তও।