প্রকাশ: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মিসরের গিজায় হাজার বছরের ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা মহা পিরামিড নিয়ে মানুষের কৌতূহলের শেষ নেই। প্রায় সাড়ে চার হাজার বছর ধরে টিকে থাকা এই বিশাল স্থাপত্যের নির্মাণপ্রক্রিয়া, নকশা, পরিমাপ এবং উদ্দেশ্য নিয়ে নানা সময়ে বিভিন্ন তত্ত্ব সামনে এসেছে। এবার নতুন এক গবেষণায় দাবি করা হয়েছে, পিরামিডের কিছু পরিমাপের মধ্যে চাঁদ, নক্ষত্র ও গ্রহের গতিপথের সঙ্গে সম্পর্কিত সংখ্যাগত মিল থাকতে পারে।
গবেষক সেফি লেভির উপস্থাপিত এই তত্ত্বে বলা হয়েছে, প্রাচীন মিসরীয়দের ব্যবহৃত ভগ্নাংশের পদ্ধতিতে গিজার মহা পিরামিডের বিভিন্ন পরিমাপ বিশ্লেষণ করলে এমন কিছু সংখ্যা পাওয়া যায়, যেগুলোর সঙ্গে মহাজাগতিক বিভিন্ন চক্রের মিল লক্ষ্য করা যায়। গবেষকের মতে, এসব মিল নিছক কাকতালীয় না-ও হতে পারে; বরং পিরামিডের নকশা ও নির্মাণের সময় মহাজাগতিক পর্যবেক্ষণ থেকে পাওয়া জ্ঞান কোনোভাবে কাজে লাগানো হয়ে থাকতে পারে।
তবে এই দাবি এখনো বৈজ্ঞানিকভাবে চূড়ান্তভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। গবেষণাটি স্বাধীন বিশেষজ্ঞদের পিয়ার-রিভিউ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যায়নি। ফলে পিরামিডে ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো মহাজাগতিক সংকেত বা কোড রাখা হয়েছিল—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে আরও গবেষণা ও প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ প্রয়োজন।
লেভির বিশ্লেষণের অন্যতম আলোচিত বিষয় হলো ২৭ দশমিক ৫ সংখ্যাটি। তাঁর হিসাব থেকে পাওয়া এই সংখ্যার সঙ্গে তিনি চাঁদের পৃথিবীর সবচেয়ে কাছাকাছি অবস্থানের চক্রের সময়কাল মিলিয়ে দেখেছেন। চাঁদের এই চক্রের সময়কাল আনুমানিক ২৭ দশমিক ৫৫ দিন। সংখ্যাগত এই সাদৃশ্যকে গবেষক পিরামিডের পরিমাপ ও চন্দ্রচক্রের মধ্যে সম্ভাব্য সম্পর্কের একটি ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন।
এর পাশাপাশি ৭০ সংখ্যাটিকেও গবেষণায় বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। লেভির ব্যাখ্যায়, এই সংখ্যার সঙ্গে সিরিয়াস নক্ষত্রের নির্দিষ্ট সময়ের জন্য অদৃশ্য থাকার আনুমানিক ৭০ দিনের সময়কালের মিল রয়েছে। প্রাচীন মিসরীয় সভ্যতায় সিরিয়াস নক্ষত্রের বিশেষ গুরুত্ব ছিল বলে ইতিহাসবিদ ও প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণায় আগে থেকেই জানা যায়। নীলনদের বার্ষিক বন্যা ও কৃষি মৌসুমের সঙ্গে নক্ষত্রটির উদয়-অস্ত পর্যবেক্ষণের সম্পর্ক নিয়েও প্রাচীন মিসরীয়দের মধ্যে জ্ঞান ছিল বলে ধারণা করা হয়।
নতুন তত্ত্বে শুধু চাঁদ বা সিরিয়াস নক্ষত্র নয়, বৃহস্পতি, শনি, শুক্র ও মঙ্গলের গতিবিধির সঙ্গেও পিরামিডের কিছু পরিমাপের সম্ভাব্য মিল তুলে ধরা হয়েছে। একই সঙ্গে পিরামিডের নকশায় পাই বা π এবং গোল্ডেন রেশিও বা সোনালি অনুপাতের উপস্থিতিরও ইঙ্গিত রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
তবে এমন সংখ্যাগত মিল পাওয়া গেলেই যে প্রাচীন নির্মাতারা সেগুলো পরিকল্পিতভাবে স্থাপত্যে অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন, তা প্রমাণিত হয় না। কোনো নির্দিষ্ট কাঠামোর বহু পরিমাপ বিশ্লেষণ করলে বিভিন্ন পরিচিত গাণিতিক ধ্রুবক বা জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক সংখ্যার সঙ্গে কিছুটা মিল পাওয়া সম্ভব। তাই কোনো মিল ইচ্ছাকৃত নকশার ফল, নাকি পরবর্তী সময়ের বিশ্লেষণ থেকে তৈরি হওয়া কাকতালীয় সম্পর্ক—এটি নির্ধারণ করাই এ ধরনের গবেষণার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গবেষণায় কম্পিউটারভিত্তিক মডেল ব্যবহারের কথাও বলা হয়েছে। প্রায় এক লাখ কম্পিউটার-নির্মিত পিরামিড মডেল তৈরি করে দেখা হয়, ভিন্ন ভিন্ন পরিমাপ ও কাঠামোর মধ্যে একই ধরনের সংখ্যাগত মিল কতটা স্বাভাবিকভাবে দেখা দিতে পারে। গবেষকের দাবি, মাত্র ২ দশমিক ৪ শতাংশ মডেলে এ ধরনের মিল পাওয়া সম্ভব হয়েছে।
এই ফলাফলকে লেভি তাঁর তত্ত্বের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন। তাঁর মতে, এত বিপুল সংখ্যক সম্ভাব্য মডেলের মধ্যে তুলনামূলকভাবে অল্পসংখ্যক মডেলে একই ধরনের মিল পাওয়া গেলে পিরামিডের পরিমাপের পেছনে কোনো পরিকল্পিত গাণিতিক ধারণা কাজ করে থাকতে পারে। তবে এই পরিসংখ্যানই যে প্রাচীন মিসরীয়রা মহাজাগতিক সংকেতকে পিরামিডে ইচ্ছাকৃতভাবে অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন—এমন সরাসরি প্রমাণ দেয় না, সেটিও বিবেচনায় রাখা জরুরি।
গিজার মহা পিরামিড ফারাও খুফুর শাসনামলে নির্মিত বলে ঐতিহাসিকভাবে স্বীকৃত। এটি প্রাচীন মিসরের সবচেয়ে বিস্ময়কর স্থাপত্যগুলোর একটি এবং প্রাচীন বিশ্বের সাত আশ্চর্যের মধ্যে একমাত্র এখনো টিকে থাকা স্থাপনা। বিশাল আকার, নিখুঁত জ্যামিতিক বিন্যাস এবং নির্মাণপ্রযুক্তির কারণে কয়েক হাজার বছর ধরে এটি গবেষকদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।
পিরামিডের উদ্দেশ্য নিয়েও ইতিহাসে বিভিন্ন ব্যাখ্যা রয়েছে। প্রচলিত প্রত্নতাত্ত্বিক ধারণা অনুযায়ী, এটি ছিল ফারাও খুফুর সমাধিসৌধ। কিন্তু নতুন গবেষণায় লেভি এটিকে প্রাচীন জ্ঞানের এক ধরনের স্থায়ী দলিল কিংবা মিসরীয় পৌরাণিক ধারণার ‘বেনবেন’ ঢিবির প্রতীক হিসেবে ব্যাখ্যা করার সম্ভাবনাও তুলে ধরেছেন।
প্রাচীন মিসরীয় সভ্যতায় আকাশ পর্যবেক্ষণের গুরুত্ব ছিল ব্যাপক। সূর্য, চাঁদ ও নক্ষত্রের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে তারা ক্যালেন্ডার, কৃষিকাজ এবং ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের সময় নির্ধারণ করত। ফলে পিরামিড নির্মাণে জ্যোতির্বিজ্ঞানের কোনো প্রভাব ছিল কি না, তা নিয়ে গবেষণার আগ্রহ নতুন নয়। তবে কোনো নির্দিষ্ট মহাজাগতিক কোড স্থাপত্যের পরিমাপের মধ্যে ইচ্ছাকৃতভাবে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল—এমন দাবি প্রমাণের জন্য আরও শক্তিশালী প্রত্নতাত্ত্বিক ভিত্তি প্রয়োজন।
মূলধারার মিশরবিদ ও প্রত্নতাত্ত্বিকদের অবস্থানও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। তাঁদের মতে, পিরামিডে এমন মহাজাগতিক কোড ইচ্ছাকৃতভাবে বসানোর প্রত্যক্ষ প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি। কোনো স্থাপত্যের পরিমাপের সঙ্গে আধুনিকভাবে পরিচিত গাণিতিক ধ্রুবক বা জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক চক্রের মিল পাওয়া গেলেই তা নির্মাতাদের উদ্দেশ্য প্রমাণ করে না।
এ কারণেই নতুন তত্ত্বটি নিয়ে আগ্রহ যেমন তৈরি হয়েছে, তেমনি সতর্কতার প্রয়োজনও রয়েছে। গবেষণাটি পিয়ার-রিভিউ সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত এর পদ্ধতি, পরিসংখ্যানগত বিশ্লেষণ এবং সিদ্ধান্ত স্বাধীন বিশেষজ্ঞরা কতটা গ্রহণযোগ্য মনে করেন, সেটিই হবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন, প্রাচীন মিসরীয় লিখিত দলিল কিংবা নির্মাণসংক্রান্ত কোনো নতুন প্রমাণ পাওয়া গেলে এই বিতর্ক আরও স্পষ্ট হতে পারে।
গিজার মহা পিরামিডকে ঘিরে মানুষের fascination বা রহস্যমুগ্ধতা মূলত এখানেই—হাজার বছরের ব্যবধানেও এর নির্মাণজ্ঞান ও উদ্দেশ্য নিয়ে নতুন প্রশ্ন উঠছে। নতুন এই তত্ত্ব সত্য প্রমাণিত হোক বা শেষ পর্যন্ত কাকতালীয় সংখ্যাগত মিল হিসেবে বিবেচিত হোক, এটি প্রাচীন মিসরীয় সভ্যতার জ্ঞান, গণিত ও আকাশ পর্যবেক্ষণ নিয়ে নতুন করে আলোচনার সুযোগ তৈরি করেছে।
তবে আপাতত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পিরামিডে মহাজাগতিক গাণিতিক সংকেত থাকার দাবি একটি গবেষণাভিত্তিক অনুমান মাত্র। স্বাধীন বৈজ্ঞানিক যাচাই ও প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ ছাড়া এটিকে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। কয়েক হাজার বছরের পুরোনো এই স্থাপত্যের রহস্য উন্মোচনে তাই নতুন তত্ত্বের পাশাপাশি প্রমাণনির্ভর গবেষণাই শেষ কথা বলবে।