সরকারের অভ্যন্তরীণ ঋণ ছাড়াল সাড়ে ১১ লাখ কোটি টাকা

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৫ বার
সরকারের অভ্যন্তরীণ ঋণ ছাড়াল সাড়ে ১১ লাখ কোটি টাকা

প্রকাশ: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশ সরকারের অভ্যন্তরীণ ঋণের পরিমাণ প্রথমবারের মতো সাড়ে ১১ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। সর্বশেষ ২০২৫–২৬ অর্থবছর শেষে সরকারের পুঞ্জীভূত অভ্যন্তরীণ ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ১১ লাখ ৫৩ হাজার ৬৩৫ কোটি টাকা। এক বছরের ব্যবধানে এই ঋণ বেড়েছে প্রায় ১ লাখ ৩২ হাজার কোটি টাকা। সরকারের ব্যয় মেটাতে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ঋণনির্ভরতা বাড়ার পাশাপাশি ঋণের সুদ পরিশোধের চাপও ক্রমেই বড় হয়ে উঠছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সরকারের অভ্যন্তরীণ ঋণসংক্রান্ত প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪–২৫ অর্থবছর শেষে সরকারের পুঞ্জীভূত অভ্যন্তরীণ ঋণের পরিমাণ ছিল প্রায় ১০ লাখ ২২ হাজার কোটি টাকা। এক বছরের মধ্যে তা বেড়ে ১১ লাখ ৫৩ হাজার ৬৩৫ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। অর্থাৎ নতুন অর্থবছরে প্রবেশের সময় সরকারের ওপর অভ্যন্তরীণ ঋণের চাপ আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি।

গত অর্থবছরে সরকার ব্যাংকব্যবস্থা, ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং সঞ্চয়পত্রসহ অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন উৎস থেকে মোট ১ লাখ ৩১ হাজার ৯০৪ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। ওই অর্থবছরে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে সরকারের ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৬ হাজার ৯০৪ কোটি টাকা বেশি ঋণ নিয়েছে সরকার।

অর্থনীতিবিদদের মতে, সরকারের রাজস্ব আয় ও ব্যয়ের মধ্যে ব্যবধান মেটাতে ঋণ একটি স্বাভাবিক অর্থনৈতিক উপায় হলেও ঋণের পরিমাণ ক্রমাগত বাড়তে থাকলে তার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে সতর্ক হওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। বিশেষ করে ঋণের সুদ পরিশোধের জন্য যখন বাজেটের বড় অংশ বরাদ্দ দিতে হয়, তখন উন্নয়ন ও জনকল্যাণমূলক খাতে সরকারের ব্যয়ের সক্ষমতা কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।

এ পরিস্থিতিতে সরকারের ঋণের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ব্যাংকনির্ভরতা। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫–২৬ অর্থবছরে শুধু ব্যাংকব্যবস্থা থেকেই সরকার নিট ১ লাখ ৩১ হাজার ৭১৩ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। আগের অর্থবছরে ব্যাংকব্যবস্থা থেকে সরকারের নিট ঋণের পরিমাণ ছিল ৭৭ হাজার ১০৮ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরে ব্যাংকব্যবস্থা থেকে সরকারের নিট ঋণ বেড়েছে ৫৪ হাজার ৬০৫ কোটি টাকা।

গত অর্থবছরে বাজেটে ব্যাংকব্যবস্থা থেকে সরকারের ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। বাস্তবে সেই লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি ঋণ নিতে হয়েছে। অন্যদিকে ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২১ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু বছর শেষে এ খাত থেকে সরকারের নিট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে মাত্র ১৯২ কোটি টাকা।

এর পেছনে ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর দুর্বল আর্থিক অবস্থাও একটি কারণ হিসেবে উঠে এসেছে। দেশের বেশ কিছু আর্থিক প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ম, দুর্নীতি ও তারল্যসংকটে ভুগছে। অনেক প্রতিষ্ঠান গ্রাহকের আমানত ফেরত দিতে সমস্যায় পড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে এসব প্রতিষ্ঠান থেকে সরকারের বড় অঙ্কের ঋণ নেওয়ার সুযোগ সীমিত হয়ে পড়েছে। ফলে ব্যাংক খাতের ওপর সরকারের নির্ভরতা আরও বেড়েছে।

গত অর্থবছর শেষে সরকারের অভ্যন্তরীণ ঋণের বড় অংশই এসেছে ব্যাংক খাত থেকে। এই খাতে সরকারের পুঞ্জীভূত ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬ লাখ ৭৮ হাজার কোটি টাকা। এক বছরে সরকারের ব্যাংকঋণের স্থিতি বেড়েছে ২৪ শতাংশের বেশি। অন্যদিকে ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক খাতে সরকারের ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪ লাখ ৭৬ হাজার কোটি টাকা।

ব্যাংকব্যবস্থা থেকে সরকার সাধারণত ট্রেজারি বিল ও বন্ডের মাধ্যমে ঋণ সংগ্রহ করে। সরকারের ব্যয় মেটাতে এসব সরকারি সিকিউরিটিজের মাধ্যমে ব্যাংক ও অন্যান্য বিনিয়োগকারীর কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করা হয়। তবে সরকারের ঋণগ্রহণ বাড়তে থাকলে ব্যাংক খাতের অর্থপ্রবাহ এবং বেসরকারি খাতের ঋণপ্রাপ্তির ওপরও এর প্রভাব পড়তে পারে বলে অর্থনীতিবিদেরা মনে করেন।

অভ্যন্তরীণ ঋণের পাশাপাশি সরকারের বিদেশি ঋণের পরিমাণও উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশ ব্যাংকের আরেক প্রতিবেদনের হিসাবে, সর্বশেষ মার্চ শেষে সরকারের বিদেশি ঋণের স্থিতি ছিল ৯১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা প্রায় ৯ হাজার ১০০ কোটি ডলার। প্রতি ডলারের বিনিময়মূল্য ১২৫ টাকা ধরে হিসাব করলে দেশীয় মুদ্রায় এই ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ১১ লাখ ৩৭ হাজার কোটি টাকার বেশি।

তবে ২০২৫–২৬ অর্থবছর শেষে সরকারের বিদেশি ঋণের সর্বশেষ হিসাব এখনো প্রকাশিত হয়নি। ফলে জুন শেষে দেশি ও বিদেশি ঋণ মিলিয়ে সরকারের মোট ঋণের পরিমাণ ঠিক কত হয়েছে, তা এখনই নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না। মার্চ পর্যন্ত বিদেশি ঋণের হিসাব বিবেচনায় নিলে অবশ্য সরকারের দেশি ও বিদেশি ঋণের স্থিতি প্রায় কাছাকাছি পর্যায়ে রয়েছে।

অর্থাৎ দেশের সরকারি ঋণের সামগ্রিক চিত্রে এখন অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক—দুই উৎসই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ঋণের পরিমাণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সুদ পরিশোধের দায়ও বাড়ছে। চলতি ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেটে সরকারের ঋণের সুদ পরিশোধের জন্য ১ লাখ ২৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। অর্থনীতিবিদদের কাছে এটিই বড় উদ্বেগের বিষয়গুলোর একটি।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান মনে করেন, দেশি ও বিদেশি ঋণের বোঝা ক্রমাগত বাড়ায় সরকারের সুদ পরিশোধের চাপও বাড়ছে। তাঁর মতে, ঋণ পরিশোধ সরকারের ব্যয়ের অন্যতম বড় খাতে পরিণত হয়েছে এবং এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে যেখানে পুরোনো ঋণ পরিশোধের জন্য নতুন করে ঋণ নেওয়ার প্রয়োজন দেখা দিচ্ছে। এতে ভবিষ্যতে ঋণঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।

তিনি আরও মনে করেন, বড় কিছু বিদেশি ঋণের গ্রেস পিরিয়ড শেষ হয়ে আসায় ভবিষ্যতে সুদ ও আসল পরিশোধের চাপ আরও বাড়তে পারে। পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকারের ব্যয়ের ক্ষেত্রে অপচয় কমানোর পাশাপাশি রাজস্ব আয় বাড়ানোর ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

অভ্যন্তরীণ ঋণের উৎস হিসেবেও গত কয়েক বছরে পরিবর্তন এসেছে। একসময় সরকার সঞ্চয়পত্র বিক্রির মাধ্যমে বড় অঙ্কের অর্থ সংগ্রহ করত। সাধারণ মানুষের সঞ্চয়ের একটি বড় অংশও সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ হতো। কিন্তু মুনাফার হার ও অন্যান্য শর্তে পরিবর্তনসহ বিভিন্ন কারণে এই খাতে মানুষের আগ্রহ কমেছে। ফলে সঞ্চয়পত্র থেকে সরকারের ঋণ সংগ্রহের সক্ষমতাও আগের তুলনায় কমে এসেছে।

এর বিপরীতে ব্যাংক খাত থেকে সরকারের ঋণগ্রহণ বেড়েছে। সরকারের ব্যয়ের প্রয়োজন মেটাতে ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়া তুলনামূলকভাবে সহজ হলেও এর অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে দীর্ঘমেয়াদে সতর্ক থাকার প্রয়োজন রয়েছে। কারণ ব্যাংকগুলো যখন সরকারি সিকিউরিটিজে বেশি অর্থ বিনিয়োগ করে, তখন বেসরকারি খাতে ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা বা আগ্রহে প্রভাব পড়তে পারে।

সরকারের ঋণ বাড়ার পেছনে রাজস্ব আয় ও ব্যয়ের কাঠামোও গুরুত্বপূর্ণ। রাষ্ট্র পরিচালনা, বেতন-ভাতা, সামাজিক নিরাপত্তা, অবকাঠামো উন্নয়ন, ভর্তুকি এবং বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে বিপুল অর্থ প্রয়োজন হয়। কিন্তু রাজস্ব আদায় সেই হারে বাড়াতে না পারলে বাজেট ঘাটতি পূরণে ঋণের ওপর নির্ভরতা তৈরি হয়। সময়ের সঙ্গে এই ঋণ জমতে জমতে বড় অঙ্কের পুঞ্জীভূত দায়ে পরিণত হয়।

বর্তমানে সরকারের সামনে তাই মূল চ্যালেঞ্জ শুধু নতুন ঋণ নেওয়া নয়, বরং ঋণের ব্যবহার কতটা কার্যকর হচ্ছে এবং ভবিষ্যতে তা পরিশোধের সক্ষমতা কীভাবে বজায় রাখা যায়। উৎপাদনশীল খাতে ঋণের অর্থ ব্যবহার করা গেলে তা অর্থনীতিতে আয় ও কর্মসংস্থান বাড়াতে সহায়ক হতে পারে। কিন্তু অনুৎপাদনশীল ব্যয়ে ঋণের ব্যবহার বাড়লে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর এর দায় আরও ভারী হতে পারে।

সাড়ে ১১ লাখ কোটি টাকার বেশি অভ্যন্তরীণ ঋণের এই রেকর্ড তাই দেশের অর্থনীতির জন্য একই সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিসংখ্যান এবং সতর্কবার্তা। সরকারের রাজস্ব আয় বাড়ানো, অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানো, ঋণের ব্যবহার আরও কার্যকর করা এবং দেশি-বিদেশি ঋণের সুদ ও আসল পরিশোধের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ এখন অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত