প্রকাশ: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের দ্রুত অগ্রগতির সঙ্গে এর অপব্যবহারের ঝুঁকিও ক্রমে বাড়ছে। এবার সেই ঝুঁকির নতুন একটি দিক সামনে এনেছে মার্কিন এআই প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রপিক। প্রতিষ্ঠানটির এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, উত্তর ইয়েমেনভিত্তিক একটি গোষ্ঠী গোপনে তাদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবস্থা ‘ক্লড’ ব্যবহার করে গাইডেড রকেট ও উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির চেষ্টা করেছে। অস্ত্রের বিভিন্ন সফটওয়্যার উন্নয়ন, গবেষণা, সিমুলেশন এবং নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার কাজেও এআই ব্যবহার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
অ্যানথ্রপিক তাদের প্রতিবেদনে গোষ্ঠীটির নাম সরাসরি উল্লেখ করেনি। তবে উত্তর ইয়েমেনের বড় অংশ বর্তমানে ইরান-সমর্থিত হুথিদের নিয়ন্ত্রণে থাকায় ওই গোষ্ঠীর সঙ্গে হুথিদের সংশ্লিষ্টতার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। যদিও অ্যানথ্রপিকের প্রতিবেদনে সরাসরি হুথিদের নাম নিশ্চিত করা হয়নি, ফলে বিষয়টি এখনো অভিযোগ ও প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতেই বিবেচনা করা হচ্ছে।
এআইয়ের অপব্যবহার শনাক্ত ও প্রতিরোধ নিয়ে প্রকাশিত অ্যানথ্রপিকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠী তাদের প্রকৃত উদ্দেশ্য আড়াল করার চেষ্টা করেছিল। অস্ত্র উন্নয়নের মতো একটি জটিল ও সংবেদনশীল প্রকল্পকে তারা একাধিক আলাদা এআই সেশনে ভাগ করে পরিচালনা করে। এর ফলে একটি নির্দিষ্ট কথোপকথনে পুরো কর্মকাণ্ডের চিত্র সহজে ধরা পড়েনি।
প্রতিষ্ঠানটির ভাষ্য অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠী একাধিক ধরনের অস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে কাজ করছিল। এর মধ্যে একটি ছিল গাইডেড রকেট, আরেকটি ছিল দীর্ঘপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র। এ ছাড়া ‘আর২০০০’ নামে একটি ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়েও কাজ করার তথ্য পাওয়া গেছে। এর একটি সম্ভাব্য সংস্করণে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের পরিকল্পনা ছিল বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হিসেবে অ্যানথ্রপিক তুলে ধরেছে অস্ত্র উন্নয়নের সফটওয়্যারভিত্তিক কাজে এআইয়ের ব্যবহার। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠী সফটওয়্যার লেখা, প্রযুক্তিগত গবেষণা, ফ্লাইট নিয়ন্ত্রণের কাজ, সফটওয়্যার পরীক্ষা এবং সিমুলেশনের মতো বিভিন্ন পর্যায়ে ‘ক্লড’-এর সহায়তা নিয়েছে।
একই সময়ে একাধিক এআই সেশন চালানোর মাধ্যমে কাজগুলো ভাগ করে নেওয়া হয়েছিল বলেও জানানো হয়েছে। একটি সেশনে কোড তৈরির কাজ, অন্যটিতে গবেষণা এবং আরেকটিতে আগের কাজ পর্যালোচনার মতো দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। এভাবে একটি বড় প্রকল্পকে ছোট ছোট অংশে ভাগ করে এআই ব্যবহারের চেষ্টা করা হয় বলে অ্যানথ্রপিক জানিয়েছে।
অ্যানথ্রপিকের নিরাপত্তাব্যবস্থা অবশ্য ওই গোষ্ঠীর অনেক অনুরোধ শনাক্ত করে আটকে দিয়েছিল। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটির দাবি, সংশ্লিষ্ট ব্যবহারকারীরা কিছু বিধিনিষেধ এড়িয়ে যাওয়ার উপায় খুঁজে নেয়। বিশেষ করে নিজেদের প্রকৃত উদ্দেশ্য গোপন করা এবং অস্ত্র প্রকল্পকে একাধিক কথোপকথনে ভাগ করে নেওয়ার মাধ্যমে এআই ব্যবস্থার নজরদারি এড়ানোর চেষ্টা করা হয়েছিল।
ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি হলো ইয়েমেনে একটি গাইডেড রকেটের সরাসরি পরীক্ষার দাবি। অ্যানথ্রপিক জানিয়েছে, সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠী একটি রকেট পরীক্ষা চালিয়েছিল। তবে পরীক্ষাটি সফল হয়নি বলেই তাদের কাছে মনে হয়েছে। পরীক্ষা শেষ হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই গোষ্ঠীটি আবার এআই ব্যবস্থার কাছে ফিরে যায় এবং পরীক্ষায় কী ধরনের সমস্যা হয়েছিল তা বোঝার চেষ্টা করে।
তবে অ্যানথ্রপিক স্পষ্ট করেছে, সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠী সফলভাবে কোনো কার্যকর অস্ত্র মাঠে নামাতে পেরেছে—এমন প্রমাণ তারা পায়নি। অর্থাৎ এআই ব্যবহার করে অস্ত্র তৈরির চেষ্টা এবং পরীক্ষা চালানোর তথ্য পাওয়া গেলেও সেই প্রচেষ্টা বাস্তবে কার্যকর ও মোতায়েনযোগ্য অস্ত্রে পরিণত হয়েছিল কি না, তা নিশ্চিত নয়।
এর বাইরেও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের সিমুলেশন এবং বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র উন্নয়নের কাজে এআই ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে দাবি করেছে প্রতিষ্ঠানটি। এতে বিভিন্ন প্রযুক্তিগত পরিস্থিতি বিশ্লেষণ এবং নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা নিয়ে কাজ করার মতো কার্যক্রমও অন্তর্ভুক্ত ছিল।
অ্যানথ্রপিক আরও জানিয়েছে, সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠী এমন একটি অফলাইন সিমুলেশন টুলকিট তৈরির চেষ্টা করেছিল, যা পরবর্তী সময়ে এআই প্ল্যাটফর্মের ওপর নির্ভর না করেও ব্যবহার করা সম্ভব। এর অর্থ হলো, একবার প্রয়োজনীয় সফটওয়্যার বা টুল তৈরি হয়ে গেলে ভবিষ্যতের কিছু প্রকৌশলগত কাজ চালিয়ে যেতে সংশ্লিষ্টদের একই এআই ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করতে নাও হতে পারে।
এ বিষয়টিই এআই নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠছে। কারণ উন্নত এআই যদি কোনো সংবেদনশীল প্রযুক্তিগত কাজের প্রাথমিক ধাপ দ্রুত সম্পন্ন করতে সহায়তা করে, তাহলে পরবর্তী পর্যায়ে ব্যবহারকারী নিজস্ব সফটওয়্যার ও সরঞ্জামের মাধ্যমে কাজ চালিয়ে যেতে পারে। এতে এআই প্ল্যাটফর্মের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ বা নজরদারির বাইরে চলে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
অ্যানথ্রপিকের প্রতিবেদনের পর সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্টগুলো নিষিদ্ধ করা হয়েছে। একই সঙ্গে তাদের কার্যক্রমের তথ্য সরকারি ও বেসরকারি খাতের অংশীদারদের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার কথাও জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
এই ঘটনাকে এআইয়ের সম্ভাব্য অপব্যবহারের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এতদিন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অপব্যবহার নিয়ে আলোচনায় ভুয়া তথ্য, সাইবার অপরাধ কিংবা প্রতারণার মতো বিষয় বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। কিন্তু উন্নত এআইকে অস্ত্র উন্নয়নের মতো উচ্চঝুঁকির কাজে ব্যবহার করার চেষ্টা প্রযুক্তি নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনাকে নতুন মাত্রা দিয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের জন্য আরও বড় প্রশ্ন হলো, এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা ব্যবস্থা কতটা কার্যকরভাবে ব্যবহারকারীর প্রকৃত উদ্দেশ্য শনাক্ত করতে পারে। কোনো ব্যবহারকারী যদি সরাসরি নিষিদ্ধ কোনো কাজের কথা না বলে বরং বড় একটি প্রকল্পকে অসংখ্য ছোট কাজের মধ্যে ভাগ করে নেয়, তাহলে প্রতিটি আলাদা অনুরোধের ঝুঁকি শনাক্ত করা কঠিন হতে পারে। অ্যানথ্রপিকের প্রতিবেদনে উঠে আসা ঘটনাটি এই দুর্বলতার দিকেই ইঙ্গিত করছে।
ইয়েমেনের চলমান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে ঘটনাটি আরও তাৎপর্যপূর্ণ। ইরান-সমর্থিত হুথিরা দীর্ঘদিন ধরে ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধ ও আঞ্চলিক সংঘাতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পক্ষ। সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে তাদের সংঘাতের ইতিহাস রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে ইয়েমেনকে ঘিরে আঞ্চলিক উত্তেজনাও অব্যাহত রয়েছে।
এ অবস্থায় উন্নত এআই প্রযুক্তি যদি কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠীর অস্ত্র উন্নয়ন সক্ষমতা বাড়াতে সহায়তা করে, তাহলে তা শুধু প্রযুক্তিগত নয়, আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্যও উদ্বেগের কারণ হতে পারে। বিশেষ করে অস্ত্রের সফটওয়্যার, সিমুলেশন ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার মতো ক্ষেত্রে এআইয়ের ব্যবহার ভবিষ্যতের সংঘাতের ধরন পরিবর্তন করতে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।
তবে অ্যানথ্রপিকের প্রতিবেদন থেকে এখন পর্যন্ত যে বিষয়টি নিশ্চিতভাবে বলা যায়, তা হলো সংশ্লিষ্ট একটি গোষ্ঠী এআই ব্যবস্থাকে ব্যবহার করে অস্ত্র উন্নয়নের বিভিন্ন পর্যায়ে সহায়তা নেওয়ার চেষ্টা করেছে বলে প্রতিষ্ঠানটি শনাক্ত করেছে। তারা কোনো কার্যকর অস্ত্র সফলভাবে তৈরি ও মোতায়েন করেছে—এমন প্রমাণ অবশ্য পাওয়া যায়নি।
ঘটনাটি তাই এআই প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ ব্যবহারের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা হিসেবে সামনে এসেছে। প্রযুক্তির সক্ষমতা যত বাড়বে, ততই এর ইতিবাচক ব্যবহারের পাশাপাশি অপব্যবহার ঠেকানোর জন্য নিরাপত্তাব্যবস্থাকেও শক্তিশালী করতে হবে। বিশেষ করে সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর হাতে উন্নত প্রযুক্তির প্রবেশ ঠেকাতে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, সরকার ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের কাজকে দ্রুত ও সহজ করার জন্য তৈরি হলেও এর ব্যবহার কোথায় গিয়ে থামবে, সেই প্রশ্ন এখন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। ইয়েমেনের ঘটনাটি সেই প্রশ্নকেই নতুন করে সামনে এনেছে—উন্নত এআই কতটা সহায়ক হতে পারে এবং তার অপব্যবহার ঠেকাতে নিরাপত্তার সীমারেখা কতটা কার্যকরভাবে তৈরি করা সম্ভব।