বিয়ের আনন্দের পরই পরিবারে নেমে এলো শোক

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৩০ বার
বিয়ের আনন্দের পরই পরিবারে নেমে এলো শোক

প্রকাশ: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বিয়ের অনুষ্ঠান ঘিরে তখনও স্বজনদের মনে আনন্দের রেশ। কয়েক ঘণ্টা আগেও ছিল হাসি-আনন্দ, অতিথিদের আনাগোনা, খাওয়া-দাওয়া আর নতুন জীবনের শুভকামনা। কিন্তু সেই আনন্দের আবহ শেষ হতে না হতেই একটি সড়ক দুর্ঘটনা পুরো পরিবারকে ঠেলে দিয়েছে গভীর শোকে। চট্টগ্রামে বিয়ের অনুষ্ঠান শেষে বাড়ি ফেরার পথে কাভার্ডভ্যানের ধাক্কায় একটি মাইক্রোবাসের চার যাত্রী নিহত হয়েছেন। গুরুতর আহত হয়েছেন আরও চারজন। নিহতদের মধ্যে রয়েছেন নববধূর ভাই, বোন ও বড় মামা। আহতদের মধ্যে রয়েছেন কনের বাবা-মাও।

মর্মান্তিক এ দুর্ঘটনাটি ঘটেছে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের কর্ণফুলী উপজেলার শিকলবাহা চৌমুহনী ক্রসিং এলাকায়। শনিবার দিবাগত রাত আনুমানিক ২টার দিকে বিপরীত দিক থেকে আসা একটি কাভার্ডভ্যানের সঙ্গে মাইক্রোবাসটির সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষের পর মাইক্রোবাসটি দুমড়েমুচড়ে যায়। রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন স্থানীয়রা। পরে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা আহতদের উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠান।

নিহতদের মধ্যে রয়েছেন কক্সবাজারের ঈদগাঁও এলাকার প্রবাসী মনজুর আলমের ছেলে নিয়াজ মোর্শেদ, মেয়ে মিমতাহ, মনজুর আলমের শ্যালক ও কনের বড় মামা মো. ফেরদৌস আলম এবং মাইক্রোবাসের চালক হাসান মাহমুদ মুন্না। পরিবারের সদস্যদের জন্য এ দুর্ঘটনা আরও বেদনাদায়ক হয়ে উঠেছে, কারণ নিহতদের দুজন ছিলেন একই পরিবারের সন্তান। মিমতাহ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছিলেন। আর নিয়াজ মোর্শেদ ছিলেন বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন।

পারিবারিক ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, কনের পরিবারের বসবাস চট্টগ্রাম মহানগরীর আগ্রাবাদ এলাকায়। শুক্র ও শনিবার আগ্রাবাদের একটি রেস্তোরাঁয় পরিবারের মেজো মেয়ে তাম্মিন ফায়সা ফাহিমের বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়। কক্সবাজার থেকে বিয়েতে যোগ দিতে এসেছিলেন পরিবারের আত্মীয়স্বজন। আনন্দঘন পরিবেশে শেষ হয় বিয়ের আয়োজন।

বিয়ের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে কক্সবাজার থেকে তিনটি মাইক্রোবাসে করে প্রায় ৩০ থেকে ৪০ জন স্বজন চট্টগ্রামে এসেছিলেন। অনুষ্ঠান শেষে দুটি মাইক্রোবাস নিরাপদে বাড়ির পথে ফিরে যায়। কিন্তু শেষের মাইক্রোবাসটি আর গন্তব্যে পৌঁছাতে পারেনি। শিকলবাহা এলাকায় পৌঁছানোর পরই ঘটে ভয়াবহ দুর্ঘটনা।

প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয়দের বর্ণনা অনুযায়ী, মাইক্রোবাসটি শিকলবাহা চৌমুহনী এলাকা অতিক্রম করার সময় বিপরীত দিক থেকে আসা একটি কাভার্ডভ্যান সেটিকে সজোরে ধাক্কা দেয়। সংঘর্ষের তীব্রতায় মাইক্রোবাসটির সামনের ও পাশের অংশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ভেতরে থাকা যাত্রীরা গুরুতর আহত হন। ঘটনাস্থলেই কনের বোন মিমতাহ ও বড় মামা ফেরদৌস আলমের মৃত্যু হয়।

দুর্ঘটনার খবর পেয়ে স্থানীয়রা দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন। পরে ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশ সদস্যরা সেখানে পৌঁছে উদ্ধারকাজ শুরু করেন। আহতদের উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসকরা নিয়াজ মোর্শেদ ও চালক হাসান মাহমুদ মুন্নাকে মৃত ঘোষণা করেন।

বিয়ের কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে একই পরিবারের চারজনকে হারানোর ঘটনা স্বজনদের কাছে যেন অবিশ্বাস্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। যে বাড়িতে নতুন বউকে ঘিরে আনন্দের প্রস্তুতি চলছিল, সেখানেই হঠাৎ কান্নার রোল উঠেছে। কনের বাবা-মাও গুরুতর আহত হওয়ায় পরিবারের শোক আরও ভারী হয়ে উঠেছে।

দুর্ঘটনায় কনের বাবা মনজুর আলম এবং মা নিলুফা আক্তারও গুরুতর আহত হয়েছেন। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর মনজুর আলমের শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাকে জরুরি ভিত্তিতে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। নিলুফা আক্তারও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন এবং চিকিৎসকদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে রয়েছেন।

পরিবারের সদস্যদের জন্য পরিস্থিতিটি কতটা হৃদয়বিদারক, তা বোঝা যায় স্বজনদের কথায়। কনের মামাতো ভাই ইমন কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানান, বিয়ের সব আনুষ্ঠানিকতা সুন্দরভাবে শেষ হয়েছিল। কেউ ভাবতে পারেননি, আনন্দের সেই মুহূর্ত এত দ্রুত ভয়াবহ শোকে পরিণত হবে। একসঙ্গে পরিবারের একাধিক সদস্যকে হারানোর এই ধাক্কা স্বজনদের জন্য অত্যন্ত কঠিন হয়ে উঠেছে।

দুর্ঘটনার পর পুলিশ কাভার্ডভ্যানটি জব্দ করেছে। কর্ণফুলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নুর আহমদ জানিয়েছেন, এ ঘটনায় একটি মামলা হয়েছে। কাভার্ডভ্যানের চালক ও সহকারী দুর্ঘটনার পর পালিয়ে যাওয়ায় তাদের গ্রেপ্তারে অভিযান চালানো হচ্ছে। আইনি প্রক্রিয়া শেষে নিহতদের মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

চট্টগ্রামের এই দুর্ঘটনার পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন এলাকায় গতকাল আরও কয়েকটি সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ঢাক-বেনাপোল মহাসড়কের ভাঙ্গা এলাকায় বাসের সঙ্গে মোটরসাইকেলের সংঘর্ষে একজন সাংবাদিক নিহত হয়েছেন। নিহত কাজী আশরাফের বয়স ৪৫ বছর। তিনি এশিয়ান টেলিভিশন ও দৈনিক করতোয়া পত্রিকার লোহাগড়া প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করতেন।

জানা গেছে, রোববার সকালে ব্যক্তিগত কাজে মোটরসাইকেলে করে লোহাগড়া থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন কাজী আশরাফ। তার সঙ্গে ছিলেন আরেক মোটরসাইকেল আরোহী মাহমুদুল হাসান অনিক। ভাঙ্গা উপজেলার মনসুরাবাদ এলাকায় মোটরসাইকেলটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সড়কে পড়ে একটি বাসের সঙ্গে ধাক্কা খায়। এতে দুজনই গুরুতর আহত হন। স্থানীয়রা তাদের উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যান। পরে কাজী আশরাফকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে দুপুরে তার মৃত্যু হয়। আহত অনিক চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

সিরাজগঞ্জের কাজীপুরেও ঘটেছে মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। উপজেলার শিমুলদাইড় এলাকায় বালুবাহী ট্রাকের চাপায় নূর জাহান বেগম নামে ৬৫ বছর বয়সী এক বৃদ্ধা নিহত হয়েছেন। রোববার সকালে রাস্তার পাশে হাঁটার সময় একটি বালুবাহী ট্রাক তাকে ধাক্কা দেয়। পরে রাস্তার পাশের একটি গাছের সঙ্গে তাকে চাপা দেয় ট্রাকটি। এতে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, ট্রাকটি মেঘাই বালুরঘাট থেকে বালু নিয়ে সোনামুখীর দিকে যাচ্ছিল। শিমুলদাইড় এলাকায় পৌঁছালে দুর্ঘটনাটি ঘটে। এ ঘটনায় নিহতের ছেলে রঞ্জু মিয়া বাদী হয়ে থানায় মামলা করেছেন।

মেহেরপুরের মুজিবনগরেও প্রাণ গেছে এক শিশুর। উপজেলার মানিকনগরে রোববার দুপুরে ট্রাকের চাপায় নাবিল হোসেন নামে ১০ বছরের এক শিশুর মৃত্যু হয়। নাবিল স্থানীয় একটি মাদ্রাসার তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল।

স্থানীয়রা জানান, সাইকেলে করে মাদ্রাসায় যাওয়ার সময় একটি মোটরসাইকেল নাবিলকে ধাক্কা দেয়। এতে সে ছিটকে সড়কে পড়ে যায়। ঠিক সেই সময় একটি ট্রাক তাকে চাপা দেয়। স্থানীয়রা দ্রুত শিশুটিকে উদ্ধার করে মুজিবনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

একই দিনে দেশের বিভিন্ন স্থানে ঘটে যাওয়া এসব দুর্ঘটনা আবারও সড়ক নিরাপত্তার বিষয়টি সামনে এনেছে। কখনও দ্রুতগতির যানবাহন, কখনও অসতর্কতা, আবার কখনও সড়কে যানবাহনের নিয়ন্ত্রণ হারানোর কারণে মুহূর্তের মধ্যে নিভে যাচ্ছে মানুষের জীবন। একটি পরিবারের বিয়ের আনন্দ যেমন কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে শোকে পরিণত হয়েছে, তেমনি অন্য পরিবারগুলোও হারিয়েছে তাদের প্রিয়জনকে।

সড়ক দুর্ঘটনার প্রতিটি ঘটনা কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়; এর পেছনে থাকে একটি পরিবার, অসংখ্য সম্পর্ক এবং ভবিষ্যতের নানা স্বপ্ন। চট্টগ্রামের দুর্ঘটনায় যেমন একটি নববধূর জীবনের সবচেয়ে আনন্দের দিনটি মুহূর্তেই বিষাদে ঢেকে গেছে, তেমনি তার বাবা-মায়ের গুরুতর আহত হওয়ার কারণে পরিবারটির সামনে তৈরি হয়েছে আরও অনিশ্চিত সময়।

এ ধরনের দুর্ঘটনা রোধে সড়কে চালকদের দায়িত্বশীলতা, যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণ, নিরাপদ ও সতর্কভাবে গাড়ি চালানো এবং মহাসড়কে আইন মেনে চলার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া এবং যানবাহনের ফিটনেস ও চালকদের দক্ষতা নিশ্চিত করাও জরুরি।

বিয়ের অনুষ্ঠান শেষ করে যে পরিবারটি আনন্দের স্মৃতি নিয়ে বাড়ি ফিরছিল, তাদের সেই যাত্রা যে এমন নির্মম পরিণতি বয়ে আনবে, তা কেউ কল্পনাও করেনি। আনন্দের রাত শেষ হওয়ার আগেই চারটি প্রাণ ঝরে গেল, আহত হলেন আরও কয়েকজন। নতুন জীবনের সূচনাকে ঘিরে যে পরিবারে ছিল উৎসবের আলো, সেখানেই এখন নেমে এসেছে শোকের অন্ধকার। এই মর্মান্তিক ঘটনা আবারও মনে করিয়ে দিল, সড়কে সামান্য অসতর্কতার মূল্য কখনও কখনও একটি পুরো পরিবারকে আজীবন দিতে হয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত