প্রকাশ: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ভবনের ঐতিহাসিক সংগ্রহশালায় মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর একটি ছবি প্রদর্শনকে কেন্দ্র করে নতুন করে রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ছবিটি প্রদর্শনের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল। সংগঠনটি দ্রুত সময়ের মধ্যে ছবিটি সংগ্রহশালা থেকে সরিয়ে নেওয়ার দাবি জানিয়েছে।
সোমবার ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সংসদের দপ্তর সম্পাদক মো. জাহাঙ্গীর আলম স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে এ প্রতিবাদ জানানো হয়। বিবৃতিতে জিন্নাহর ১৯৪৮ সালের ভাষা-সংক্রান্ত অবস্থান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ছাত্রসমাজের প্রতিবাদ এবং পরবর্তী ভাষা আন্দোলন ও বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের সঙ্গে বিষয়টির সম্পর্ক তুলে ধরা হয়েছে। একই সঙ্গে ডাকসুর বর্তমান নেতৃত্বের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড নিয়েও রাজনৈতিক সমালোচনা করা হয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে সংস্কার ও নতুনভাবে সাজানো ডাকসু সংগ্রহশালাটি দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং বিভিন্ন আন্দোলনের স্মৃতি সংরক্ষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান হিসেবে সামনে এসেছে। গত ১৩ সেপ্টেম্বর সংস্কার করা সংগ্রহশালার উদ্বোধনও করা হয়। এর পরদিনই সেখানে জিন্নাহর ছবি প্রদর্শন নিয়ে ছাত্রদলের আপত্তি প্রকাশ্যে আসে। ফলে সংগ্রহশালায় কোন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের ছবি বা স্মারক কী উদ্দেশ্যে প্রদর্শিত হবে, তা নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
ছাত্রদলের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার অবস্থান প্রকাশ করেছিলেন। সংগঠনটির দাবি, তৎকালীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ওই বক্তব্যের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিকভাবে প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন আরও বিস্তৃত হয় এবং ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন বাঙালির রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার আদায়ের সংগ্রামের অন্যতম প্রধান ভিত্তিতে পরিণত হয়।
ছাত্রদল মনে করে, যে ছাত্রসমাজ ভাষার অধিকারের প্রশ্নে পাকিস্তানি শাসকদের বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক ভূমিকা রেখেছিল এবং পরবর্তীতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিল, সেই ছাত্রসমাজের ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত ডাকসুর সংগ্রহশালায় জিন্নাহর ছবি প্রদর্শন বিতর্ক তৈরি করতে পারে। সংগঠনটির ভাষ্য অনুযায়ী, এ ধরনের প্রদর্শন ভাষা আন্দোলন ও স্বাধীনতার সংগ্রামের ঐতিহাসিক চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
তবে ছবিটি কেন প্রদর্শন করা হয়েছে, প্রদর্শনের উদ্দেশ্য কী এবং সংগ্রহশালার সামগ্রিক ঐতিহাসিক উপস্থাপনার অংশ হিসেবে এর অবস্থান কী—এসব বিষয়ে ডাকসু কর্তৃপক্ষের বিস্তারিত বক্তব্য এই প্রতিবেদনের সময় পাওয়া যায়নি। ফলে ছবিটি প্রদর্শনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে কোনো নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। একটি ঐতিহাসিক সংগ্রহশালায় কোনো বিতর্কিত বা ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির ছবি প্রদর্শন করা হলে তার প্রেক্ষাপট, সময়কাল ও সংশ্লিষ্ট ঘটনাবলির ব্যাখ্যাও দর্শনার্থীদের সামনে স্পষ্টভাবে তুলে ধরা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
ছাত্রদলের বিবৃতিতে শুধু জিন্নাহর ছবি প্রদর্শনের বিষয়েই আপত্তি জানানো হয়নি, ডাকসুর বর্তমান নেতৃত্বের সামগ্রিক কার্যক্রম নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। সংগঠনটির অভিযোগ, সাধারণ শিক্ষার্থীদের আবাসন সংকট, অধিকার আদায় এবং শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বর্তমান নেতৃত্ব প্রত্যাশিত ভূমিকা রাখতে পারেনি। তাদের দাবি, শিক্ষার্থীদের দৈনন্দিন সমস্যার পরিবর্তে ডাকসুর কার্যক্রমে দলীয় ও আদর্শিক বিষয়কে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বিবৃতিতে মধুর ক্যান্টিনের নাম পরিবর্তনের উদ্যোগের প্রসঙ্গও তুলে ধরা হয়েছে। ছাত্রদলের দাবি, মধুর ক্যান্টিনের নাম পরিবর্তনের চেষ্টা এবং সংগ্রহশালায় জিন্নাহর ছবি প্রদর্শন একই ধরনের ধারাবাহিকতার অংশ। সংগঠনটি এসব কর্মকাণ্ডকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক চেতনা ও মুক্তিকামী রাজনৈতিক ঐতিহ্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে অভিহিত করেছে। একই সঙ্গে তারা ডাকসুর বর্তমান নেতৃত্বকে ‘শিবির নিয়ন্ত্রিত’ বলে রাজনৈতিক অভিযোগ তুলেছে। তবে এটি ছাত্রদলের রাজনৈতিক বক্তব্য; এ অভিযোগের স্বাধীন যাচাই এই প্রতিবেদনে করা সম্ভব হয়নি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররাজনীতিতে ডাকসুর সংগ্রহশালা ও ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোর গুরুত্ব আলাদা। দীর্ঘ সময় পর ডাকসু কার্যক্রম পুনরায় সক্রিয় হওয়ার পর সংগঠনটির বিভিন্ন উদ্যোগ ইতোমধ্যে শিক্ষার্থী ও রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর আলোচনায় এসেছে। বিশেষ করে ডাকসু ভবন ও এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলোকে কীভাবে সংরক্ষণ ও উপস্থাপন করা হবে, তা ভবিষ্যতে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসের অংশ হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে।
ইতিহাসের বিতর্কিত অধ্যায়গুলো কীভাবে উপস্থাপন করা হবে, তা নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সংগ্রহশালায় সাধারণত দুটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে—একদিকে ঐতিহাসিক তথ্য সংরক্ষণ, অন্যদিকে সেই তথ্যের যথাযথ ব্যাখ্যা। কোনো ব্যক্তিত্বের ছবি বা স্মারক প্রদর্শনের অর্থ সবসময় সেই ব্যক্তির রাজনৈতিক অবস্থানের প্রতি সমর্থন নয়; অনেক ক্ষেত্রে ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায় তুলে ধরার জন্যও বিতর্কিত ব্যক্তিত্বের ছবি সংরক্ষণ করা হয়। তবে দর্শনার্থীদের কাছে বিভ্রান্তি এড়াতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ভূমিকা, বিতর্ক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট স্পষ্টভাবে তুলে ধরা জরুরি।
এ কারণেই ডাকসু সংগ্রহশালায় জিন্নাহর ছবি প্রদর্শনের ঘটনাটি নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কের পাশাপাশি ঐতিহাসিক উপস্থাপনার ধরন নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসের সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গভীর সম্পর্ক থাকায় এ ধরনের প্রদর্শনী শিক্ষার্থী ও দর্শনার্থীদের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে।
ছাত্রদলের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব ও সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির এক যৌথ বক্তব্যে অবিলম্বে সংগ্রহশালা থেকে জিন্নাহর ছবি অপসারণের দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে ডাকসুকে কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক গোষ্ঠীর আদর্শচর্চার জায়গা হিসেবে ব্যবহার না করার আহ্বান জানিয়েছেন তারা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক মধুর ক্যান্টিনসহ বিভিন্ন স্মারক ও ঐতিহ্যকে বিকৃত করার যেকোনো প্রচেষ্টা প্রতিহত করার কথাও জানিয়েছেন ছাত্রদলের এই দুই নেতা।
তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, ১৯৪৮ সালে ভাষার অধিকার নিয়ে তৎকালীন ছাত্রসমাজ যে প্রতিবাদ গড়ে তুলেছিল, সেই ঐতিহ্যকে সামনে রেখে বর্তমান শিক্ষার্থীদেরও বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস ও ঐতিহ্য রক্ষায় সোচ্চার হতে হবে। ছাত্রদল জানিয়েছে, সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিয়ে তারা এ ধরনের কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলবে।
ঘটনাটি এমন এক সময়ে সামনে এসেছে, যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররাজনীতি ও ডাকসুর কার্যক্রম নিয়ে শিক্ষার্থী মহলে নতুন করে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। দীর্ঘ বিরতির পর সক্রিয় ডাকসুকে ঘিরে শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা যেমন বেড়েছে, তেমনি সংগঠনটির বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও কর্মকাণ্ডও পর্যবেক্ষণ করছে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও ছাত্রসংগঠন।
ফলে সংগ্রহশালায় জিন্নাহর ছবি প্রদর্শনের বিষয়টি শুধু একটি ছবিকে কেন্দ্র করে বিতর্কে সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি এটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস সংরক্ষণ ও উপস্থাপনার বৃহত্তর আলোচনায় রূপ নেবে—সেদিকেই এখন নজর সংশ্লিষ্টদের। একই সঙ্গে ডাকসু কর্তৃপক্ষ ছবিটি কোন ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে প্রদর্শন করেছে এবং এর সঙ্গে কোনো ব্যাখ্যামূলক তথ্য সংযুক্ত আছে কি না, তা স্পষ্ট করলে বিতর্কের অনেকটাই অবসান হতে পারে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে ভাষা আন্দোলন, স্বাধিকার আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেই ইতিহাস সংরক্ষণের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক মতপার্থক্যের ঊর্ধ্বে উঠে তথ্যভিত্তিক, প্রেক্ষাপটসমৃদ্ধ ও দায়িত্বশীল উপস্থাপনই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন ইতিহাসসচেতন মহল। ডাকসুর সংগ্রহশালা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে বিশ্ববিদ্যালয় ও দেশের রাজনৈতিক ইতিহাস তুলে ধরবে—এমন প্রত্যাশার মধ্যেই জিন্নাহর ছবি প্রদর্শনকে ঘিরে শুরু হওয়া বিতর্ক নতুন মাত্রা পেয়েছে।