নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে চীন থেকে পণ্য কিনছে ইরান

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১০ বার
নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে চীন থেকে পণ্য কিনছে ইরান

প্রকাশ: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মার্কিন নিষেধাজ্ঞার চাপের মধ্যেও চীনের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক সচল রাখতে নতুন ধরনের আর্থিক ব্যবস্থা ব্যবহার করছে ইরান। দেশটির জ্বালানি তেল বিক্রির অর্থ সরাসরি আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ব্যবস্থায় না এনে চীনের ভেতরে বিশেষ ধরনের ক্রেডিট বা হিসাব ব্যবস্থার মাধ্যমে পণ্য কেনার কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে।

রয়টার্সের সঙ্গে কথা বলা ইরানের দুই জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা এবং আরও কয়েকজন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ভাষ্য অনুযায়ী, এ ব্যবস্থায় ইরান চীনে তেল বিক্রি করার পর তার সমপরিমাণ অর্থ নগদ ডলার হিসেবে দেশে ফেরত নেয় না। বরং চীনের কোনো বিশেষ আর্থিক কাঠামো বা হিসাবে সেই অর্থের বিপরীতে ইরানের জন্য ক্রেডিট তৈরি করা হয়। পরবর্তী সময়ে ইরান চীন থেকে বিভিন্ন পণ্য, যন্ত্রপাতি, যানবাহন, ওষুধ ও অন্যান্য সামগ্রী কেনার সময় সেই ক্রেডিট ব্যবহার করতে পারে।

সহজভাবে বললে, ব্যবস্থাটি অনেকটা নির্দিষ্ট একটি প্রতিষ্ঠানের উপহার কার্ডের মতো। কোনো ব্যক্তি যেমন আগে অর্থ দিয়ে একটি গিফট কার্ডে ব্যালান্স জমা করে পরে ওই প্রতিষ্ঠানের পণ্য কিনতে পারেন, ইরানের ক্ষেত্রেও তেলের বিনিময়ে পাওয়া অর্থ চীনের একটি নির্দিষ্ট কাঠামোয় জমা থাকে। পরে সেই অর্থ নগদে না নিয়ে চীনা পণ্য কেনার ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়।

এ ধরনের ব্যবস্থা ব্যবহারের অন্যতম কারণ হিসেবে সামনে এসেছে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা। ইরানের সঙ্গে বড় ধরনের আর্থিক লেনদেনের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার ব্যবহার করলে মার্কিন নজরদারি ও নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। ফলে তেল বিক্রির অর্থ সরাসরি আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থার মাধ্যমে স্থানান্তরের পরিবর্তে পণ্য কেনাকাটার সঙ্গে যুক্ত একটি বিকল্প ব্যবস্থা তৈরি করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি।

রয়টার্সের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, গত কয়েক বছরে এ ধরনের বাণিজ্য কাঠামো ইরানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে তেহরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক চাপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চীনের সঙ্গে বাণিজ্য চালু রাখার বিকল্প পথ হিসেবে এর ব্যবহার বেড়েছে বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে।

চীন বিশ্বের অন্যতম বড় অপরিশোধিত তেল আমদানিকারক দেশ। ইরানের তেলের বড় অংশও চীন কিনে থাকে। পণ্যবাজারবিষয়ক তথ্য ও বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ইরান থেকে জাহাজে পাঠানো তেলের ৮০ শতাংশের বেশি চীন কিনেছে। সে সময় দেশটি প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৪ লাখ ব্যারেল ইরানি তেল আমদানি করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এর ফলে চীন একদিকে তুলনামূলক কম দামে ইরানি তেল পাওয়ার সুযোগ ধরে রেখেছে, অন্যদিকে ইরান চীনের বাজার থেকে প্রয়োজনীয় পণ্য সংগ্রহের একটি কার্যকর পথ পেয়েছে। একই সঙ্গে চীনের কিছু ব্যাংক ও কোম্পানিকে আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থায় সরাসরি ইরানি অর্থ লেনদেনের ঝুঁকি থেকেও দূরে রাখার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

রয়টার্সের সঙ্গে কথা বলা সূত্রগুলো জানিয়েছে, এই ব্যবস্থার মাধ্যমে ইরান ওষুধ, যানবাহন, যোগাযোগ সরঞ্জামসহ বিভিন্ন ধরনের পণ্য কিনেছে। এসব পণ্যের নির্মাতা বা সরবরাহকারীরা সরাসরি ইরানের সঙ্গে ব্যবসা করেছে—এমন কোনো প্রমাণ নেই বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘনের অভিযোগের বিষয়টিও আলাদাভাবে বিবেচনা করতে হবে।

তবে আরও স্পর্শকাতর একটি বিষয়ও সামনে এসেছে। সূত্রগুলোর দাবি, গত এক বছরে অন্তত একবার কয়েক কোটি ডলারের আকাশ প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ইরানে সরবরাহের একটি চুক্তির ক্ষেত্রেও এ ধরনের ব্যবস্থা ব্যবহার করা হয়েছে। তবে এসব সামরিক সরঞ্জাম সত্যিই সরবরাহ করা হয়েছে কি না এবং সংশ্লিষ্ট চীনা নির্মাতারা কারা, তা স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি রয়টার্স।

ইরান ও চীনের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। ২০২১ সালে দুই দেশ ২৫ বছরের একটি কৌশলগত অংশীদারত্ব চুক্তি স্বাক্ষর করে। জ্বালানি, অবকাঠামোসহ বিভিন্ন খাত এতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। যদিও চুক্তির অনেক বিস্তারিত প্রকাশ্যে আসেনি।

রয়টার্সের অনুসন্ধানে আরও বলা হয়েছে, ইরানের তেল বিক্রির অর্থ ব্যবস্থাপনায় চীনের একটি বিশেষ আর্থিক কাঠামো ব্যবহারের তথ্য পাওয়া গেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, চীনের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন তেল ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ঝুহাই ঝেনরংয়ের হয়ে কাজ করা একটি ক্রেতা চলতি বছর পর্যন্ত চীনের একটি তুলনামূলক অপরিচিত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের হিসাবে প্রতি মাসে বিপুল অর্থ জমা দিয়েছে।

সূত্রগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, ইরানের জাতীয় তেল কোম্পানির সঙ্গে সম্পর্কিত হংকংয়ে নিবন্ধিত একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে করা চুক্তির আওতায় এসব অর্থ জমা দেওয়া হতো। পরে ওই অর্থ চীনা রপ্তানিকারক এবং ইরানে অবকাঠামো নির্মাণকারী কোম্পানিগুলোর পাওনা পরিশোধে ব্যবহৃত হতো বলে ধারণা করা হচ্ছে।

তিনটি সূত্রের দাবি, ওই ব্যবস্থার মাধ্যমে ইরানি তেল বিক্রির অর্থের প্রায় ৭০ শতাংশ অবকাঠামো প্রকল্পে বরাদ্দ করা হয়। বাকি অর্থ একটি বিশেষ উদ্দেশ্যে গঠিত প্রতিষ্ঠানের বা এসপিভির হিসাবে রাখা হতো। ইরানে পণ্য সরবরাহকারী কোম্পানিগুলো সেই এসপিভির মাধ্যমে অর্থ গ্রহণ করত বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে।

ইরানের সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী মহলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ দুই ব্যক্তি এসপিভির অস্তিত্বের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বলে রয়টার্স জানিয়েছে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এসপিভিতে থাকা অর্থ পরিচালনায় চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যুক্ত একটি প্রতিষ্ঠান এবং ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি প্রতিষ্ঠান ভূমিকা রাখে।

প্রক্রিয়াটি এমন যে, ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক কোনো আমদানিকারককে এসপিভির অর্থ ব্যবহারের অনুমোদন দেওয়ার পর চীনের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে তা জানানো হয়। এরপর ইরানে পণ্য সরবরাহকারী চীনা কোম্পানিগুলোর অর্থ পরিশোধ করা হয়। এতে আন্তর্জাতিক ডলার লেনদেনের প্রয়োজন তুলনামূলকভাবে কমে যায়।

তবে রয়টার্স চীনা কোম্পানির প্রকাশ্য নিবন্ধনসংক্রান্ত নথিতে কথিত ‘চুইশিন’ নামের ওই আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব খুঁজে পায়নি। একইভাবে চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হয়ে কাজ করে বলে সূত্রগুলো যে প্রতিষ্ঠানগুলোর কথা বলেছে, সেগুলোরও প্রকাশ্য নথি পাওয়া যায়নি। একটি সূত্র এমনকি বলেছে, ‘চুইশিন’ হয়তো কেবল অভ্যন্তরীণ কোনো স্প্রেডশিটে ব্যবহৃত একটি নাম।

সূত্রগুলোর হিসাব অনুযায়ী, গত এক বছরে ওই বিশেষ এসপিভির মাধ্যমে ইরান ও চীনের মধ্যে প্রায় ২০০ কোটি থেকে ২৫০ কোটি ডলারের লেনদেন হয়েছে। তবে এই পরিমাণের স্বাধীন যাচাইও করতে পারেনি রয়টার্স।

ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যের অভিযোগে চীনের ঝুহাই ঝেনরং যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার আওতায় রয়েছে। রয়টার্সকে একটি সূত্র ২০২৫ সালের জুলাইয়ের একটি চিঠি সরবরাহ করেছে, যেখানে ইরানের জাতীয় তেল কোম্পানির পক্ষ থেকে ওই চীনা প্রতিষ্ঠানের কাছে বকেয়া অর্থের পরিমাণ নিশ্চিত করতে বলা হয়েছিল। তবে নথিটির সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি রয়টার্স।

চীন ও ইরান উভয় দেশই পশ্চিমা দেশগুলোর আরোপ করা একতরফা নিষেধাজ্ঞার বৈধতা নিয়ে আপত্তি জানিয়ে আসছে। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদন ছাড়া আরোপিত একতরফা নিষেধাজ্ঞার বিরোধিতা করে তারা।

তবে চীনা কর্তৃপক্ষ কথিত এই গোপন বাণিজ্যব্যবস্থা সম্পর্কে রয়টার্সের প্রশ্নের সরাসরি কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি। ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক, দেশটির জাতীয় তেল কোম্পানি এবং সংশ্লিষ্ট চীনা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকেও এ বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

যুক্তরাষ্ট্রও ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ঘিরে তেহরানের ওপর চাপ অব্যাহত রেখেছে। মার্কিন প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ওয়াশিংটন ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ অর্থনৈতিক অংশীদারদের সঙ্গে কাজ করছে, যাতে ইরানের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা এগিয়ে নেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ সংগ্রহের সুযোগ সীমিত করা যায়।

গত আগস্টে মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট সতর্ক করেছিলেন, যেসব দেশ ইরানের সঙ্গে ব্যবসা করছে তাদের সেই সম্পর্ক ছিন্ন করতে হবে, নইলে তারা মার্কিন ডলারভিত্তিক আর্থিক ব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঝুঁকিতে পড়তে পারে। এমন চাপের মধ্যেও চীন-ইরান বাণিজ্য চালু থাকার বিষয়টি তাই ওয়াশিংটনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।

যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব এক্সেটারের আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রভাষক আন্দ্রেয়া ঘিসেল্লির মতে, চীন এমন একটি অবস্থান ধরে রাখতে চায় যেখানে দেশটির ব্যাংক ও কোম্পানিগুলো আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঝুঁকিতে না পড়ে, আবার প্রয়োজনের সময় নিজেদের সরাসরি সম্পৃক্ততার বিষয়টিও অস্বীকার করার সুযোগ থাকে।

এদিকে ইরানের জন্য চীনের সঙ্গে এই বাণিজ্যিক সম্পর্ক শুধু অর্থনৈতিক সুবিধার বিষয় নয়; নিষেধাজ্ঞার মধ্যে প্রয়োজনীয় পণ্য সংগ্রহ এবং বৈদেশিক বাণিজ্য সচল রাখার ক্ষেত্রেও এটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে চীন ইরানি তেলের একটি বড় ক্রেতা হিসেবে নিজের জ্বালানি চাহিদা পূরণের পাশাপাশি পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার প্রভাব মোকাবিলায় নিজস্ব কৌশল ধরে রেখেছে।

তবে এই পুরো ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। কথিত এসপিভি, সংশ্লিষ্ট আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং কিছু লেনদেনের বিষয়ে প্রকাশ্য নথির ঘাটতি রয়েছে। ফলে রয়টার্সের অনুসন্ধানে উঠে আসা তথ্যগুলোর কিছু অংশ সংশ্লিষ্ট সূত্রের বক্তব্যের ওপর নির্ভরশীল এবং সব লেনদেন স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

তারপরও সামগ্রিক চিত্রটি ইঙ্গিত দেয়, নিষেধাজ্ঞার চাপে থাকা একটি দেশ কীভাবে প্রচলিত আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে গিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক সম্পর্ক ধরে রাখার চেষ্টা করছে। একই সঙ্গে চীনের মতো বড় অর্থনীতির সঙ্গে ইরানের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক মার্কিন নিষেধাজ্ঞা নীতির কার্যকারিতা এবং ভবিষ্যৎ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কাঠামো নিয়েও নতুন প্রশ্ন তৈরি করছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত