ব্রিকসে প্রধানমন্ত্রীকে যথাযথ মর্যাদা দেওয়া হয়নি

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ২ বার
ব্রিকসে প্রধানমন্ত্রীকে যথাযথ মর্যাদা দেওয়া হয়নি

প্রকাশ: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ব্রিকস সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে যথাযথ মর্যাদায় আমন্ত্রণ জানানো হয়নি বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় সংসদের স্পিকার মেজর হাফিজ উদ্দিন আহমেদ। একই সঙ্গে তিনি বলেছেন, বাংলাদেশ এখনো ব্রিকসের সদস্য নয় এবং সংগঠনটির অংশীদার হওয়ার বিষয়েও আলোচনা চলছে। তবে ব্রিকসে যোগদানের বিষয়ে সরকারের নীতি এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়।

সোমবার সকালে ভোলা সার্কিট হাউসে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে স্পিকার এসব কথা বলেন। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অবস্থান, প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক, ব্রিকসের সঙ্গে ঢাকার সম্পৃক্ততা এবং দেশের চলমান রাজনৈতিক সংস্কার নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তর দেন তিনি।

ব্রিকস বর্তমানে বৈশ্বিক অর্থনীতি ও ভূরাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে বিবেচিত। ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকাকে নিয়ে শুরু হওয়া এই জোট পরবর্তী সময়ে সম্প্রসারিত হয়েছে। উদীয়মান অর্থনীতি ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়ানো, বাণিজ্যিক সম্পর্ক শক্তিশালী করা এবং আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় সদস্যদের ভূমিকা জোরদার করাই জোটটির অন্যতম লক্ষ্য। ফলে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য ব্রিকসের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়ানো অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক—দুই দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

স্পিকারের বক্তব্যে মূলত দুটি বিষয় উঠে এসেছে। প্রথমত, ব্রিকস সম্মেলনে বাংলাদেশের সরকারপ্রধানকে কী ধরনের মর্যাদায় আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে তা নিয়ে তার অসন্তোষ। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশ ব্রিকসের পূর্ণ সদস্য বা অংশীদার হওয়ার ক্ষেত্রে এখনো কোনো চূড়ান্ত নীতিগত অবস্থান নেয়নি বলে তার মন্তব্য।

মেজর হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বলেন, বাংলাদেশ এখনো ব্রিকসের সদস্য নয়। তবে অংশীদার হওয়ার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছে। কিন্তু জোটটিতে যোগদানের বিষয়ে সরকারের নীতি এখনো স্পষ্ট নয়। তার এই মন্তব্য থেকে বোঝা যায়, বাংলাদেশ ব্রিকসের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করলেও পূর্ণ সদস্যপদ বা অংশীদারিত্বের বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি।

বাংলাদেশের অর্থনীতি ও পররাষ্ট্রনীতির জন্য বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, ব্রিকসের সদস্য ও অংশীদার দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক ইতোমধ্যেই উল্লেখযোগ্য। বিশেষ করে চীন ও ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি, বিনিয়োগ ও অবকাঠামোগত সহযোগিতা রয়েছে। একই সঙ্গে ব্রাজিল, রাশিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকার সঙ্গেও বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সম্পর্ক রয়েছে। ফলে ব্রিকসের সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে আরও ঘনিষ্ঠ হওয়া বাংলাদেশের জন্য নতুন অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি করতে পারে।

তবে ব্রিকসের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়ানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির ভারসাম্য রক্ষা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। একদিকে চীন, ভারত ও রাশিয়ার মতো শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে; অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশের প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদারদের মধ্যে অন্যতম। ফলে কোনো একটি ভূরাজনৈতিক বলয়ের সঙ্গে অতিরিক্তভাবে ঘনিষ্ঠ হয়ে পড়ার পরিবর্তে সব পক্ষের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার বিষয়টি বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

ভোলা সফরে স্পিকার বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক নিয়েও কথা বলেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ভারত আশ্রয় দেওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ কারণে বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে এক ধরনের সংরক্ষণ বা অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। তবে একই সঙ্গে তিনি স্পষ্ট করেন, বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে চায়।

তার মতে, দুই দেশের সম্পর্ক হতে হবে সমমর্যাদা ও পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে। অর্থাৎ প্রতিবেশী দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব এবং সমতার বিষয়টি গুরুত্ব পেতে হবে। স্পিকারের বক্তব্যে একই সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার আকাঙ্ক্ষা এবং সম্পর্কের ক্ষেত্রে পারস্পরিক সম্মানের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি উঠে এসেছে।

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ক্ষেত্রে শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান বর্তমানে একটি সংবেদনশীল রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বিষয়। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এ নিয়ে নানা আলোচনা ও বিতর্ক রয়েছে। স্পিকারের বক্তব্যেও সেই রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতিফলন দেখা গেছে। তবে তিনি ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন বা দূরত্ব তৈরির কোনো কথা বলেননি; বরং বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের প্রয়োজনীয়তার কথাই উল্লেখ করেছেন।

দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, পানি বণ্টন, যোগাযোগ, নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক সহযোগিতার মতো বহু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। ফলে রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট এসব বিষয়ে সহযোগিতা অব্যাহত রাখা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। স্পিকারের বক্তব্যে সমমর্যাদার ভিত্তিতে এমন সম্পর্কের প্রত্যাশাই গুরুত্ব পেয়েছে।

এদিকে দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংস্কার নিয়েও কথা বলেছেন স্পিকার। তিনি বলেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়নসহ বিভিন্ন সংস্কার নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আলোচনা চলছে। সরকার ও বিরোধী দল সংস্কারের বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারলে সংসদের আগামী অধিবেশনে প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন এবং সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব হবে।

জুলাই সনদ বাস্তবায়ন বর্তমানে বাংলাদেশের রাজনৈতিক আলোচনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, নির্বাচনব্যবস্থা, প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা ও রাজনৈতিক কাঠামোর বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কারের দাবি সামনে এসেছে। এসব সংস্কার কীভাবে বাস্তবায়ন করা হবে এবং কোন বিষয়গুলোতে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য তৈরি হবে, তা নিয়ে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।

স্পিকারের বক্তব্য অনুযায়ী, রাজনৈতিক ঐকমত্য তৈরি হলে সংসদীয় প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন করা সম্ভব হবে। কিছু ক্ষেত্রে সংবিধান সংশোধনের প্রয়োজন হলে সেটিও সংসদের মাধ্যমে সম্পন্ন করার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। তবে এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নের জন্য সরকার ও বিরোধী দলসহ সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক শক্তিগুলোর মধ্যে সমঝোতা গুরুত্বপূর্ণ।

রাজনৈতিক সংস্কার নিয়ে ঐকমত্যের বিষয়টি শুধু আইন প্রণয়নের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। দেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কাঠামো, নির্বাচনব্যবস্থা, ক্ষমতার ভারসাম্য এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা নিয়েও এর প্রভাব পড়তে পারে। ফলে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে গ্রহণযোগ্য সমাধানে পৌঁছানো জরুরি বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

ভোলা সফরে স্পিকারের বক্তব্যে একই সঙ্গে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের দুটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উঠে এসেছে। একদিকে ব্রিকসের মতো উদীয়মান বৈশ্বিক জোটে বাংলাদেশের অবস্থান কী হবে, অন্যদিকে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক কোন ভিত্তিতে এগোবে—এই দুটি প্রশ্নই ভবিষ্যৎ পররাষ্ট্রনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে বহুমুখী কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখা। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, বাণিজ্য সম্প্রসারণ, বিনিয়োগ আকর্ষণ ও বৈশ্বিক বাজারে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে বিভিন্ন শক্তিশালী দেশের সঙ্গে সম্পর্ক প্রয়োজন। একই সঙ্গে কোনো আন্তর্জাতিক জোটে সম্পৃক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে দেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থ বিবেচনা করাও জরুরি।

ব্রিকসের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্ভাব্য সম্পৃক্ততা তাই শুধু একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে আমন্ত্রণ বা সদস্যপদের প্রশ্ন নয়; এটি দেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক অবস্থানের সঙ্গেও সম্পর্কিত। আর ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে সমমর্যাদা ও পারস্পরিক সম্মানের ওপর জোর দেওয়ার বক্তব্যও বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

সব মিলিয়ে স্পিকারের বক্তব্যে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে মর্যাদা ও সমতার প্রশ্নের পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরে রাজনৈতিক ঐকমত্য ও সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা গুরুত্ব পেয়েছে। ব্রিকসের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক কোন পর্যায়ে যাবে, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক কোন কাঠামোয় এগোবে এবং জুলাই সনদসহ সংস্কার বাস্তবায়নে রাজনৈতিক দলগুলো কতটা ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারবে—এসব প্রশ্নের উত্তরই আগামী দিনের বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক গতিপথে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত