রুশ ড্রোন হামলা, অল্পের জন্য রক্ষা বরিস জনসন

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৩৫ বার
রুশ ড্রোন হামলা, অল্পের জন্য রক্ষা বরিস জনসন

প্রকাশ: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ইউক্রেনের পশ্চিমাঞ্চলে পোল্যান্ড সীমান্তের কাছাকাছি একটি রেলপথে রুশ ড্রোন হামলায় অল্পের জন্য বড় বিপদ থেকে রক্ষা পেয়েছেন যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন। হামলার কয়েক মিনিট আগেই একই রেলপথ দিয়ে যাওয়া একটি ট্রেনের যাত্রীদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। হামলায় একটি ট্রেনের ইঞ্জিন ক্ষতিগ্রস্ত হলেও কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।

ঘটনাটি এমন এক সময়ে ঘটেছে, যখন রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে দেশটির গুরুত্বপূর্ণ রেল অবকাঠামোতে হামলা বাড়ছে। ২০২২ সালে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরুর পর ইউক্রেনের আকাশপথ কার্যত বন্ধ থাকায় দেশের অভ্যন্তরে এবং আন্তর্জাতিক সীমান্তে মানুষের চলাচলের অন্যতম প্রধান মাধ্যম হয়ে উঠেছে রেল যোগাযোগ। ফলে রেলপথে হামলা সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার পাশাপাশি কূটনৈতিক ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগের জন্যও বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে।

ইউক্রেনের রেল কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, পোল্যান্ড সীমান্তের কাছাকাছি ইয়াহোদিন এলাকায় একটি ট্রেনে রুশ ড্রোন আঘাত হানে। এতে ট্রেনটির ইঞ্জিন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। হামলার সময় ট্রেনটি স্টেশনে অবস্থান করছিল। তবে হামলার মাত্র ১৫ মিনিট আগে ওই ট্রেনের যাত্রীদের সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। ফলে বড় ধরনের প্রাণহানি এড়ানো সম্ভব হয়েছে।

এই হামলার সঙ্গে বরিস জনসনের ইউক্রেন সফরের বিষয়টি বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে। কিয়েভে অনুষ্ঠিত একটি নিরাপত্তা সম্মেলনে অংশ নেওয়ার পর জনসন, যুক্তরাজ্যের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জোনাথন পাওয়েল এবং ইউরোপের কয়েকটি দেশের নিরাপত্তা কর্মকর্তারা রেলপথে পোল্যান্ডের দিকে ফিরছিলেন। তবে হামলার শিকার ট্রেনটিতে তারা ছিলেন না। সময়সূচিতে পরিবর্তন এবং রুশ হামলার ধারাবাহিক হুমকির কারণে তাদের বহনকারী কূটনৈতিক ট্রেনটি নির্ধারিত সময়ের আগেই স্টেশন ছেড়ে যায় বলে জানিয়েছে ইউক্রেনের রাষ্ট্রীয় রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ।

ফলে যে ট্রেনটি পরে রুশ ড্রোন হামলার শিকার হয়, সেটি থেকে যাত্রীদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। ঘটনাটি এমন একটি পরিস্থিতির চিত্র তুলে ধরে, যেখানে কয়েক মিনিটের ব্যবধানও মানুষের জীবন-মৃত্যুর পার্থক্য গড়ে দিতে পারে।

ইউক্রেনের রেল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, হামলায় জেটচালিত একটি ড্রোন ব্যবহার করা হয়েছে। পোল্যান্ড ও ইউক্রেনের কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, ড্রোনটি যেখানে আঘাত হানে, সেটি পোল্যান্ড সীমান্ত থেকে মাত্র দুই কিলোমিটার দূরে। অর্থাৎ হামলার স্থানটি ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ন্যাটোর সদস্য পোল্যান্ডের সীমান্তের অত্যন্ত কাছাকাছি। এ কারণে ঘটনাটি নিয়ে শুধু কিয়েভ নয়, ওয়ারশ ও ইউরোপীয় নিরাপত্তা মহলেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

ইউক্রেনের রাষ্ট্রীয় রেলওয়ে সংস্থা জানিয়েছে, হামলার সময় ইয়াহোদিন স্টেশনে থাকা আরেকটি ট্রেনে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর পরিচালক ডেভিড পেট্রাউসও ছিলেন। তবে তিনি হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত ট্রেনে ছিলেন কি না, সে বিষয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদনে ভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে।

কিয়েভের সম্মেলনে অংশ নেওয়া সুইডেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী কার্ল বিল্টও ওই সময় রেলপথে যাত্রা করছিলেন। তিনি বিবিসিকে জানিয়েছেন, তাদের ট্রেন থামার পর যাত্রীদের নিরাপত্তার কারণে দ্রুত সরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে বলা হয়েছিল। কয়েক মিনিট পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে জানিয়ে তাদের আবার একই ট্রেনে যাত্রা চালিয়ে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়। পরে ট্রেনটি নিরাপদে পোল্যান্ড সীমান্তের দোরোহুস্ক স্টেশনে পৌঁছায়।

কিছু প্রতিবেদনে বরিস জনসন ও কার্ল বিল্ট একই ট্রেনে ছিলেন বলে উল্লেখ করা হলেও জনসন নিজে বিষয়টি নিশ্চিত করেননি। বরং ইউক্রেনের রেল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, জনসনসহ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা যে কূটনৈতিক ট্রেনে ছিলেন, সেটি সময়সূচির পরিবর্তনের কারণে হামলার শিকার ট্রেনটির আগে স্টেশন ছেড়ে যায়।

হামলার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিক্রিয়া জানান বরিস জনসন। তিনি রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সমালোচনা করে বলেন, পোল্যান্ড সীমান্তের কাছে দাঁড়িয়ে থাকা একটি লোকোমোটিভে হামলার পেছনে কী যুক্তি থাকতে পারে, তা তিনি বুঝতে পারছেন না। ইউক্রেনে প্রতিদিনের হামলাকে তিনি অর্থহীন বলে উল্লেখ করেন এবং দেশটির জন্য দ্রুত আরও আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সরবরাহের আহ্বান জানান।

জনসনের এই বক্তব্যের সঙ্গে ইউক্রেনের দীর্ঘদিনের দাবিও মিলে যায়। রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা মোকাবিলায় ইউক্রেন তার পশ্চিমা মিত্রদের কাছে আরও বেশি আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা চেয়ে আসছে। কিয়েভের দাবি, যুদ্ধ যত দীর্ঘ হচ্ছে, রাশিয়া তত বেশি দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও জেটচালিত ড্রোন ব্যবহার করছে। এসব হামলার লক্ষ্য অনেক সময় সামরিক স্থাপনা হলেও রেলপথ, জ্বালানি অবকাঠামো ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বেসামরিক অবকাঠামোও হামলার আওতায় আসছে।

ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রি সিবিহা এই হামলাকে বর্বরতা হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তার ভাষায়, রাশিয়ার হামলা এখন ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ন্যাটোর সীমান্তের খুব কাছাকাছি এসে পৌঁছেছে। তিনি মস্কোর বিরুদ্ধে আরও কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপের আহ্বান জানান।

ঘটনার পর পোল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্কও পরিস্থিতি পর্যালোচনার জন্য জরুরি বৈঠক আহ্বান করেন। তিনি রাশিয়ার সামরিক তৎপরতাকে উদ্বেগজনক হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, সীমান্তের কাছে এ ধরনের ঘটনা আর শুধু ইউক্রেনের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

পোল্যান্ডের উদ্বেগের পেছনে সাম্প্রতিক যুদ্ধের বিস্তৃত প্রভাবও রয়েছে। ইউক্রেনের পশ্চিমাঞ্চল পোল্যান্ডের সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত হওয়ায় এই অঞ্চলের রেলপথ যুদ্ধকালীন সময়ে গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহ ও যাতায়াত করিডোর হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। সামরিক সরঞ্জাম, মানবিক সহায়তা এবং সাধারণ মানুষের চলাচলেও এসব রেলপথের গুরুত্ব রয়েছে। ফলে সীমান্তের কাছাকাছি রেল অবকাঠামোতে হামলা হলে তার প্রভাব ইউক্রেনের সীমানা ছাড়িয়ে ইউরোপের নিরাপত্তা ব্যবস্থাতেও পড়তে পারে।

রাশিয়া অবশ্য জানিয়েছে, তারা পশ্চিম ইউক্রেনের রেল অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। মস্কোর বক্তব্য অনুযায়ী, ইউক্রেনের সামরিক সরঞ্জাম ও রসদ পরিবহনে রেল নেটওয়ার্ক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অন্যদিকে কিয়েভের অভিযোগ, রাশিয়া পরিকল্পিতভাবে বেসামরিক অবকাঠামো এবং মানুষের যাতায়াত ব্যবস্থাকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে।

যুদ্ধের শুরু থেকেই ইউক্রেনের রেলওয়ে ব্যবস্থা এক ধরনের জীবনরেখায় পরিণত হয়েছে। আকাশপথ বন্ধ থাকায় দীর্ঘ দূরত্বে যাতায়াতের জন্য লাখ লাখ মানুষ রেলের ওপর নির্ভরশীল। যুদ্ধের প্রথম দিকের ভয়াবহ দিনগুলোতে লাখ লাখ মানুষকে নিরাপদ অঞ্চলে সরিয়ে নিতেও রেল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। বর্তমানে আন্তর্জাতিক প্রতিনিধি, সাংবাদিক, ত্রাণকর্মী এবং বিদেশি কর্মকর্তাদের ইউক্রেনে প্রবেশ ও বের হওয়ার ক্ষেত্রেও রেল যোগাযোগ গুরুত্বপূর্ণ।

এই বাস্তবতায় একটি ট্রেনে ড্রোন হামলা শুধু একটি অবকাঠামো ক্ষতির ঘটনা নয়; এটি যুদ্ধের ঝুঁকি কীভাবে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন যাতায়াতের সঙ্গে মিশে গেছে, তারও উদাহরণ। বরিস জনসনসহ ইউরোপীয় কর্মকর্তাদের বহনকারী ট্রেনটি কয়েক মিনিট আগে চলে যাওয়ায় বড় ধরনের বিপর্যয় এড়ানো সম্ভব হয়েছে। কিন্তু একই সময়ে ক্ষতিগ্রস্ত ট্রেনের যাত্রীদের সরিয়ে নেওয়ার ঘটনা দেখিয়ে দিয়েছে, ইউক্রেনের রেলপথে ভ্রমণ এখনও কতটা অনিশ্চিত ও ঝুঁকিপূর্ণ।

রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে যুদ্ধ বন্ধের কোনো স্থায়ী সমাধান এখনো দৃশ্যমান না হওয়ায় এ ধরনের হামলার আশঙ্কাও থাকছে। বিশেষ করে ইউক্রেনের পশ্চিমাঞ্চলে পোল্যান্ড সীমান্তের কাছাকাছি কোনো হামলা ঘটলে তা শুধু কিয়েভ-মস্কো সংঘাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে ইউরোপীয় নিরাপত্তার বৃহত্তর প্রশ্ন সামনে আনতে পারে।

বরিস জনসন অক্ষত থাকলেও ঘটনাটি ইউক্রেন যুদ্ধের একটি কঠিন বাস্তবতা আবার সামনে এনেছে—যুদ্ধক্ষেত্রের কয়েক মিনিটের দূরত্ব কখনো কখনো কূটনীতিক, সাধারণ যাত্রী ও আন্তর্জাতিক নেতাদের জীবনকে একই ঝুঁকির মধ্যে এনে দাঁড় করায়। রেলপথে চলাচলরত মানুষদের জন্য সেই অনিশ্চয়তা এখন ইউক্রেনের যুদ্ধকালীন জীবনেরই অংশ হয়ে উঠেছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত