প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
রাশিয়ায় আসন্ন পার্লামেন্ট নির্বাচনকে ঘিরে দেশটির রাজনৈতিক ব্যবস্থার একটি পুরোনো কিন্তু ক্রমশ তীব্র হয়ে ওঠা বৈপরীত্য আবারও সামনে এসেছে। একদিকে প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের নেতৃত্বাধীন ক্ষমতাসীন কাঠামো রাজনৈতিক ও প্রশাসনিকভাবে এতটাই শক্তিশালী যে নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা খুব একটা দেখা যাচ্ছে না। অন্যদিকে, সেই নির্বাচন আয়োজন এবং জনগণের সমর্থনের একটি দৃশ্য তৈরি করা ক্রেমলিনের জন্য এখনও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই দ্বৈত বাস্তবতাই রাশিয়ার ‘ম্যানেজড ডেমোক্রেসি’ বা নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
রাশিয়ার ৪৫০ আসনের স্টেট ডুমার নির্বাচন আগামী ১৮ থেকে ২০ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। ২০২২ সালে ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরুর পর এটিই প্রথম জাতীয় পার্লামেন্ট নির্বাচন। ক্ষমতাসীন ইউনাইটেড রাশিয়া দল নির্বাচনে আধিপত্য ধরে রাখবে—এমন প্রত্যাশাই প্রবল। ফলে ভোটের ফল কে জিতবে, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে নির্বাচনের মাধ্যমে ক্রেমলিন কতটা জনসমর্থনের চিত্র তুলে ধরতে পারে এবং যুদ্ধের পঞ্চম বছরে রুশ সমাজের প্রকৃত মনোভাব কতটা ভোটের মধ্যে প্রতিফলিত হয়।
রাশিয়ার রাজনৈতিক ব্যবস্থায় নির্বাচন পুরোপুরি বাতিল করে দেওয়ার প্রয়োজন পুতিন সরকারের নেই। বরং নির্বাচনকে সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক বৈধতার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। ভোটের আয়োজনের মধ্য দিয়ে সরকার জনগণের কাছ থেকে অনুমোদন পেয়েছে—এমন একটি বার্তা দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তুলে ধরা সম্ভব। কিন্তু এই প্রক্রিয়ায় প্রকৃত প্রতিদ্বন্দ্বিতা সীমিত হয়ে গেলে নির্বাচনকে ঘিরে প্রশ্নও বাড়ে।
সাম্প্রতিক সময়ে উদারপন্থি ও যুদ্ধবিরোধী ইয়াবলোকো দলের নির্বাচনী অংশগ্রহণ বাতিলের ঘটনাটি সেই প্রশ্নকে আরও সামনে এনেছে। রাশিয়ার সুপ্রিম কোর্ট আগস্টে স্টেট ডুমা নির্বাচনে দলটির ফেডারেল তালিকার নিবন্ধন বাতিল করে। এর আগে কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশন দলটির তালিকা অনুমোদন করেছিল। পরে রডিনা নামের একটি রাজনৈতিক দলের করা মামলার পর আদালতের সিদ্ধান্তে ইয়াবলোকো নির্বাচনী প্রতিযোগিতা থেকে বাদ পড়ে।
ইয়াবলোকো রাশিয়ার সবচেয়ে শক্তিশালী রাজনৈতিক দল নয়। দীর্ঘদিন ধরেই দলটি জাতীয় পর্যায়ে সীমিত প্রভাবের মধ্যে রয়েছে। সর্বশেষ ২০০৭ সালে দলটি স্টেট ডুমায় প্রতিনিধিত্ব পেয়েছিল। এরপর থেকে জাতীয় সংসদে দলটির উপস্থিতি নেই। তবু বর্তমান পরিস্থিতিতে দলটির রাজনৈতিক অবস্থান তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ ইয়াবলোকো ইউক্রেন যুদ্ধের বিরোধিতা করে এবং শান্তি, কূটনীতি ও যুদ্ধবিরতির পক্ষে অবস্থান নেয়। দলটির নির্বাচনী কর্মসূচিতে শান্তি ও স্বাধীনতার আহ্বানকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
এই কারণেই দলটির নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ বাতিল হওয়াকে শুধু একটি ছোট রাজনৈতিক দলের পরাজয় হিসেবে দেখছেন না বিশ্লেষকেরা। বরং যুদ্ধের পঞ্চম বছরে রুশ নাগরিকদের সামনে একটি প্রকাশ্য যুদ্ধবিরোধী রাজনৈতিক বিকল্প কতটা দৃশ্যমান থাকতে পারে, সেই প্রশ্নের সঙ্গে বিষয়টি যুক্ত হয়ে গেছে। রাশিয়ার বর্তমান পার্লামেন্টে থাকা প্রধান দলগুলো সরকারের সামগ্রিক যুদ্ধনীতির বিরোধিতা করছে না। ফলে ইয়াবলোকোর মতো একটি দল নির্বাচনী ব্যালটে না থাকায় ভোটারদের সামনে যুদ্ধের বিষয়ে ভিন্ন রাজনৈতিক অবস্থান প্রকাশের সুযোগ আরও সীমিত হয়েছে।
ইয়াবলোকোর বিরুদ্ধে আদালতে বিভিন্ন অভিযোগও উত্থাপন করা হয়েছিল। এর মধ্যে বিদেশি অর্থায়ন, নিষিদ্ধ বা সীমিত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণা এবং নির্বাচনী প্রচারসামগ্রী নিয়ে বিভিন্ন অভিযোগ ছিল। দলটি এসব অভিযোগের বিরুদ্ধে আপত্তি জানিয়েছে এবং নির্বাচনী তালিকা বাতিলের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নিয়েছে। দলটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, নির্বাচনী তালিকা অনুমোদনের আগে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় নথিপত্র যাচাই করেছিল।
রাশিয়ায় বিরোধী রাজনীতির পরিসর সংকুচিত হওয়ার সঙ্গে ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবও ক্রমশ দৃশ্যমান হচ্ছে। যুদ্ধের শুরুতে রুশ সরকার সামরিক অভিযানকে দেশের সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন থেকে অনেকটা দূরে রাখার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু সময় গড়ানোর সঙ্গে ইউক্রেনীয় ড্রোন ও দূরপাল্লার হামলা রাশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে পৌঁছেছে। অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনা, নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ এবং সামরিক নিয়োগের চাপ অনেক সাধারণ নাগরিকের কাছে যুদ্ধকে আরও বাস্তব করে তুলেছে।
সম্প্রতি রাশিয়ায় যুদ্ধ নিয়ে জনমনে উদ্বেগের কথাও বিভিন্ন জরিপ ও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। ইউক্রেনের হামলার পাশাপাশি নতুন করে সেনা নিয়োগ বা ভবিষ্যতে বড় ধরনের সামরিক সমাবেশের আশঙ্কা নিয়েও কিছু মানুষের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। একই সময়ে মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি পরিস্থিতি ও অর্থনৈতিক চাপও রুশ সমাজের ওপর প্রভাব ফেলছে। যুদ্ধের দীর্ঘস্থায়িত্বের কারণে রাষ্ট্রীয় প্রচারণার পাশাপাশি মানুষের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাও রাজনৈতিক মনোভাব গঠনে ভূমিকা রাখছে।
রুশ সামরিক বাহিনীর হতাহতের প্রকৃত সংখ্যা স্বাধীনভাবে নির্ধারণ করা কঠিন। বিভিন্ন পক্ষের হিসাবের মধ্যে বড় পার্থক্য রয়েছে। তবে পশ্চিমা ও ইউক্রেনীয় বিভিন্ন অনুমানে রাশিয়ার সামরিক ক্ষয়ক্ষতি অত্যন্ত বড় মাত্রায় পৌঁছেছে বলে দাবি করা হয়েছে। এ ধরনের অনুমান নিয়ে বিতর্ক থাকলেও যুদ্ধ যে রাশিয়ার জনসংখ্যা, অর্থনীতি ও নিরাপত্তাবোধের ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ তৈরি করেছে, তা ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে নির্বাচন ক্রেমলিনের জন্য শুধু সংসদ গঠনের প্রক্রিয়া নয়; এটি জনমত পরিমাপ এবং রাজনৈতিক বৈধতা প্রদর্শনেরও একটি মাধ্যম। ক্ষমতাসীন ইউনাইটেড রাশিয়া জয়ী হবে—এমন প্রত্যাশা থাকলেও ভোটারদের অংশগ্রহণ, ভোটের ব্যবধান এবং বিভিন্ন অঞ্চলে সমর্থনের মাত্রা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে যুদ্ধের প্রভাব যেসব অঞ্চলে বেশি অনুভূত হচ্ছে, সেসব এলাকার ভোটের প্রবণতা সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সংকেত দিতে পারে।
কারণ কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থায়ও জনসমর্থনের ধারণা পুরোপুরি অপ্রয়োজনীয় হয়ে যায় না। একটি সরকার যত বেশি নিজের জনপ্রিয়তার প্রমাণ হিসেবে নির্বাচন ব্যবহার করতে চায়, তত বেশি তাকে নিশ্চিত করতে হয় যে ভোটের ফলাফল কাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক বার্তা দিচ্ছে। কিন্তু ফলাফল যদি বাস্তব জনমতের সঙ্গে খুব বেশি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, তাহলে নির্বাচন উল্টো সরকারের দুর্বলতা ও অনিশ্চয়তার প্রশ্ন সামনে আনতে পারে।
এই কারণেই রাশিয়ার নির্বাচনী ব্যবস্থাকে অনেকে ‘নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্র’ হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। এখানে নির্বাচন আছে, রাজনৈতিক দল আছে, প্রচারণা আছে এবং ভোটাররাও ভোট দেন; কিন্তু কোন দল বা প্রার্থী কতটা কার্যকরভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন, তার ওপর রাষ্ট্রীয় ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের প্রভাব রয়েছে। ফলে নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক কাঠামো বজায় থাকলেও প্রকৃত রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার পরিসর সীমিত হয়ে যায়।
সাম্প্রতিক নির্বাচনী পরিস্থিতি নিয়ে রাশিয়ার বাইরে থেকেও বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ এসেছে। বিশ্লেষকেরা বলছেন, ইউনাইটেড রাশিয়ার সম্ভাব্য জয় পূর্বনির্ধারিত বলে মনে হলেও নির্বাচনের ফল পুরোপুরি অর্থহীন নয়। ভোটের উপস্থিতি, আঞ্চলিক ফলাফল এবং বিরোধী বা অসন্তুষ্ট ভোটের সম্ভাব্য গতিপথ রুশ সমাজের ভেতরের রাজনৈতিক প্রবণতা সম্পর্কে কিছু ধারণা দিতে পারে।
অন্যদিকে, বিরোধী কণ্ঠকে সীমিত করার পদক্ষেপগুলো সরকারের শক্তির পাশাপাশি তার উদ্বেগেরও ইঙ্গিত দিতে পারে। ইয়াবলোকোর মতো তুলনামূলক ছোট একটি দল যদি সামরিক সংঘাতের সময়ে ভোটারদের সামনে শান্তির বিকল্প তুলে ধরে, তাহলে সেটি নির্বাচনের ফল বদলে দেবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। কিন্তু এমন একটি রাজনৈতিক কণ্ঠকে ব্যালট থেকে সরিয়ে দেওয়া হলে যুদ্ধ নিয়ে সমাজের ভেতরে থাকা ভিন্নমত কতটা প্রকাশের সুযোগ পাচ্ছে, সেই প্রশ্ন আরও জোরালো হয়।
সব মিলিয়ে রাশিয়ার আসন্ন পার্লামেন্ট নির্বাচন পুতিনের ক্ষমতা কতটা দৃঢ়, শুধু সেই প্রশ্নের উত্তর দেবে না। একই সঙ্গে এটি দেখাবে, দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ, অর্থনৈতিক চাপ এবং রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রুশ জনগণের মনোভাব কোন দিকে যাচ্ছে। বাইরে থেকে রুশ রাষ্ট্রব্যবস্থাকে অত্যন্ত শক্তিশালী ও নিয়ন্ত্রণমূলক মনে হলেও বিরোধী মতের ওপর চাপ, যুদ্ধবিরোধী রাজনৈতিক শক্তির নির্বাচনী অংশগ্রহণ সীমিত করা এবং জনসমর্থনের দৃশ্যমান প্রমাণ তৈরির প্রয়োজনীয়তা সেই ক্ষমতার ভেতরে থাকা উদ্বেগের কিছু ইঙ্গিতও দিতে পারে।
শেষ পর্যন্ত রাশিয়ার এই নির্বাচন কতটা জনগণের প্রকৃত রাজনৈতিক ইচ্ছা প্রতিফলিত করবে, সেটিই হবে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। কারণ একটি নির্বাচন কেবল ব্যালট বাক্সে ভোট দেওয়ার আয়োজন নয়; এটি নাগরিকদের ভিন্নমত প্রকাশের সুযোগও। সেই সুযোগ যত সংকুচিত হবে, নির্বাচনের আনুষ্ঠানিকতা এবং বাস্তব গণতান্ত্রিক প্রতিযোগিতার মধ্যকার দূরত্বও তত স্পষ্ট হয়ে উঠবে।