প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
সঞ্চয়পত্রের মুনাফা ও মূল টাকা পেতে ব্যাংক হিসাবের একটি সংখ্যা ভুল হওয়ার কারণে বিনিয়োগকারীদের দীর্ঘদিন ধরে যে ভোগান্তির মুখে পড়তে হতো, তা কমাতে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। জাতীয় সঞ্চয় স্কিম অনলাইন ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমে চালু হয়েছে স্বয়ংক্রিয় অ্যাকাউন্ট ভেরিফিকেশন সিস্টেম বা এভিএস। এর মাধ্যমে সঞ্চয়পত্র বা বন্ড কেনার সময় গ্রাহকের দেওয়া ব্যাংক হিসাব তাৎক্ষণিকভাবে যাচাই করা যাবে। ফলে ভুল হিসাব নম্বরের কারণে টাকা ফেরত আসা কিংবা ভুল হিসাবে অর্থ চলে যাওয়ার ঝুঁকি কমবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট তফসিলি ব্যাংকগুলোর সমন্বয়ে ১৫ সেপ্টেম্বর থেকে নতুন এই ব্যবস্থা কার্যকর হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের ‘স্ট্রেনদেনিং পাবলিক ফাইন্যান্সিয়াল ম্যানেজমেন্ট প্রোগ্রাম টু এনাবল সার্ভিস ডেলিভারি’ বা এসপিএফএমএস কর্মসূচির আওতায় এভিএস চালু করা হয়েছে। সরকারের জাতীয় সঞ্চয় ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর করার ধারাবাহিকতায় এটিকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করা মানুষের বড় একটি অংশ নির্দিষ্ট সময় পরপর মুনাফা পান এবং মেয়াদ শেষে মূল অর্থও ফেরত পান। এসব অর্থ বর্তমানে ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার বা ইএফটির মাধ্যমে বিনিয়োগকারীর ব্যাংক হিসাবে পাঠানো হয়। ফলে সঞ্চয়পত্র কেনার সময় ব্যাংক হিসাবের তথ্য সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এতদিন গ্রাহক যে হিসাব নম্বর দিতেন, সেটিই সরাসরি অনলাইন সিস্টেমে যুক্ত করা হতো। হিসাব নম্বরের কোনো একটি সংখ্যা ভুল হলেও সেটি আগে থেকে শনাক্ত করার স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা ছিল না।
এর ফলে মুনাফা বা মূল টাকা পাঠানোর সময় ইএফটি ফেরত আসার ঘটনা ঘটত। তখন সংশ্লিষ্ট বিনিয়োগকারীকে ব্যাংক হিসাবের তথ্য সংশোধন করতে হতো এবং পুনরায় অর্থ পাঠানোর প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হতো। এতে শুধু বিনিয়োগকারীর সময় ও অর্থের অপচয় হতো না, সংশ্লিষ্ট ইস্যু অফিস, জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তর এবং অন্যান্য সরকারি দপ্তরের ওপরও অতিরিক্ত কাজের চাপ তৈরি হতো।
আরও বড় উদ্বেগের বিষয় ছিল ভুল ব্যাংক হিসাব নম্বরের কারণে অর্থ ভুল ব্যক্তির হিসাবে চলে যাওয়ার সম্ভাবনা। নতুন এভিএস চালুর ফলে লেনদেন সম্পন্ন হওয়ার আগেই এ ধরনের ভুল বা অসামঞ্জস্য শনাক্ত করা সম্ভব হবে বলে আশা করছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
নতুন ব্যবস্থায় এনএসসি সিস্টেমে ব্যাংক হিসাব নম্বর দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বাংলাদেশ ব্যাংকের আইটি অবকাঠামো এবং সংশ্লিষ্ট তফসিলি ব্যাংকের মাধ্যমে হিসাবটি যাচাই করা হবে। প্রথমে দেখা হবে দেওয়া হিসাব নম্বরটি সঠিক ও সচল কি না। এরপর হিসাবধারীর পরিচয় যাচাই করা হবে। এ ক্ষেত্রে জাতীয় পরিচয়পত্র বা পাসপোর্ট নম্বরের সঙ্গে ব্যাংক হিসাবের তথ্য মিলিয়ে দেখা হবে। ফলে শুধু একটি হিসাব নম্বর সক্রিয় হলেই সেটি গ্রহণ করা হবে না; সেটি প্রকৃত বিনিয়োগকারীর পরিচয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, সেটিও যাচাই করা হবে।
এই ব্যবস্থা সঞ্চয়পত্র কেনার সময় যেমন ব্যবহার করা হবে, তেমনি পরবর্তী সময়ে ব্যাংক হিসাব পরিবর্তন বা সংশোধন করতে চাইলেও তাৎক্ষণিক যাচাই করা হবে। ফলে একজন বিনিয়োগকারী নতুন কোনো ব্যাংক হিসাব দিলে সেই হিসাবের বৈধতা ও মালিকানার তথ্যও আগের মতোই যাচাইয়ের আওতায় থাকবে।
বর্তমানে জাতীয় সঞ্চয় স্কিম অনলাইন ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমে বিপুলসংখ্যক বিনিয়োগকারীর তথ্য সংরক্ষিত রয়েছে। সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, এনএসসি সিস্টেমে নিবন্ধিত একক গ্রাহকের সংখ্যা ৩৯ লাখ ৪৬ হাজার ২২৪ জন। এত বিপুলসংখ্যক গ্রাহকের লেনদেন পরিচালনায় সামান্য একটি তথ্যগত ভুলও বড় ধরনের প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি করতে পারে। সেই জায়গায় স্বয়ংক্রিয় যাচাই ব্যবস্থা যুক্ত হওয়ায় সঞ্চয়পত্র ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তিগত সক্ষমতা আরও বাড়বে বলে মনে করা হচ্ছে।
প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১ লাখ ৭৫ হাজার ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফারের মাধ্যমে সঞ্চয়পত্রের বিনিয়োগকারীদের মুনাফা ও মূল অর্থ পরিশোধ করা হয়। একই সময়ে গড়ে প্রায় ৮ হাজার নতুন সঞ্চয়পত্র ইস্যু হচ্ছে। অর্থাৎ প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক আর্থিক লেনদেনের সঙ্গে গ্রাহকের ব্যাংক হিসাবের তথ্য জড়িত। এ অবস্থায় হিসাব নম্বর যাচাইয়ের স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা চালু হওয়ায় লেনদেনের নির্ভুলতা বাড়ানোর পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর কাজও সহজ হবে।
জাতীয় সঞ্চয় স্কিমের ১১টি স্কিমের মধ্যে বর্তমানে ৯টির লেনদেন ন্যাশনাল সেভিংস স্কিম অনলাইন ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরিচালিত হচ্ছে। এর আগে গ্রাহকের জাতীয় পরিচয়পত্র ও মোবাইল নম্বর যাচাইয়ের ব্যবস্থাও চালু ছিল। এবার সেই ব্যবস্থার সঙ্গে ব্যাংক হিসাব যাচাই যুক্ত হওয়ায় গ্রাহকের পরিচয় ও অর্থপ্রাপ্তির তথ্য যাচাইয়ের কাঠামো আরও শক্তিশালী হলো।
জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের প্রত্যাশা, এভিএস চালুর ফলে ভুল ব্যাংক হিসাব নম্বর এন্ট্রির হার প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে আসবে। এর ফলে ইএফটি ফেরত আসার ঘটনা কমবে এবং বিনিয়োগকারীদের প্রাপ্য অর্থ পাওয়ার ক্ষেত্রে বিলম্বও কমবে। একই সঙ্গে ভুল তথ্য সংশোধন, পুনরায় অর্থ পাঠানোসহ বিভিন্ন প্রশাসনিক কাজ কমে যাওয়ায় সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরের কর্মীদের ওপর চাপও কমবে।
একজন সাধারণ বিনিয়োগকারীর কাছে বিষয়টি হয়তো কেবল একটি প্রযুক্তিগত পরিবর্তন মনে হতে পারে। কিন্তু সঞ্চয়পত্রের মুনাফার ওপর নির্ভর করে সংসারের নিয়মিত ব্যয় চালানো অনেক মানুষের জন্য একটি ব্যাংক হিসাবে টাকা পৌঁছানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তি, পরিবারনির্ভর বিনিয়োগকারী কিংবা দীর্ঘদিনের সঞ্চয় দিয়ে সঞ্চয়পত্র কেনা মানুষের কাছে নির্ধারিত সময়ে মুনাফা না পাওয়া কিংবা টাকা ফেরত আসা মানে বাড়তি দুশ্চিন্তা ও দৌড়ঝাঁপ। নতুন ব্যবস্থা সেই ভোগান্তি কমানোর সুযোগ তৈরি করেছে।
অর্থ বিভাগের মতে, এভিএস জাতীয় সঞ্চয় স্কিমের ডিজিটাল সেবা আধুনিকায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এর মাধ্যমে সঞ্চয়পত্রের লেনদেন আরও নিরাপদ, স্বচ্ছ ও নির্ভরযোগ্য হবে। বিশেষ করে গ্রাহকের প্রাপ্য অর্থ যাতে সঠিক সময়ে সঠিক হিসাবধারীর ব্যাংক হিসাবে পৌঁছায়, সেটি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে নতুন প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে শুধু প্রযুক্তি চালু করলেই এর সুফল পুরোপুরি পাওয়া যাবে না। সংশ্লিষ্ট ব্যাংক ও সরকারি দপ্তরগুলোর মধ্যে তথ্য আদান-প্রদানের ব্যবস্থা নিরবচ্ছিন্ন রাখা, গ্রাহকের তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং কোনো কারিগরি সমস্যা দেখা দিলে দ্রুত সমাধানের ব্যবস্থা রাখাও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, সঞ্চয়পত্রের সঙ্গে লাখ লাখ মানুষের সঞ্চয় ও আর্থিক নিরাপত্তা জড়িয়ে রয়েছে।
সব মিলিয়ে সঞ্চয়পত্র ব্যবস্থাপনায় ব্যাংক হিসাব যাচাইয়ের এই স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতি বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি স্বস্তির খবর। এতদিন হিসাব নম্বরের ছোট একটি ভুল যেখানে মুনাফা বা মূল টাকা পেতে বাড়তি সময় ও ভোগান্তির কারণ হতো, এখন লেনদেনের আগেই সেই ভুল শনাক্ত করার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এর ফলে একদিকে যেমন বিনিয়োগকারীর অর্থ নিরাপদে পৌঁছানোর সম্ভাবনা বাড়বে, অন্যদিকে সরকারি সঞ্চয় ব্যবস্থাপনাও আরও দ্রুত, নির্ভুল ও প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে উঠবে।