দেশে সরবরাহ কম, ভারত থেকে ইলিশ আমদানি বাড়ছে

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১৩ বার
দেশে সরবরাহ কম, ভারত থেকে ইলিশ আমদানি বাড়ছে

প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ইলিশ বাংলাদেশের মানুষের কাছে শুধু একটি মাছ নয়, এটি দেশের নদী, জলজ পরিবেশ, অর্থনীতি ও বাঙালির খাদ্যসংস্কৃতির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে থাকা এক প্রতীক। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম প্রধান ইলিশ উৎপাদনকারী দেশ হিসেবে পরিচিত। একসময় দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও ইলিশ রপ্তানি করা হতো। অথচ সেই বাংলাদেশেই এখন অভ্যন্তরীণ বাজারের চাহিদা মেটাতে ভারত থেকে টনে টনে ইলিশ আমদানি হচ্ছে। বিষয়টি যেমন বিস্ময় তৈরি করেছে, তেমনি দেশের ইলিশ উৎপাদন, সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।

চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাস জুলাই ও আগস্টে যশোরের বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে ভারত থেকে সাড়ে তিন লাখ কেজির বেশি ইলিশ দেশে এসেছে। সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, ১৯টি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান প্রায় সাত কোটি টাকা মূল্যের ৩ লাখ ৫২ হাজার ৪৮৪ কেজি ইলিশ আমদানি করেছে। অন্যান্য সংশ্লিষ্ট হিসাবেও আমদানির পরিমাণ প্রায় একই পর্যায়ে রয়েছে। এসব মাছের বড় একটি অংশ এসেছে ভারতের গুজরাট থেকে। পশ্চিমবঙ্গ হয়ে পেট্রাপোল-বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে মাছগুলো বাংলাদেশে প্রবেশ করছে।

পশ্চিমবঙ্গের মাছ রপ্তানিকারকদের ভাষ্য অনুযায়ী, গত প্রায় দুই মাসে পশ্চিমবঙ্গ হয়ে প্রায় ৫০০ টন ইলিশ বাংলাদেশে রপ্তানি হয়েছে। এর বড় অংশই গুজরাট থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের দাবি। ফলে প্রশ্ন উঠছে, বাংলাদেশের ইলিশের মৌসুমেই কেন দেশের বাজারে বিদেশি ইলিশের প্রয়োজন তৈরি হলো?

এর পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে সামনে আসছে চাহিদা ও সরবরাহের ব্যবধান। বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, দেশে ইলিশের সরবরাহ কম থাকায় দাম তুলনামূলক বেশি। অন্যদিকে ভারতের কিছু অঞ্চলে, বিশেষ করে গুজরাটে, এ বছর ইলিশের জোগান বেড়েছে এবং সেখানে তুলনামূলক কম দামে মাছ পাওয়া যাচ্ছে। ফলে ব্যবসায়ীদের জন্য ভারত থেকে ইলিশ আমদানি করে বাংলাদেশের বাজারে বিক্রি করা লাভজনক হয়ে উঠেছে।

মৎস্য বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ব্যবসায়ীদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সীমিত পরিসরে ইলিশ আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়েছে। মৎস্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো. খালেদ কনক বলেছেন, ইলিশ আমদানি নিষিদ্ধ নয়। বাজারে ইলিশের সরবরাহ কম থাকায় ব্যবসায়ীদের আবেদনের ভিত্তিতে সীমিত পরিমাণে আমদানির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ বাজারের চাহিদা সামাল দিতেই আপাতত আমদানিকে একটি বিকল্প হিসেবে দেখা হচ্ছে।

আমদানিকারকদের হয়ে কাজ করা সিঅ্যান্ডএফ প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাও বলছেন, বাজারে চাহিদার তুলনায় ইলিশের সরবরাহ কম। ফলে ব্যবসায়ীরা বাধ্য হয়ে আমদানির দিকে ঝুঁকছেন। তাদের যুক্তি, লাভের সম্ভাবনা না থাকলে কোনো ব্যবসায়ী বিদেশ থেকে মাছ এনে ঝুঁকি নিতেন না।

তবে শুধু বাজারের সাময়িক সংকট নয়, এর পেছনে দেশের ইলিশ উৎপাদন কমে যাওয়ার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। প্রায় দুই দশক ধরে বাংলাদেশে ইলিশ উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে বাড়লেও গত তিন বছর ধরে সেই প্রবণতায় ছেদ পড়েছে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে দেশে ৫ লাখ ৭১ হাজার টন ইলিশ উৎপাদিত হয়েছিল। পরের অর্থবছরে তা কমে ৫ লাখ ২৯ হাজার টনে নেমে আসে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে উৎপাদন আরও কমে দাঁড়ায় প্রায় ৫ লাখ ৪ হাজার টনে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের চূড়ান্ত হিসাব না পাওয়া গেলেও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ধারণা, উৎপাদন পাঁচ লাখ টনের নিচে নেমে যেতে পারে।

উৎপাদনের পাশাপাশি ইলিশের গড় ওজন কমে যাওয়ার বিষয়টিও গবেষকদের উদ্বিগ্ন করছে। ইলিশ গবেষকদের মতে, নদীদূষণ, নিষিদ্ধ কারেন্ট জালে জাটকা নিধন, অনিয়ন্ত্রিত বালু উত্তোলন এবং নদী ও সাগরে ক্ষতিকর উপায়ে মাছ ধরার কারণে ইলিশের স্বাভাবিক জীবনচক্র বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। সাগর থেকে নদীতে ইলিশের আসার যে স্বাভাবিক পথ বা মাইগ্রেটরি রুট রয়েছে, সেটিও বিভিন্ন কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

ইলিশের প্রজনন ও বেড়ে ওঠার ক্ষেত্রেও পরিবেশগত চাপ তৈরি হয়েছে। নদী ও জলাশয়ে দূষণ, কীটনাশকের ব্যবহার এবং বিভিন্ন ধরনের অনিয়ন্ত্রিত কর্মকাণ্ড মাছটির প্রজননক্ষেত্রকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে। ফলে শুধু মাছ ধরার পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করলেই সমস্যার সমাধান হবে না; ইলিশের পুরো জীবনচক্র এবং বিচরণক্ষেত্রকে নিরাপদ রাখার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে।

অন্যদিকে ভারত থেকে আমদানি করা ইলিশের দাম তুলনামূলক কম হওয়ায় ব্যবসায়ীদের আগ্রহ আরও বাড়ছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও আমদানিকারকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ভারত থেকে আসা ইলিশের ক্রয়মূল্য সর্বোচ্চ কেজিপ্রতি প্রায় দুই ডলার বা তারও কম হতে পারে। এর সঙ্গে কাস্টমস, পরিবহন ও অন্যান্য ব্যয় যোগ হলেও দেশের বাজারে একই আকারের ইলিশের তুলনায় আমদানি করা মাছের দাম অনেক ক্ষেত্রে কম থাকে। ফলে সরবরাহ ঘাটতির বাজারে আমদানিকারকদের জন্য এটি একটি আকর্ষণীয় ব্যবসায়িক সুযোগ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ঢাকার বাজারের চিত্রেও ইলিশের উচ্চমূল্যের বিষয়টি স্পষ্ট। ৫০০ গ্রামের বেশি ওজনের ইলিশের দাম প্রায় ১ হাজার ৬০০ টাকা, এক কেজির বেশি ওজনের মাছের দাম প্রায় ২ হাজার ৮০০ টাকা পর্যন্ত চাওয়া হচ্ছে। ৮০০ থেকে ৯০০ গ্রামের মাছ বিক্রি হচ্ছে প্রায় ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৪০০ টাকা এবং ৭০০ গ্রামের ইলিশের দাম প্রায় ১ হাজার ৮০০ টাকার কাছাকাছি। ফলে সাধারণ ভোক্তার কাছে ইলিশ এখনও অনেকটা বিলাসী খাদ্যপণ্যে পরিণত হয়েছে।

বাংলাদেশের মৎস্য খাতে ইলিশের গুরুত্বও অনেক। মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট মৎস্য উৎপাদনের প্রায় ১২ শতাংশ আসে ইলিশ থেকে। বিশ্বে উৎপাদিত ইলিশের বড় অংশই বাংলাদেশে উৎপাদিত হয়। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের হিসাবে এই অংশ ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পদের উৎপাদন কমতে থাকায় বিষয়টি শুধু বাজারদর বা ভোক্তার সমস্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না; এটি জাতীয় অর্থনীতি ও মৎস্যসম্পদ ব্যবস্থাপনার সঙ্গেও যুক্ত হয়ে যাচ্ছে।

ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে ২০২০ সালে ছয় বছর মেয়াদি একটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল। প্রকল্পটিতে প্রায় ৪০০ কোটি টাকা ব্যয়ের পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু কয়েক বছর পরও উৎপাদন কমতে থাকায় প্রকল্পটির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও এখন প্রকল্পের বাস্তবায়ন, সম্ভাব্য গাফিলতি এবং ইলিশ উৎপাদন কমে যাওয়ার প্রকৃত কারণগুলো পর্যালোচনার প্রয়োজনীয়তার কথা বলছেন।

এদিকে ভারতের গুজরাটে ইলিশের জোগান বৃদ্ধিও বাংলাদেশের আমদানির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের মতে, গুজরাটের ভারুচ ও আশপাশের এলাকায় সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইলিশের উৎপাদন ভালো হচ্ছে। নর্মদা নদী সাগরে মিশেছে এমন অঞ্চলগুলোতে ইলিশের প্রাপ্যতা বেশি। ফলে স্থানীয় বাজারে সরবরাহ বেড়ে যাওয়ায় দাম তুলনামূলক কম থাকছে এবং সেখান থেকে মাছ পশ্চিমবঙ্গ হয়ে বাংলাদেশে আসছে।

ব্যবসায়ীদের তথ্য অনুযায়ী, গুজরাটের ইলিশের একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো বড় আকারের মাছের পাশাপাশি ডিমওয়ালা ইলিশের প্রাপ্যতা। বাংলাদেশে ইলিশের ডিমেরও চাহিদা রয়েছে। এমনকি ইলিশের ডিম প্রক্রিয়াজাত ও প্যাকেটজাত করে বিদেশে পাঠানোর বাজারও রয়েছে। ফলে গুজরাটের মাছের জন্য বাংলাদেশে একটি নির্দিষ্ট বাজার তৈরি হয়েছে।

তবে ভারত থেকে ইলিশ আমদানির বিষয়টি বাংলাদেশের জন্য কিছুটা প্রতীকী বাস্তবতাও সামনে আনছে। যে দেশ একসময় নিজের ইলিশ দিয়ে বিদেশের বাজারে পরিচিত ছিল, সেই দেশেই এখন অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণে বিদেশি ইলিশের ওপর নির্ভরতা তৈরি হচ্ছে। একই সময়ে বাংলাদেশ গত অর্থবছরে ইলিশ রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রাও পূরণ করতে পারেনি। প্রায় ১ হাজার ২০০ টন রপ্তানির লক্ষ্য থাকলেও রপ্তানির পরিমাণ ১১০ টনেরও নিচে নেমে আসে বলে কর্মকর্তাদের হিসাবে জানা গেছে।

এই পরিস্থিতি দেখাচ্ছে, ইলিশের সংকট কেবল বাজারে মাছ কম থাকার সমস্যা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে নদী ও সাগরের পরিবেশ, মাছের প্রজননক্ষেত্র, জাটকা সংরক্ষণ, অবৈধ ও ক্ষতিকর জাল ব্যবহার, নদীপথের পরিবর্তন এবং মৎস্যসম্পদ ব্যবস্থাপনার দীর্ঘমেয়াদি দুর্বলতা। বাজারে বিদেশি ইলিশ এনে সাময়িকভাবে চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হলেও এতে দেশের ইলিশ উৎপাদনের মূল সমস্যার সমাধান হবে না।

তাই বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্টদের মতে, ইলিশের উৎপাদন কমার প্রকৃত কারণ দ্রুত চিহ্নিত করা জরুরি। নদী ও ইলিশের প্রজননক্ষেত্র দূষণমুক্ত রাখা, জাটকা নিধন বন্ধ করা, ইলিশের মাইগ্রেটরি রুট সুরক্ষিত করা এবং ক্ষতিকর মাছ ধরার পদ্ধতি বন্ধ করার পাশাপাশি আগের প্রকল্পগুলোর কার্যকারিতাও মূল্যায়ন করতে হবে। একই সঙ্গে বাজারে দেশি ও আমদানি করা ইলিশের উৎস সম্পর্কে ভোক্তাদের সঠিক তথ্য নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।

কারণ, ভারত থেকে কয়েক লাখ কেজি ইলিশ আমদানি করে বাজারের সাময়িক সংকট মোকাবিলা করা গেলেও বাংলাদেশের ইলিশের ভবিষ্যৎ নিরাপদ হবে তখনই, যখন নদী-সাগরে ইলিশের স্বাভাবিক জীবনচক্র ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে। দেশের মানুষের প্রিয় এই মাছকে শুধু বাজারের পণ্য হিসেবে নয়, জাতীয় মৎস্যসম্পদের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করে দীর্ঘমেয়াদি ও কার্যকর ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত