প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
কক্সবাজারের দ্বীপ উপজেলা কুতুবদিয়ায় পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যুর ঘটনা যেন থামছেই না। মাত্র পাঁচ দিনের ব্যবধানে চার শিশুর মৃত্যুতে পুরো উপজেলায় উদ্বেগ ও শোকের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে মঙ্গলবার সকালেই ১৯ মাস বয়সী নাবিলা নামের এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর আগে চার দিনের ব্যবধানে আরও তিন শিশুর প্রাণ গেছে পুকুরের পানিতে। চলতি মাসের শুরুতেও পানিতে ডুবে আরও এক শিশুর মৃত্যু হয়েছিল।
মঙ্গলবার সকালে দক্ষিণ ধুরুং ইউনিয়নের ওলীপাড়া এলাকায় ঘটে সর্বশেষ মর্মান্তিক ঘটনাটি। নিহত নাবিলা ওই এলাকার জিয়াবুলের মেয়ে। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, সকাল ৮টার দিকে শিশুটির মা রান্নার কাজে ব্যস্ত ছিলেন। সেই সময় কোনো এক ফাঁকে নাবিলা বাড়ির পাশের পুকুরের দিকে চলে যায়। পরিবারের সদস্যরা বিষয়টি বুঝে ওঠার আগেই শিশুটি পানিতে তলিয়ে যায়।
পরে তাকে উদ্ধার করে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হয়। কিন্তু চিকিৎসকেরা শিশুটিকে মৃত ঘোষণা করেন। মাত্র ১৯ মাস বয়সী একটি শিশুর এমন আকস্মিক মৃত্যুতে পরিবার ও স্বজনদের মধ্যে নেমে আসে শোকের ছায়া। যে বয়সে একটি শিশু মায়ের আঁচল ধরে হাঁটতে শেখে, পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে খেলাধুলা করে সময় কাটায়, সেই বয়সেই পানির নিচে তার জীবন থেমে গেল।
নাবিলার মৃত্যুর কয়েক দিন আগেও একই উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় পরপর তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। গত রোববার উত্তর ধুরুং ইউনিয়নের কুইল্যার পাড়ায় পানিতে ডুবে মারা যায় দুই বছর বয়সী আইমন। সে ওই এলাকার খোকনের মেয়ে। এর আগের দিন শনিবার লেমশীখালী ইউনিয়নের হাবিব হাজির পাড়ায় পুকুরের পানিতে ডুবে প্রাণ হারায় দুই বছর বয়সী জিয়াদ। সে রুবেলের ছেলে।
এরও এক দিন আগে শুক্রবার আলী আকবর ডেইল ইউনিয়নের ঘাটকুল পাড়ায় পানিতে ডুবে মারা যায় চার বছর বয়সী মিশু। মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে চার শিশুর এমন মৃত্যু স্থানীয় মানুষের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক তৈরি করেছে। ছোট ছোট শিশুদের স্বাভাবিক খেলাধুলার জায়গার পাশেই থাকা পুকুর, ডোবা কিংবা জলাশয় যে কতটা প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে, একের পর এক দুর্ঘটনা সেই বাস্তবতাই সামনে আনছে।
শুধু গত পাঁচ দিনের হিসাবেই নয়, চলতি মাসের শুরুতেও কুতুবদিয়ায় পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। ৪ সেপ্টেম্বর বড়ঘোপ ইউনিয়নের মুরালিয়া গ্রামে নিজাম উদ্দিনের তিন বছর বয়সী মেয়ে তাকওয়া পানিতে ডুবে মারা যায়। ফলে সেপ্টেম্বরের প্রথম দুই সপ্তাহেই একাধিক শিশুর এমন মৃত্যু স্থানীয়দের মধ্যে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
কুতুবদিয়ার ভৌগোলিক ও সামাজিক বাস্তবতায় পুকুর ও জলাশয় মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। উপজেলার অনেক বাড়ির আশপাশেই রয়েছে পুকুর, ডোবা কিংবা অন্যান্য জলাশয়। এসব জলাশয়ের পানি গোসল, গৃহস্থালির বিভিন্ন কাজ কিংবা মাছ চাষে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু অধিকাংশ পুকুরের চারপাশে পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা না থাকায় ছোট শিশুদের জন্য এগুলো সহজেই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে।
দক্ষিণ ধুরুং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আলাউদ্দিন আল আজাদ বলেন, উপজেলার প্রায় সব বাড়িতেই পুকুর বা জলাশয় রয়েছে। কিন্তু এসব পুকুরের সিংহভাগে ঘেরা বেড়া নেই। ফলে শিশুরা খেলতে খেলতে কখন যে পানির কাছে চলে যায়, অনেক সময় পরিবারের সদস্যরা তা বুঝতেই পারেন না। তাঁর মতে, শিশুদের নিরাপত্তার জন্য অভিভাবকদের আরও সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।
শিশুদের ক্ষেত্রে কয়েক মিনিটের অসতর্কতাও যে ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে, কুতুবদিয়ার সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো তারই নির্মম উদাহরণ। বিশেষ করে দুই থেকে চার বছর বয়সী শিশুরা নিজেরা বিপদের মাত্রা বুঝতে পারে না। তারা কৌতূহলবশত বাড়ির উঠান থেকে বেরিয়ে পাশের পুকুর বা ডোবার কাছে চলে যেতে পারে। সাঁতার না জানার কারণে পানিতে পড়ে গেলে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই দুর্ঘটনা প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে।
কুতুবদিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. গোলাম মারুফ জানিয়েছেন, চলতি মাসের শুরু থেকেই পানিতে ডুবে মৃত্যুর ঘটনা বেড়েছে। গত পাঁচ দিনে চার শিশুর মৃত্যু বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। এ ধরনের দুর্ঘটনা ঠেকাতে প্রতিটি ওয়ার্ডে সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন করা হলেও মানুষের মধ্যে বিষয়টির গুরুত্ব প্রত্যাশিত মাত্রায় তৈরি হয়নি বলে মনে করছেন তিনি।
স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের মতে, শুধু দুর্ঘটনার পর চিকিৎসা দেওয়ার প্রস্তুতি থাকলেই সমস্যার সমাধান হবে না। শিশুরা যাতে পানির কাছেই যেতে না পারে, সেই পরিবেশ তৈরি করাই সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরোধ ব্যবস্থা। বাড়ির আশপাশের পুকুরের চারপাশে বেড়া দেওয়া, শিশুদের একা বাইরে যেতে না দেওয়া এবং পানির কাছে খেলাধুলার সুযোগ বন্ধ করা গেলে ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
কুতুবদিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মাহবুবুল হকও সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোকে আশঙ্কাজনক বলে উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে, ছোট শিশুরা খেলতে খেলতে কখন কোথায় চলে যাচ্ছে, সেদিকে অভিভাবকদের নিয়মিত নজর রাখা জরুরি। একই সঙ্গে বাড়ির পাশের পুকুর, ডোবা ও অন্যান্য জলাশয়ে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
একটি শিশুর মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের সদস্য হারানোর ঘটনা নয়; এর সঙ্গে একটি পরিবারের ভবিষ্যৎ, স্বপ্ন ও অসংখ্য স্মৃতি জড়িয়ে থাকে। কুতুবদিয়ায় পরপর শিশু মৃত্যুর ঘটনাগুলো তাই শুধু বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা হিসেবে দেখলে চলবে না। প্রতিটি ঘটনার পর একই ধরনের ঝুঁকি কোথায় রয়েছে, কেন দুর্ঘটনা ঘটছে এবং কীভাবে তা প্রতিরোধ করা যায়—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করা জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যু অনেকাংশেই প্রতিরোধযোগ্য। এজন্য পরিবার, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, স্বাস্থ্য বিভাগ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং স্থানীয় প্রশাসনকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। শুধু সচেতনতামূলক প্রচারণা নয়, বাস্তবে ঝুঁকিপূর্ণ জলাশয় চিহ্নিত করে সেখানে নিরাপত্তাব্যবস্থা তৈরি করা এবং শিশুদের সুরক্ষার বিষয়ে পরিবারগুলোকে নিয়মিত উদ্বুদ্ধ করা প্রয়োজন।
কুতুবদিয়ার সাম্প্রতিক চার শিশুর মৃত্যু তাই একটি বড় সতর্কবার্তা। প্রতিদিনের ব্যস্ততা, সংসারের কাজ কিংবা সামান্য অসতর্কতার সুযোগে যেন আর কোনো শিশুকে হারাতে না হয়, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। একটি পুকুরের চারপাশে সামান্য বেড়া, কয়েক মিনিট বাড়তি নজরদারি কিংবা শিশুকে একা বাইরে যেতে না দেওয়ার মতো ছোট ছোট উদ্যোগ হয়তো একটি প্রাণ বাঁচাতে পারে। নাবিলা, আইমন, জিয়াদ ও মিশুর করুণ মৃত্যু সেই সচেতনতার প্রয়োজনীয়তাকেই আরও তীব্র করে তুলেছে