প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ইউক্রেন যুদ্ধের অবসানের কোনো কার্যকর ও স্থায়ী পথ এখনো স্পষ্ট হয়ে ওঠেনি। বরং শীত ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে দেশটির বেসামরিক জনগণ ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ওপর রুশ হামলার চাপ আরও বাড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি, পরিবহন ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় ধারাবাহিক হামলার ফলে ইউক্রেনের সাধারণ মানুষের জন্য আসন্ন শীত আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। একই সঙ্গে রাশিয়ার সামরিক তৎপরতা ইউক্রেনের সীমানা ছাড়িয়ে ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোর নিরাপত্তা নিয়েও নতুন উদ্বেগ তৈরি করছে।
সাম্প্রতিক সময়ে রাশিয়া ইউক্রেনের বিভিন্ন অঞ্চলে ব্যাপক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। ১৩ সেপ্টেম্বর এক রাত ও দিনের বিভিন্ন সময়ে রাশিয়া শত শত ড্রোন ব্যবহার করে হামলা চালায় বলে ইউক্রেনীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। এসব হামলায় আবাসিক এলাকা, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ অবকাঠামো, রেলপথ, বন্দর, শিল্প ও অন্যান্য বেসামরিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। যুদ্ধের এই নতুন পর্যায় ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপরও বড় চাপ তৈরি করছে।
রাশিয়ার হামলার ধরনেও পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিশেষ করে দ্রুতগতির জেটচালিত ড্রোনের ব্যবহার বাড়ায় ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। এসব ড্রোন তুলনামূলক দ্রুতগতিতে লক্ষ্যবস্তুর দিকে এগিয়ে যায় এবং প্রচলিত প্রতিরোধব্যবস্থার জন্য সেগুলো শনাক্ত ও ধ্বংস করা কঠিন হয়ে পড়ে। ইউক্রেনকে একই সঙ্গে বিপুলসংখ্যক ড্রোন মোকাবিলা করতে হচ্ছে এবং সীমিত সম্পদের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো রক্ষার চেষ্টা করতে হচ্ছে।
শীতের আগমনের কারণে পরিস্থিতির গুরুত্ব আরও বেড়েছে। ইউক্রেনের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি অবকাঠামো গত কয়েক বছর ধরে রুশ হামলার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। বিদ্যুৎকেন্দ্র, সঞ্চালনব্যবস্থা ও জ্বালানি অবকাঠামোর ক্ষতি হলে শীতের সময় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় বড় ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে। ঘর গরম রাখা, পানি সরবরাহ, হাসপাতাল পরিচালনা, যোগাযোগব্যবস্থা এবং শিল্প উৎপাদন—সবকিছুর ওপরই বিদ্যুতের সরবরাহের প্রভাব রয়েছে।
ইউক্রেনের অর্থনীতিতেও যুদ্ধের চাপ ক্রমশ বাড়ছে। অবকাঠামো ধ্বংসের পাশাপাশি রপ্তানি খাত, বন্দর ও পরিবহনব্যবস্থার ওপর হামলা দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতাকে দুর্বল করছে। ইউক্রেনীয় কর্মকর্তাদের হিসাবে চলতি বছর রুশ বিমান হামলায় অবকাঠামো ও স্থায়ী সম্পদের ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। যুদ্ধের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রভাবও আরও বড় বলে তাঁদের বক্তব্য।
এমন পরিস্থিতিতে ইউক্রেনের জন্য সামরিক সহায়তা ও আকাশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তবে পশ্চিমা দেশগুলোর কাছ থেকে সহায়তা পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের নীতিগত অবস্থানের পরিবর্তন এবং অস্ত্র সরবরাহের ধরনে পরিবর্তন ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা পরিকল্পনায় প্রভাব ফেলছে। ইউরোপীয় দেশগুলো নিজেদের সক্ষমতা অনুযায়ী সহায়তা বাড়ানোর চেষ্টা করলেও যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য ঘাটতি পুরোপুরি পূরণ করা তাদের জন্য সহজ নয়।
এরই মধ্যে রাশিয়ার হামলা ন্যাটোর সীমান্তের আরও কাছে পৌঁছে যাওয়ায় উদ্বেগ বাড়ছে। সম্প্রতি ইউক্রেনের পশ্চিমাঞ্চলে পোল্যান্ডের সীমান্তের কাছাকাছি একটি রুশ ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটে। সীমান্তসংলগ্ন অবকাঠামোতে আঘাতের এই ঘটনা ইউরোপীয় নিরাপত্তা মহলে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। এর আগে ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে ন্যাটোভুক্ত দেশগুলো বারবার তাদের আকাশসীমা ও সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার করেছে।
ইউক্রেনের বাইরে ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোর আকাশসীমায় ড্রোন প্রবেশের ঘটনাও সাম্প্রতিক সময়ে আলোচনায় এসেছে। ১৫ সেপ্টেম্বর লিথুয়ানিয়ার আকাশসীমায় প্রবেশ করা একটি ড্রোন ন্যাটোর যুদ্ধবিমান গুলি করে ভূপাতিত করেছে। ঘটনাটি ইউক্রেন যুদ্ধের সরাসরি বিস্তার না হলেও পূর্ব ইউরোপের আকাশসীমা নিয়ে নিরাপত্তা উদ্বেগ যে বাড়ছে, তা স্পষ্ট করেছে।
এই পরিস্থিতিতে ন্যাটোর ভূমিকা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। ইউক্রেনকে আরও কার্যকর আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দেওয়া, সামরিক সহায়তা বাড়ানো এবং রাশিয়াকে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার ব্যয় সম্পর্কে আরও কঠোর বার্তা দেওয়ার দাবি উঠছে। পশ্চিমা দেশগুলোর একটি অংশ মনে করছে, শুধু ইউক্রেনকে আত্মরক্ষামূলক অবস্থানে রেখে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের অবসান ঘটানো কঠিন হতে পারে।
তবে ন্যাটোর সরাসরি সামরিক সম্পৃক্ততার ঝুঁকিও কম নয়। রাশিয়া ও ন্যাটোর মধ্যে সরাসরি সংঘাত তৈরি হলে ইউক্রেন যুদ্ধ আরও বৃহত্তর আন্তর্জাতিক সংকটে রূপ নিতে পারে। পারমাণবিক শক্তিধর দুই পক্ষের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা বাড়ার আশঙ্কাও রয়েছে। ফলে পশ্চিমা দেশগুলোর সামনে একদিকে ইউক্রেনকে যথেষ্ট সহায়তা দেওয়ার প্রয়োজন, অন্যদিকে সরাসরি সংঘাত এড়িয়ে চলার কঠিন ভারসাম্য রক্ষা করার চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
ইউক্রেনের সাধারণ মানুষের অবস্থাও এই যুদ্ধের সবচেয়ে মানবিক দিকটি সামনে নিয়ে আসছে। বহু মানুষ দীর্ঘদিন ধরে যুদ্ধের মধ্যে বসবাস করছেন। অনেকে ঘরবাড়ি হারিয়েছেন, কেউ পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছেন, আবার কেউ প্রতিদিন বিমান হামলার সতর্কসংকেতের মধ্যে জীবন কাটাচ্ছেন। শীত এলে বিদ্যুৎ ও গরমের সংকট দেখা দিলে এই দুর্ভোগ আরও তীব্র হতে পারে। তাই যুদ্ধের সামরিক ফলাফলের পাশাপাশি বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা এখন আন্তর্জাতিক আলোচনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
ইউক্রেনের জনগণের বড় একটি অংশ যুদ্ধের অবসান চাইলেও তারা নিজেদের সার্বভৌমত্ব ও ভূখণ্ডের প্রশ্নে আপস করতে প্রস্তুত নয়। ফলে শান্তি প্রতিষ্ঠার যেকোনো উদ্যোগকে শুধু যুদ্ধ থামানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে হবে না; সেখানে ইউক্রেনের নিরাপত্তা, স্বাধীনতা ও ভবিষ্যৎ সার্বভৌমত্বের নিশ্চয়তাও থাকতে হবে। একই সঙ্গে রাশিয়ার নিরাপত্তা-সংক্রান্ত দাবিগুলো কীভাবে মোকাবিলা করা হবে, সেটিও কূটনৈতিক আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
যুদ্ধ বন্ধে কূটনৈতিক তৎপরতা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে আলোচনা হলেও এখনো এমন কোনো চুক্তি সামনে আসেনি, যা স্থায়ীভাবে সংঘাত থামাতে পারে। বরং সামরিক তৎপরতা ও কূটনৈতিক উদ্যোগ পাশাপাশি চলছে। যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন পক্ষ সম্ভাব্য শান্তি আলোচনার পথ খুঁজছে, কিন্তু ভূখণ্ড, নিরাপত্তা নিশ্চয়তা এবং যুদ্ধবিরতির শর্ত নিয়ে মতপার্থক্য রয়ে গেছে।
এদিকে রাশিয়ার সামরিক চাপ অব্যাহত থাকায় ইউক্রেনও পাল্টা হামলা চালাচ্ছে। ইউক্রেনীয় বাহিনী রাশিয়ার তেল অবকাঠামো ও সামরিক স্থাপনায় দূরপাল্লার হামলা চালিয়েছে। ফলে দুই পক্ষের হামলা এখন শুধু সামনের সারির যুদ্ধক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ নেই; জ্বালানি, পরিবহন ও অর্থনৈতিক অবকাঠামোও সংঘাতের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
এমন বাস্তবতায় ইউক্রেন যুদ্ধ একটি দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি বহন করছে। রাশিয়া যদি সামরিক লক্ষ্য অর্জনের জন্য চাপ অব্যাহত রাখে এবং ইউক্রেন পশ্চিমা সহায়তায় প্রতিরোধ চালিয়ে যায়, তাহলে যুদ্ধ দ্রুত শেষ হওয়ার সম্ভাবনা কমে যেতে পারে। এতে সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হবে দুই দেশের সাধারণ মানুষকেই।
পশ্চিমা দেশগুলোর সামনে তাই এখন বড় প্রশ্ন হলো—কীভাবে ইউক্রেনকে এমনভাবে সহায়তা দেওয়া যায়, যাতে দেশটি আত্মরক্ষার সক্ষমতা ধরে রাখতে পারে, একই সঙ্গে সংঘাত ন্যাটো-রাশিয়া সরাসরি যুদ্ধে পরিণত না হয়। আরও কঠোর নিষেধাজ্ঞা, সামরিক সহায়তা, আকাশ প্রতিরক্ষা এবং কূটনৈতিক চাপ—সবগুলো উপায়কে সমন্বিতভাবে কাজে লাগানোর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা বাড়ছে।
শেষ পর্যন্ত ইউক্রেন যুদ্ধের স্থায়ী সমাধান সামরিক শক্তির পাশাপাশি একটি বিশ্বাসযোগ্য রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করবে। শীতের আগে রুশ হামলা যদি আরও তীব্র হয়, তাহলে ইউক্রেনের মানবিক সংকট গভীর হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সেই পরিস্থিতিতে ন্যাটো ও পশ্চিমা গণতান্ত্রিক দেশগুলোর সিদ্ধান্ত শুধু যুদ্ধক্ষেত্রের গতিপথ নয়, ইউরোপের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা কাঠামোকেও প্রভাবিত করতে পারে।