কাদেরসহ সাতজনের মৃত্যুদণ্ড নিয়ে সরকারের বক্তব্য

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১৩ বার
ডা. জাহেদ উর রহমান

প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরসহ সাত আসামির মৃত্যুদণ্ডের সঙ্গে প্রতিশোধস্পৃহার কোনো সম্পর্ক নেই বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান। তিনি বলেছেন, সরকারের মূল লক্ষ্য কাউকে শাস্তি দেওয়া বা কারও মৃত্যুদণ্ডে আনন্দ প্রকাশ করা নয়; বরং সমাজে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা।

মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমের অগ্রগতি নিয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন। ওবায়দুল কাদেরসহ সাতজনের বিরুদ্ধে আদালতের দেওয়া মৃত্যুদণ্ডের বিষয়ে সরকারের অবস্থান জানতে চাইলে উপদেষ্টা বিষয়টি ব্যাখ্যা করেন।

জাহেদ উর রহমান বলেন, মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আদালতের দেওয়া রায়কে সরকার স্বাগত জানায়। তবে কোনো ব্যক্তির সর্বোচ্চ শাস্তির রায়কে কেন্দ্র করে আবেগ, উল্লাস বা প্রতিহিংসার মনোভাবকে তিনি গুরুত্ব দিতে চান না। তার মতে, একটি গণতান্ত্রিক ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজে বিচারপ্রক্রিয়ার মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত অপরাধের বিচার নিশ্চিত করা এবং ভুক্তভোগীদের জন্য ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা।

তিনি বলেন, ওবায়দুল কাদেরসহ অভিযুক্ত ব্যক্তিরা যদি আদালতের সামনে নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরার সুযোগ পেতেন এবং মামলাটি যথাযথভাবে মোকাবিলা করতেন, তাহলে বিচারপ্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে তাদের অবস্থানও স্পষ্ট হওয়ার সুযোগ থাকত। কিন্তু তারা উপস্থিত না থাকায় মামলার কার্যক্রম যে প্রক্রিয়ায় এগিয়েছে, তার ভিত্তিতেই আদালত সিদ্ধান্ত দিয়েছেন বলে তিনি মন্তব্য করেন।

সরকারের পক্ষ থেকে এই রায়কে স্বাগত জানানোর পাশাপাশি জাহেদ উর রহমান স্পষ্ট করে বলেন, এর সঙ্গে প্রতিশোধস্পৃহার সম্পর্ক নেই। তার ভাষায়, কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ শাস্তির রায় হয়েছে বলেই সরকার আনন্দিত—এমন ধারণার পরিবর্তে বিচারব্যবস্থা তার দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করছে কি না, সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে সরকার বিচারপ্রক্রিয়াকে প্রতিহিংসার রাজনীতি থেকে আলাদা করে দেখাতে চাইছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর সাবেক ক্ষমতাসীন দলের শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন মামলা ও বিচারিক কার্যক্রম নিয়ে দেশে-বিদেশে নানা আলোচনা চলছে। এমন পরিস্থিতিতে সরকারের একজন গুরুত্বপূর্ণ উপদেষ্টার পক্ষ থেকে বিচারপ্রক্রিয়ার উদ্দেশ্য হিসেবে ন্যায়বিচারের বিষয়টি সামনে আনা হয়েছে।

জাহেদ উর রহমান বলেন, সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার প্রশ্নটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারও শাস্তি দেখে আনন্দিত হওয়া কিংবা ব্যক্তিগত প্রতিশোধ নেওয়ার মানসিকতা থেকে রাষ্ট্র পরিচালিত হওয়া উচিত নয়। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো অপরাধের অভিযোগের বিচার করা এবং প্রমাণ ও আইনের ভিত্তিতে আদালতের সিদ্ধান্ত কার্যকর করা।

তিনি আরও বলেন, বর্তমান সরকারের অন্যতম লক্ষ্য হলো সমাজে সাম্য, মানবিক মর্যাদা এবং সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা। মুক্তিযুদ্ধের ঘোষণাপত্রে যে মূল্যবোধগুলোর কথা বলা হয়েছে, সেগুলোর বাস্তবায়ন হচ্ছে কি না, সেটিই সরকারের বিবেচনায় গুরুত্বপূর্ণ হওয়া উচিত বলে তিনি মন্তব্য করেন।

ওবায়দুল কাদেরসহ সাত আসামির মৃত্যুদণ্ডের রায়কে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গনেও ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়েছে। সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকজন নেতার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে বিচারিক কার্যক্রম চলার প্রেক্ষাপটে এই রায়কে তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে বিচারপ্রক্রিয়া, আসামিদের অধিকার, সাক্ষ্য-প্রমাণ এবং আদালতের সিদ্ধান্ত নিয়ে বিভিন্ন মহলে মতামতও তৈরি হয়েছে।

মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার বাংলাদেশের রাজনীতিতে অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি বিষয়। এ ধরনের মামলায় একদিকে ভুক্তভোগী ও ক্ষতিগ্রস্তদের ন্যায়বিচারের দাবি রয়েছে, অন্যদিকে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার ও বিচারপ্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ। ফলে কোনো মামলার রায়কে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার সঙ্গে না মিলিয়ে আইনি প্রক্রিয়া ও আদালতের সিদ্ধান্তের আলোকে দেখার প্রয়োজন রয়েছে।

সরকারের বক্তব্যেও মূলত সেই বিষয়টিই গুরুত্ব পেয়েছে। জাহেদ উর রহমানের বক্তব্য অনুযায়ী, আদালতের রায়কে সরকার সম্মান করছে এবং প্রসিকিউশন টিম মামলার কার্যক্রমে তাদের দায়িত্ব পালন করেছে। সরকারের পক্ষ থেকে আদালতের রায়কে নিজেদের রাজনৈতিক প্রতিশোধ বাস্তবায়নের উপায় হিসেবে দেখানো হচ্ছে না বলেও তিনি স্পষ্ট করেছেন।

তিনি বলেন, মানুষ হিসেবে কারও মৃত্যুদণ্ডে উচ্ছ্বসিত হওয়ার চেয়ে বড় বিষয় হলো সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হচ্ছে কি না। রাষ্ট্রের বিচারব্যবস্থা যদি অপরাধের শিকার মানুষকে ন্যায়বিচার দিতে পারে এবং একই সঙ্গে আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে পারে, তাহলে সেটিই হবে একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।

সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিচার ও জবাবদিহির প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ক্ষমতাসীন ও বিরোধী—সব রাজনৈতিক দলের ক্ষেত্রেই আইনের সমান প্রয়োগ এবং বিচারপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে জনগণের প্রত্যাশা রয়েছে। রাজনৈতিক পরিচয় যেন বিচারপ্রক্রিয়াকে প্রভাবিত না করে, একই সঙ্গে কোনো ব্যক্তি যেন রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে অন্যায়ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হন—এ দুই বিষয়ই একটি কার্যকর বিচারব্যবস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

এদিকে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মৃত্যুদণ্ডের মতো সর্বোচ্চ শাস্তির সিদ্ধান্ত সাধারণত ব্যাপক জনআলোচনার জন্ম দেয়। এ ধরনের রায়ের ক্ষেত্রে আদালতে উপস্থাপিত সাক্ষ্য-প্রমাণ, আইনি যুক্তি এবং বিচারিক মূল্যায়নই চূড়ান্ত বিবেচ্য বিষয়। সরকারের রাজনৈতিক বক্তব্যের পাশাপাশি আদালতের পূর্ণাঙ্গ রায়ে কী ধরনের তথ্য-প্রমাণ ও আইনি ব্যাখ্যার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়েছে, সেটিও ভবিষ্যতে আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠবে।

জাহেদ উর রহমানের বক্তব্যে মুক্তিযুদ্ধের ঘোষণাপত্রে উল্লেখিত সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের মূল্যবোধের কথাও উঠে এসেছে। তিনি মনে করেন, রাষ্ট্রের বিচার ও প্রশাসনিক কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে এসব মূল্যবোধ বাস্তবে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে কি না, সেটিই মূল্যায়নের বিষয়।

রাজনৈতিক সংঘাত ও প্রতিহিংসার দীর্ঘ ইতিহাস থাকা একটি দেশে বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা তৈরি করা সহজ নয়। তাই বিচারপ্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, আইনের শাসন, ন্যায়সংগত আচরণ এবং সব পক্ষের অধিকার নিশ্চিত করার বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে গুরুতর অপরাধের অভিযোগে দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনার দাবিও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।

সরকারের তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টার বক্তব্যে সেই ভারসাম্যের কথাই তুলে ধরার চেষ্টা দেখা গেছে। তিনি একদিকে আদালতের রায়কে স্বাগত জানিয়েছেন, অন্যদিকে মৃত্যুদণ্ডকে প্রতিশোধের প্রতীক হিসেবে দেখার বিরোধিতা করেছেন। তার মতে, রাষ্ট্রের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি সমাজ প্রতিষ্ঠা করা যেখানে অপরাধের বিচার হবে, ভুক্তভোগীরা ন্যায়বিচার পাবেন এবং আইনের শাসন সবার জন্য সমানভাবে কার্যকর থাকবে।

ওবায়দুল কাদেরসহ সাত আসামির মৃত্যুদণ্ডের রায় এখন বাংলাদেশের বিচার ও রাজনৈতিক আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। তবে এই রায়ের দীর্ঘমেয়াদি তাৎপর্য নির্ভর করবে বিচারপ্রক্রিয়ার গ্রহণযোগ্যতা, আইনের যথাযথ প্রয়োগ এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি জনগণের আস্থা কতটা প্রতিষ্ঠিত হয় তার ওপর। সরকারের পক্ষ থেকে অন্তত এটিই স্পষ্ট করা হয়েছে যে, এই শাস্তিকে তারা ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক প্রতিশোধ হিসেবে নয়, বরং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে দেখছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত