জুলাই হত্যা মামলা, কাদেরসহ ৭ জনের রায় কাল

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ২ বার
জুলাই হত্যা মামলা, কাদেরসহ ৭ জনের রায় কাল

প্রকাশ: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে দায়ের করা মামলায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাতসহ সাত আসামির বিরুদ্ধে রায় ঘোষণা হবে মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর)। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ সোমবার রায় ঘোষণার জন্য দিন নির্ধারণ করেছেন।

বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এ মামলাটির বিচার কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। এর আগে গত ১৭ আগস্ট রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ হওয়ার পর মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখা হয়েছিল। প্রায় তিন সপ্তাহ পর আদালত রায় ঘোষণার নির্দিষ্ট তারিখ জানালেন।

মামলাটি জুলাই গণঅভ্যুত্থান ঘিরে দায়ের হওয়া মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলাগুলোর মধ্যে অন্যতম আলোচিত। এতে তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন দমনে সহিংসতা ও হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ আনা হয়েছে। রাষ্ট্রপক্ষ তাদের অভিযোগের পক্ষে বিভিন্ন সাক্ষ্য, নথি, অডিও-ভিডিওসহ বিভিন্ন ধরনের তথ্য-উপাত্ত আদালতে উপস্থাপন করেছে। অন্যদিকে আসামিপক্ষ এসব অভিযোগের বিভিন্ন দিক খণ্ডন করে তাদের বক্তব্য তুলে ধরেছে।

মামলায় ওবায়দুল কাদের ছাড়া অন্য আসামিরা হলেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, যুবলীগের সভাপতি শেখ ফজলে শামস পরশ, সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল, ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন এবং সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান। সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদন অনুযায়ী, সাত আসামিই বর্তমানে পলাতক রয়েছেন।

মামলার বিচারপ্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রপক্ষে মোট ২৯ জন সাক্ষী সাক্ষ্য দিয়েছেন। এর মধ্যে তদন্ত কর্মকর্তাও ছিলেন। গত ২ আগস্ট সাক্ষ্যগ্রহণ পর্ব শেষ হয়। এরপর রাষ্ট্রপক্ষ তাদের সমাপনী যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করে। ১৭ আগস্ট উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক শেষ হলে ট্রাইব্যুনাল মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখেন।

রাষ্ট্রপক্ষের যুক্তিতর্কে অভিযোগ করা হয়, জুলাই গণঅভ্যুত্থান দমনে তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের ভূমিকা ছিল। প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে বিভিন্ন অডিও ও ভিডিও রেকর্ড, সাক্ষীদের বক্তব্য এবং অন্যান্য তথ্য-প্রমাণের মাধ্যমে আসামিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হয়েছে। রাষ্ট্রপক্ষের দাবি, আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যাপক দমন-পীড়ন ও প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহারের ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা ছিল না; বরং এর পেছনে রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক সিদ্ধান্তের ভূমিকা ছিল।

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা আদালতে আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি করেছেন। একই সঙ্গে অভিযোগ প্রমাণিত হলে তাদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের আদেশও চেয়েছে প্রসিকিউশন। তবে এসব দাবি এখনো আদালতের রায়ে চূড়ান্তভাবে নির্ধারিত হয়নি। মঙ্গলবার ট্রাইব্যুনালের রায়ের মধ্য দিয়েই অভিযোগগুলোর বিচারিক মূল্যায়ন প্রকাশ পাবে।

অন্যদিকে আসামিদের পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবীরা রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছেন। ওবায়দুল কাদের, বাহাউদ্দিন নাছিম ও মোহাম্মদ আলী আরাফাতের পক্ষে আইনজীবী এম হাসান ইমাম যুক্তিতর্কে তাদের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগতভাবে গুলিবর্ষণ, হত্যা বা সহিংসতায় জড়িত থাকার প্রমাণ নেই বলে দাবি করেন। তিনি রাষ্ট্রপক্ষের উপস্থাপিত অভিযোগের ব্যাখ্যা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন।

আসামিপক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, তৎকালীন পরিস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলা ও জনগণের জানমাল রক্ষার বিষয়টি সামনে রেখে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। তারা আরও দাবি করেছেন, অভিযুক্ত তিন নেতা সরাসরি হত্যাকাণ্ড পরিচালনা বা কোনো ব্যক্তিকে হত্যার নির্দেশ দেওয়ার মতো কমান্ডিং অবস্থানে ছিলেন না। তবে এসব যুক্তি আদালত কীভাবে মূল্যায়ন করেছেন, তা রায়ের পূর্ণাঙ্গ পর্যবেক্ষণ প্রকাশের পরই স্পষ্ট হবে।

অন্য চার আসামি যুবলীগ ও ছাত্রলীগের শীর্ষ পর্যায়ের নেতা। তাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ জুলাই আন্দোলন দমনে সংগঠিত সহিংসতা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ এনেছে। তাদের পক্ষে আইনজীবী ইশরাত জাহান রাষ্ট্রপক্ষের বক্তব্য খণ্ডনের চেষ্টা করেন। বিচার চলাকালে আসামিপক্ষ অভিযোগগুলোর প্রমাণযোগ্যতা, আসামিদের ব্যক্তিগত ভূমিকা এবং দায় নির্ধারণের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আদালতে যুক্তি তুলে ধরে।

মামলার বিচারিক প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল এরও আগে। সংশ্লিষ্ট আদালত ২০২৫ সালের ১৮ ডিসেম্বর রাষ্ট্রপক্ষের দেওয়া আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নেন। পরে চলতি বছরের ২২ জানুয়ারি সাত আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেওয়া হয়। এরপর সাক্ষ্যগ্রহণ, জেরা এবং উভয় পক্ষের যুক্তিতর্কের মধ্য দিয়ে মামলাটি রায়ের পর্যায়ে আসে।

এই মামলায় রায়ের দিন ঘনিয়ে আসায় আদালত প্রাঙ্গণ ও রাজনৈতিক অঙ্গনে স্বাভাবিকভাবেই ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ওই আন্দোলনের সময় সংঘটিত প্রাণহানি ও সহিংসতার দায় নির্ধারণ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক ও আইনগত বিতর্ক চলছে। এ মামলার রায় সেই বিতর্কে নতুন একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় যোগ করতে পারে।

জুলাই আন্দোলনের সময় দেশের বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক সংঘর্ষ, প্রাণহানি ও সহিংসতার ঘটনা ঘটে। আন্দোলনকারীদের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং রাজনৈতিক দলের কর্মীদেরও বিভিন্ন সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ ওঠে। এসব ঘটনার প্রকৃত দায় কার, কোন পর্যায়ে কার সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়েছে এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের দায় কতটুকু—বিচারিক প্রক্রিয়ায় এসব প্রশ্নই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার হওয়ায় মামলাটির গুরুত্ব আরও বেড়েছে। এ ধরনের মামলায় শুধু কোনো নির্দিষ্ট সহিংস ঘটনার সঙ্গে ব্যক্তির সরাসরি সম্পৃক্ততা নয়, বরং বৃহত্তর প্রেক্ষাপট, পরিকল্পনা, নির্দেশনা, সাংগঠনিক ভূমিকা এবং কমান্ড কাঠামোর বিষয়ও বিচারিকভাবে বিবেচনায় আসতে পারে। তবে কোনো আসামির বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ আদালতে প্রমাণিত হয়েছে কি না, সেটিই শেষ পর্যন্ত রায়ের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে।

মামলার সাত আসামিই বর্তমানে পলাতক থাকায় তাদের অনুপস্থিতিতেই বিচারপ্রক্রিয়া এগিয়েছে। রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবীরা আদালতে তাদের পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করেছেন। এ কারণে রায় ঘোষণার পর আসামিদের বিরুদ্ধে আদালতের সিদ্ধান্ত কীভাবে কার্যকর হবে, সেটিও আলোচনায় আসতে পারে।

রায় ঘোষণার আগে দুই পক্ষের বক্তব্যের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য স্পষ্ট। রাষ্ট্রপক্ষ বলছে, জুলাইয়ের সহিংসতা ও হত্যাকাণ্ডের পেছনে রাজনৈতিক নেতৃত্বের দায় এবং সাংগঠনিক ভূমিকার প্রমাণ রয়েছে। অন্যদিকে আসামিপক্ষ বলছে, তাদের মক্কেলদের বিরুদ্ধে সরাসরি হত্যাকাণ্ড বা গুলিবর্ষণের ব্যক্তিগত সম্পৃক্ততার যথেষ্ট প্রমাণ নেই। ফলে আদালত রাষ্ট্রপক্ষের উপস্থাপিত প্রমাণ ও আসামিপক্ষের ব্যাখ্যা কীভাবে মূল্যায়ন করেছেন, সেটিই মঙ্গলবারের রায়ের মূল বিষয় হয়ে উঠবে।

মঙ্গলবার ট্রাইব্যুনালের রায় ঘোষণার মধ্য দিয়ে দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ শেষ হবে। রায়ে অভিযোগ প্রমাণিত হলে আসামিদের বিরুদ্ধে শাস্তির ধরন ও মাত্রা নির্ধারিত হবে; আর অভিযোগ প্রমাণিত না হলে সে অনুযায়ী আদালতের সিদ্ধান্ত আসবে। যেকোনো পরিস্থিতিতেই জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময়কার সহিংসতার বিচার ও দায় নির্ধারণের ক্ষেত্রে এই রায় বাংলাদেশের সাম্প্রতিক বিচারিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকবে।

রায়ের দিকে তাকিয়ে এখন শুধু মামলার পক্ষ-বিপক্ষ নয়, জুলাইয়ের ঘটনাবলির বিচারিক পরিণতি জানতে আগ্রহী সাধারণ মানুষও। আদালতের সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে কোন অভিযোগ কতটা প্রমাণিত হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দায় কীভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে—তার বিস্তারিত ব্যাখ্যা রায়ের পর্যবেক্ষণ ও পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর আরও পরিষ্কার হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত