একনেকের সভায় উঠছে ১৫ উন্নয়ন প্রকল্প

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১০ বার
একনেকের সভায় উঠছে ১৫ উন্নয়ন প্রকল্প

প্রকাশ: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের তৃতীয় সভায় ১৫টি উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদনের জন্য জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় উপস্থাপন করা হবে। আগামী বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) সকাল ১০টায় সচিবালয়ের মন্ত্রিসভাকক্ষে এ সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। সভায় সভাপতিত্ব করবেন প্রধানমন্ত্রী ও একনেকের চেয়ারম্যান তারেক রহমান।

পরিকল্পনা বিভাগের জারি করা নোটিশ অনুযায়ী, আসন্ন সভায় যেসব প্রকল্প অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে, সেগুলো দেশের পরিবহন, প্রতিরক্ষা, স্বাস্থ্য, পানিসম্পদ, ভূমি ব্যবস্থাপনা, রেলপথ, বিদ্যুৎ ও স্থানীয় সরকারসহ গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি খাতকে ঘিরে। এসব প্রকল্পের কোনোটি নতুন অবকাঠামো নির্মাণের সঙ্গে সম্পর্কিত, আবার কোনোটি চলমান প্রকল্পের সংশোধন ও সম্প্রসারণের মাধ্যমে নাগরিক সেবা ও অবকাঠামোগত সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্দেশ্যে নেওয়া হয়েছে।

একনেকের সভায় প্রকল্প অনুমোদনের বিষয়টি দেশের উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে বিবেচিত হয়। কোনো প্রকল্প অনুমোদনের পর এর অর্থায়ন, বাস্তবায়ন পরিকল্পনা এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থার মাধ্যমে কাজ এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। ফলে বুধবারের সভায় উঠতে যাওয়া প্রকল্পগুলোর দিকে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সরকারি সংস্থার পাশাপাশি সাধারণ মানুষেরও আগ্রহ রয়েছে।

আসন্ন সভার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প হিসেবে রয়েছে ঢাকা ম্যাস র‌্যাপিড ট্রানজিট উন্নয়ন প্রকল্পের লাইন-৫-এর সাউদার্ন রুট। ভৌত অবকাঠামো বিভাগের আওতায় প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০৩৩ সালের আগস্ট পর্যন্ত প্রকল্পটি বাস্তবায়নের সময় নির্ধারণ করা হয়েছে।

ঢাকার ক্রমবর্ধমান যানজট ও নগর পরিবহন ব্যবস্থার ওপর চাপ কমাতে গণপরিবহন অবকাঠামোর উন্নয়নকে দীর্ঘদিন ধরেই গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। রাজধানীতে দ্রুতগতির গণপরিবহন ব্যবস্থা সম্প্রসারণের মাধ্যমে যাতায়াতের সময় কমানো এবং নগরবাসীর চলাচল আরও কার্যকর করার লক্ষ্য রয়েছে। লাইন-৫-এর সাউদার্ন রুটের মতো বড় অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে এর প্রভাব রাজধানীর পরিবহন ব্যবস্থার পাশাপাশি আশপাশের এলাকার যাতায়াত ব্যবস্থাতেও পড়তে পারে।

সভায় রাজশাহী ও চট্টগ্রাম সড়ক জোনের অধীন জেলা মহাসড়ক উন্নয়ন প্রকল্পের তৃতীয় পর্যায়ও উপস্থাপন করা হবে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সড়ক যোগাযোগের মান উন্নয়ন, যাতায়াত সহজ করা এবং পণ্য পরিবহনের সক্ষমতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে জেলা মহাসড়কের গুরুত্ব রয়েছে। আঞ্চলিক যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন হলে কৃষিপণ্য ও অন্যান্য পণ্য দ্রুত বাজারে পৌঁছানোর পাশাপাশি স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও গতিশীল হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।

প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দুটি প্রকল্পও অনুমোদনের তালিকায় রয়েছে। এর মধ্যে একটি হলো বরিশাল সেনানিবাস স্থাপনের দ্বিতীয় পর্যায়ের প্রকল্প। প্রকল্পটির বাস্তবায়ন মেয়াদ ২০২৬ সালের জুলাই থেকে ২০৩০ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। অন্যটি খুলনা নৌ অঞ্চলে নৌবাহিনীর সদস্যদের জন্য আবাসিক ও অন্যান্য সুবিধা নির্মাণসংক্রান্ত প্রকল্প। এর বাস্তবায়ন মেয়াদ ২০২৬ সালের জুলাই থেকে ২০২৯ সালের জুন পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে।

অন্যদিকে স্থানীয় অবকাঠামো ও নগর ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেও কয়েকটি প্রকল্প রয়েছে। খুলনা ড্রেনেজ ব্যবস্থা উন্নয়ন প্রকল্পের প্রথম সংশোধনী একনেক সভায় উপস্থাপন করা হবে। জলাবদ্ধতা নিরসন ও নগরবাসীর স্বাভাবিক জীবনযাত্রা নিশ্চিত করতে কার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ। খুলনার মতো নগর এলাকায় বর্ষা মৌসুমে পানি নিষ্কাশন নিয়ে মানুষের ভোগান্তি দীর্ঘদিনের। তাই এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে পরিকল্পনার পাশাপাশি কার্যকর ও সময়মতো বাস্তবায়নও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

রেল যোগাযোগের উন্নয়নেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা-জয়দেবপুর রেলপথে বৈদ্যুতিক ট্র্যাকশন ব্যবস্থা চালুর প্রকল্প একনেকের সভায় উঠবে। দেশের রেল ব্যবস্থাকে আধুনিকায়ন এবং বিদ্যুৎচালিত রেল যোগাযোগের দিকে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে এ ধরনের উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। একই সঙ্গে বগুড়া-সিরাজগঞ্জ রেলপথ নির্মাণ প্রকল্পের প্রথম সংশোধনীও সভায় উপস্থাপনের কথা রয়েছে। উত্তরাঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থায় রেলপথের ভূমিকা আরও বাড়ানোর ক্ষেত্রে এ প্রকল্পের গুরুত্ব রয়েছে।

স্বাস্থ্য খাতেও রয়েছে একাধিক প্রকল্প। সভায় মা, নবজাতক ও শিশু স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়ন এবং অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে স্বাস্থ্য ব্যবস্থা শক্তিশালীকরণসংক্রান্ত প্রকল্প উপস্থাপন করা হবে। পাশাপাশি যক্ষ্মা, এইচআইভি/এইডস ও ম্যালেরিয়া মোকাবেলায় সমন্বিত স্বাস্থ্য ব্যবস্থা এবং আর্থিক খাত সহায়তা প্রকল্প-২ অনুমোদনের জন্য উঠবে।

জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর মানুষের নির্ভরতা দিন দিন বাড়ছে। বিশেষ করে মা ও শিশুর স্বাস্থ্যসেবা, সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ এবং দীর্ঘমেয়াদি অসংক্রামক রোগের চিকিৎসা ও প্রতিরোধে কার্যকর সরকারি উদ্যোগ প্রয়োজন। এসব প্রকল্প অনুমোদন ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবার বিভিন্ন ক্ষেত্রে সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।

পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের আওতায় ছোট ফেনী ও বামনী নদীর সমন্বিত বন্যা ও নদী ব্যবস্থাপনা এবং নিষ্কাশন উন্নয়নে মুসাপুর রেগুলেটর নির্মাণ প্রকল্পের প্রথম অংশও সভায় উপস্থাপন করা হবে। নদী ব্যবস্থাপনা, বন্যা নিয়ন্ত্রণ এবং পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়নে এ ধরনের প্রকল্প সংশ্লিষ্ট এলাকার মানুষের জীবন ও জীবিকার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে।

ভূমি ব্যবস্থাপনায় ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর বিষয়টিও একনেকের আলোচনায় থাকছে। ভূমি মন্ত্রণালয়ের ডিজিটাল ভূমি ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা প্রকল্পের দ্বিতীয় সংশোধনী অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, এ প্রকল্পের আওতায় তিনটি সিটি করপোরেশন, একটি পৌরসভা ও দুটি উপজেলায় ডিজিটাল ভূমি জরিপ পরিচালনা করা হবে।

বাংলাদেশে ভূমি নিয়ে বিরোধ, জরিপসংক্রান্ত জটিলতা এবং পুরোনো নথির কারণে নাগরিকদের নানা ধরনের ভোগান্তির অভিযোগ দীর্ঘদিনের। ডিজিটাল ভূমি জরিপ ও ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা শক্তিশালী হলে ভূমি সংক্রান্ত তথ্য সংরক্ষণ, ব্যবস্থাপনা ও নাগরিক সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে আরও আধুনিক পদ্ধতি গড়ে তোলার সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।

এ ছাড়া সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী অনুমোদিত আরও ১৫টি প্রকল্প একনেক সভায় অবগতির জন্য উপস্থাপন করা হবে। এসব প্রকল্পের মধ্যে ভাসানচরে সবুজ বেষ্টনী স্থাপন, কক্সবাজারে রোহিঙ্গাদের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় পুনঃবনায়ন, অর্থনৈতিক অঞ্চলে টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্ক স্থাপন, ঝুঁকিপূর্ণ সেতু প্রতিস্থাপন, শিক্ষা ও সামরিক প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো উন্নয়ন এবং সামাজিক সুরক্ষা জোরদার করার মতো উদ্যোগ রয়েছে।

সিলেট বিভাগের ডিজিটাল উচ্চতা মডেল তৈরির প্রকল্পও অবগতির জন্য উপস্থাপনের তালিকায় রয়েছে। ভূপ্রকৃতি, অবকাঠামো পরিকল্পনা, পানি ব্যবস্থাপনা ও বিভিন্ন উন্নয়ন কার্যক্রমে ডিজিটাল উচ্চতা-সংক্রান্ত তথ্য ভবিষ্যতে ব্যবহার করা যেতে পারে। বিশেষ করে পাহাড়, হাওর ও বিভিন্ন ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন এলাকায় উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণের ক্ষেত্রে নির্ভুল ভৌগোলিক তথ্যের প্রয়োজন রয়েছে।

একনেকের সভায় প্রকল্প অনুমোদনের ক্ষেত্রে শুধু অর্থ বরাদ্দ বা পরিকল্পনা গ্রহণই শেষ কথা নয়; প্রকল্পের বাস্তবায়ন দক্ষতা, নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করা, ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং জনগণের প্রত্যাশিত সুফল নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। অতীতে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে সময় ও ব্যয় বাড়ার বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। তাই নতুন প্রকল্পগুলোর ক্ষেত্রেও নির্ধারিত সময় ও ব্যয়ের মধ্যে কাজ শেষ করার ওপর গুরুত্ব থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে।

দেশের উন্নয়ন অবকাঠামোকে আরও শক্তিশালী করার পাশাপাশি নাগরিক সেবা সহজ করা, যোগাযোগব্যবস্থা উন্নত করা, স্বাস্থ্যসেবা বিস্তৃত করা, পানি ও ভূমি ব্যবস্থাপনা আধুনিক করা এবং সামাজিক সুরক্ষা বাড়ানোর সঙ্গে এবারের প্রকল্পগুলোর বড় একটি অংশ যুক্ত। একনেকের অনুমোদনের পর এসব প্রকল্প কীভাবে বাস্তবায়িত হয় এবং সাধারণ মানুষ কতটা সুফল পায়, সেটিই শেষ পর্যন্ত প্রকল্পগুলোর সাফল্যের প্রধান মাপকাঠি হয়ে উঠবে।

বুধবারের একনেক সভায় ১৫টি প্রকল্পের অনুমোদন নিয়ে আলোচনা ও সিদ্ধান্তের পর দেশের বিভিন্ন খাতে উন্নয়ন পরিকল্পনার পরবর্তী ধাপ আরও স্পষ্ট হবে। একই সঙ্গে অবগতির জন্য ওঠা আরও ১৫টি প্রকল্পও সরকারের চলমান উন্নয়ন অগ্রাধিকারের একটি ধারণা দেবে। পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করা গেলে এসব উদ্যোগ দেশের অবকাঠামো ও জনসেবায় দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত